নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের ঢাকা থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে কিন্তু ভারত তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা বাংলাদেশকে জানায়নি। এমন তথ্য জানিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এখানে এমন কোনো ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যে, নিরাপত্তার জন্য তাদের (ভারতের) এই পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবারকে প্রত্যাহারের কোনো কারণ খুঁজে পাইনি। বাংলাদেশে এমন কোনো বিদ্যমান কারণ নেই যে, এখান থেকে তাদের চলে যেতে হবে।
বুধবার, (২৮ জানুয়ারী ২০২৬), পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবার প্রত্যাহার করে নিয়েছে দেশটি। এ বিষয়ে বুধবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, এটা তাদের (ভারতের) একেবারেই নিজস্ব বিষয়। তারা তাদের কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের চলে যেতে বলতেই পারেন। তারা কেন করেছেন, সেটা তারা বলতে পারবেন।
এ ঘটনায় ভারত বাংলাদেশকে কোনো বার্তা দিতে চায় কিনা জানতে চাইলে তৌহিদ হোসেন বলেন, এটা হতেও পারে, তবে আমি কোনো মেসেজ খুঁজে পাই না। তাদের পরিবারকে নিয়ে যাবেন, এতে আমাদের কিছু করার নেই। তবে তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা আমাদের জানায়নি। উপদেষ্টা বলেন, আগে যখন নির্বাচন হতো, মাঝে তো অনেক দিন নির্বাচনই হয়নি, তবে তখনও নির্বাচনে কিছু ছোটখাটো সংঘর্ষ মারামারি হতো। এবার তার চেয়ে বেশি কিছু হয়েছে বলে আমার মনে হয়নি। আমার তো মনে হয় না এখানে এমন কোনো ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, নিরাপত্তার জন্য তাদের (ভারতের) এই পদক্ষেপ নিতে হবে।
আ.লীগ সম্পর্কিত বক্তব্যের ব্যাখ্যা
দিল্লীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া বক্তব্য সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের দিন সংঘটিত যে কোনো সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ের দায় সংশ্লিষ্ট সংগঠনের (আওয়ামী লীগের) ওপর বর্তাবে। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বুধবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আওয়ামী লীগের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচনে গ-গোল হলে যারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না বা নিতে পারছেন না, তাদের দ্বারাই হওয়া সম্ভব।
তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘না, আমরা মোটেই সে রকম নিশ্চিত নই। কিন্তু আশঙ্কা হচ্ছে, যে কোনো অপচেষ্টা হতে পারে। এটার প্রতিদিনের অগ্রগতির বিস্তারিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লোকজন আরও ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু আমরা মনে করছি যে, কোনো বিপদ বা এ ধরনের কোনো সংঘাত হয়, সাধারণভাবে সেটা হওয়ার কথা নয়। যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন, তাদের প্রত্যেকে নির্বাচনের কার্যকলাপে যথেষ্ট সংযমের পরিচয় দিচ্ছেন। কাজেই গ-গোল হলে যারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না বা নিতে পারছেন না, তাদের দ্বারাই হওয়া সম্ভব। এ জন্যই কথাটা বলা হচ্ছে।’
মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত পলাতক শেখ হাসিনাকে গত ২৫ জানুয়ারি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়ায় বিস্ময় ও গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই দিনের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ওই বক্তব্যে বাংলাদেশের সরকার উৎখাত ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ভ-ুল করার উদ্দেশে সহিংসতার উসকানি দেয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট প্রসঙ্গ
বাংলাদেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের সৌদি আরবে যাওয়ার প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, আমাদের ত্রুটির কারণে প্রচুর রোহিঙ্গা বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে সেখানে গেছে অনেক বছর আগে। তখন হাতে লেখা পাসপোর্ট ছিল। এর মধ্যে প্রচুর দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, যারা আমাদের পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরবে গেছেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের পাসপোর্ট নবায়নের জন্য আমাদের ওপর চাপ দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘একটি সিদ্ধান্ত যখন নেয়া হয়, তখন কোনো দেশের প্রেক্ষাপটে সেখানে আরও অনেক স্বার্থ জড়িত থাকে। আমরা চেষ্টা করেছিলাম, যেন এটা করতে না হয়। কিন্তু আমাদের অন্যান্য স্বার্থের কারণে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে যে, এই ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেয়া হবে। তবে পাসপোর্ট দেয়া মানেই তারা বাংলাদেশের নাগরিক এমন নয়।’
তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘যে কোনো দেশের নাগরিককে পাসপোর্ট দেয়া যায় এর উদাহরণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রয়েছে। অন্য দেশের নাগরিককেও পাসপোর্ট দেয়া সম্ভব। আমাদের মূল বিষয় হলো- এই মানুষগুলো মায়ানমার থেকে এসেছে। তারা এথনিসিটি নিয়ে গবেষণা করতেই পারে, সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু বর্তমানে এখানে থাকা ১৩ লাখ মানুষের পূর্বপুরুষরা শত শত বছর ধরে সেখানে বসবাস করে আসছিলেন। কাজেই তাদের ফেরত নিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘সারা পৃথিবীই স্বীকার করে যে রোহিঙ্গারা একটি জনগোষ্ঠী, যারা মায়ানমারের আরাকানের অধিবাসী। আমাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিষয়টি ডিল করতে হবে। ছোটখাটো টেকনিক্যাল ইস্যুর কারণে এটি আটকে থাকবে না। যদি তাদের ফেরত পাঠানোর মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা যায়, সেটার জন্য আমাদের আরও অনেক কাজ করতে হবে।’
মার্কিন কূটনীতিকের অডিও ফাঁস নিয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘এটা নিয়ে আমি কোনো কমেন্ট করতে চাই না। কারণ, এগুলো আমরা জানি না যে কে আসবে আর কী হবে। স্পেকুলেট করে তো লাভ নেই। কে নির্বাচনে জিতবে, কারা ক্ষমতায় আসবে, তারপর তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কীভাবে ডিল করবে, সেটাই দেখার বিষয়।’
দায়িত্ব গ্রহণের পর মার্কিন রাষ্ট্রদূতের চীন নিয়ে মন্তব্য প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করবো।’