এনসিটি নিয়ে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা যায়: হাইকোর্ট

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিদেশি কোম্পানির চুক্তির চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নে জারি করা রুল খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্ট। এর ফলে চুক্তিটি নিয়ে আর কোনো আইনি বাধা থাকলো না বলে ভাষ্য আইনজীবীদের।

বৃহস্পতিবার, (২৯ জানুয়ারী ২০২৬) বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করে। এর আগে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে দ্বিধাবিভক্ত রায় দিলে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি এই তৃতীয় বেঞ্চ গঠন করে দেন। রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন জমির উদ্দিন সরকার, আহসানুল করিম, মাহবুব উদ্দিন খোকন ও আনোয়ার হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।

বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের পক্ষে সংগঠনটির সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন রিট মামলাটি করেন। এতে নৌসচিব, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়। এনসিটি পরিচালনায় ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করার নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদনটি করা হয়। রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ৩০ জুলাই হাইকোর্ট রুল জারি করে। রুলে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির চলমান প্রক্রিয়া কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। বিচারপতি হাবিবুল গনি ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর বেঞ্চ এ রুল জারি করে।

পরবর্তীতে বিচারপতি ফাতেমা নজিব ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুলে দ্বিধাবিভক্ত রায় দিলে প্রধান বিচারপতি বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে তৃতীয় বেঞ্চে পাঠায়। চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে সবচেয়ে বড় এনসিটি। এ টার্মিনালের পাঁচটি জেটির মধ্যে চারটিতে কনটেইনারবাহী বড় জাহাজ এবং অন্য একটি জেটিতে অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলাচলকারী ছোট জাহাজ ভেড়ানো হয়।

২০২৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে যত কনটেইনার ওঠা-নামা করে, তার ৪৪ শতাংশই হয়েছে এনসিটিতে।

বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়ে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে এনসিটির পাঁচটি জেটি নির্মাণ কাজ শেষ হয়। নির্মাণ কাজে বন্দরের খরচ হয়েছিল ৪৬৯ কোটি টাকা। এর দুই বছর পর এনসিটির জন্য যন্ত্রপাতি কিনতে বিনিয়োগ করার শর্তে পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটর নিয়োগে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। তখন বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আগ্রহীও ছিল। পরে সেই দরপত্র বাতিল করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

তারপর টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য ২০১২ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এরপর দরপত্র সংশোধনের নামে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে মামলা হলে টার্মিনালের ইজারা ঝুলে যায়।

নানা আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১৫ সালের ২৫ জুন এনসিটির ৪ ও ৫ নম্বর জেটি পরিচালনায় বন্দরের সঙ্গে চুক্তি করে সাইফ পাওয়ার টেক এবং এর দুই অংশীদার কোম্পানি।

ওই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর এনসিটির ২ ও ৩ নম্বর জেটি পরিচালনায় বন্দরের সঙ্গে চুক্তি করে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড।

দরপত্রের মাধ্যমে দুই বছরের জন্য তারা এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিল।

২০১৫ সালের ১৭ অক্টোবর এনসিটিতে কনটেইনার ওঠানামার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।

পরে এনসিটির পরিচালনায় আর দরপত্র ডাকা হয়নি। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) প্রতি ছয় মাসের জন্য এনসিটির টার্মিনালগুলো পরিচালনা করে আসছিল সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড।

টানা ১১ বার সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এনসিটি পরিচালনা করে সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড। এরপর চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ বারের মতো আরও ছয় মাসের জন্য তাদের এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়।

শুরু থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এনসিটি পরিচালনায় ‘কি-গ্যান্ট্রি ক্রেইন’ ও ‘রাবার টায়ারড গ্যান্ট্রি ক্রেইনসহ’ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ খরচ করেছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা।

এনসিটিতে বছরে ১০ লাখ একক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা আছে। ২০২৪ সালে দেশি বেসরকারি অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেক এনসিটিতে ১২ লাখ ৮১ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এনসিটি পরিচালনার ভার বিদেশি অপারেটরের কাছে দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তখনই এনসিটি পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম আলোচনায় আসে।

গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর অর্ন্তবর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। আওয়ামী লীগ সরকারের মতো অর্ন্তবর্তী সরকারও এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর নিয়োগে আগ্রহের কথা জানায়। এবারও আলোচনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম রয়েছে। কিন্তু সরকারের তরফে এ নিয়ে অবস্থান জানানোর পর বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা শুরু হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক দল, বিভিন্ন বাম সংগঠন, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে এরইমধ্যে।

চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনায় বিদেশি কোম্পানিকে যুক্ত করার পদক্ষেপ, রাখাইনের জন্য মানবিক করিডোরের উদ্যোগ, স্টারলিংকের ইন্টারনেট সেবা চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধচক্রে’ জড়ানোর চেষ্টা বন্ধের দাবিতে গত ২৭ ও ২৮ জুন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে রোড মার্চও করেছে কিছু বাম সংগঠন।

তবে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনা বিদেশিদের হাতে তুলে দিলে ‘নিরাপত্তা হুমকি তৈরি হবে না’ দাবি করে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস গত ৬ জুন জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বলেছিলেন, ‘বন্দর ব্যবস্থাপনার জন্য আমরা যাদের আনছি, তারা পৃথিবীর যেসব দেশে কাজ করে সেসব কোনো দেশেরই সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েনি।’

‘জাতীয়’ : আরও খবর

» রিট সরাসরি খারিজ, ৫০তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা আজ

» কার্ড জটিলতা নিরসনে ইসিকে সাংবাদিকদের আলটিমেটাম

» বিইআরসির গণশুনানি: বেশি দামে তেল বিক্রি, ভোক্তাদের তোপের মুখে বিপিসি

» টেংরাটিলা বিস্ফোরণ: আন্তর্জাতিক আদালতের রায় বাংলাদেশের পক্ষে

» কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব সহ্য করা হবে না: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

» প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ এর পক্ষে ভোট চাওয়া দ-নীয় অপরাধ: ইসি

সম্প্রতি