জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটছে। এতে কমপক্ষে তিনটি রাজনৈতিক হত্যাসহ ২শ’ ঘটনা ঘটছে।
বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক হত্যা, হুমকি, ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও আগুন
সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি
গত ১২ ডিসেম্বর থেকে শুরু করে চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি রাত ৯টা পর্যন্ত সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুসন্ধানী পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেলে রোববার পর্যন্ত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের নিরাপত্তা টহল আরও বাড়ানো হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা কার্যক্রম। মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি। যৌথ বাহিনীর টহল চলছে।
পুলিশ সদর দপ্তরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুসন্ধানে জানা গেছে, এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো প্রচারণা চালানোর সময় এক দলের নেতাকর্মীরা আরেক দলের নেতাকর্মীদেরকে ভয়-ভীতি দেখানো থেকে শুরু আক্রমণাত্মক আচরণ করছে। এ ধরনের প্রায় ১৫টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় কর্মী থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রাথীর ওপরও আক্রমণ করা হয়েছে। এ ধরনের ৯টি ঘটনা ঘটেছে। খোদ রাজধানীতে একজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটছে।
রাজনৈতিক হত্যাকান্ডঃ গত ২৮ জানুয়ারি দুপুর ২টার দিকে সহকারী রিটানিং কর্মকর্তা ঝিনাইগাতী উপজেলা কর্তৃক আয়োজিত ঝিনাইগাতী মিনি স্টেডিয়াম মাঠে এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রাথীদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠান হচ্ছিল।
উক্ত অনুষ্ঠানে শেরপুর-৩ আসনের এমপি প্রার্থীরা, সহকারী রিটানিং কর্মকর্তা ঝিনাইগাতী উপজেলা ও থানার ওসি ঝিনাইগাতী উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠান শুরুতে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত ইসলামী নেতাকর্মীতের মধ্যে চেয়ার নিয়ে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। এতে দুইপক্ষের কমপক্ষে ২৫/২৬ জন আহত হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছেন।
এর জেরে ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটের সময় ঝিনাইগাতী বাজারের ধানহাটি মোড়ে উপজেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির নেতদাকর্মীরা লাঠিসোটাসহ অবস্থানকালে নির্বাচনী ইশতেহার স্থল মিনি স্টেডিয়াম মাঠ হতে জামায়াত ইসলামীর নেতাকর্মীরা উপজেলা বিএনপি দলীয় কার্যালয়ের সামনে দিয়ে তাদের গন্তব্যস্থলে যাওয়ার সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটানিং কর্মকর্তা, কর্তব্যরত পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ওসি ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তারা পরিস্থিতির যাতে অবনতি না ঘটে তার জন্য ওই রাস্তা দিয়ে না যেতে বারবার অনুরোধ করছিল বলে পুলিশ দাবি করছেন। এরপরও জামায়াত ইসলামীর নেতাকর্মী ও সমর্থকরা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ইট-পাথর নিক্ষেপ ও মারামারির ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষের প্রায় ২৫/২৬ জন আহত হয়েছে। তাদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আহত রেজাউল করিম, পিতা মওলানা আব্দুল আজিজ, সাং গোপাল খিলা, শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারির অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তার সমর্থকরা সেই অবস্থায় তাকে চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে রাতে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এভাবে নির্বাচনী সহিংসতায় মোট ৩টি জনের মৃত্যু হয়েছে।
সংঘর্ষ: জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণাকালে সারাদেশে বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে ৭৩টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে সম্প্রতি লক্ষীপুর জেলার ৭নং বশিকপুর ইউনিয়নের শিবরামপুর গ্রামে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে কমপক্ষে ৬ জন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। পরবর্তীতে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। এরপর এখনও নির্বাচনী প্রচারণার সময় ছোটখাটো ঘটনা ঘটছে।
এভাবে দেশের জেলা ও উপজেলায় নির্বাচনী প্রচারণার সময় ছোটখাটো বিষয় নিয়ে তর্কবিতর্ক থেকে তা সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।
এসব ঘটনা অনেকটা তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মীমাংসা করে দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বড় ঘটনা ঘটলে পুলিশ আইনি ব্যবস্থাও নিচ্ছেন।
অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারঃ নির্বাচনী প্রচারণার সময় অনেকেই অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শন ও ব্যবহার করছে। এ ধরনের ২টি ঘটনা চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
হুমকি ও ভয়ভীতি: নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রায় একপক্ষ আরেক পক্ষকে নানাভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে। এ ঘটনা প্রায় ৮টি রেকর্ড করা হয়েছে।
প্রচারকাজে বাধা: নির্বাচনী প্রচারের সময় একপক্ষ আরেক পক্ষকে প্রচারকাজেও বাধা দিচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা শহরের চেয়ে গ্রামগঞ্জে বেশি ঘটছে। পুলিশের পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা ২২টি হবে। যেমন লিফলেট বিতরণে বাধার ঘটনা ঘটছে।
হামলা, ভাঙচুর: নিবাচনী প্রচারণার সময় এক দল আরেক দলকে টার্গেট করে সংঘাতে জড়িয়ে তাদের অফিস, প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করছে। এ ধরনের ঘটনা প্রায় ১৪টি হয়েছে।
অবরোধ: নিবাচনী কার্যক্রম পরিচালনার সময় প্রায় অবরোধ ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছে। আবার অনেকেই মনোনয়ন না পেয়ে আবার সীমানা নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করছে। সাধারণত এই ধরনের ১১টি ঘটনা ঘটছে। এছাড়াও নির্বচনী প্রচারণার সময় একটি চক্র সংখ্যালঘুদেওর ওপর আক্রমণ করছে। এমন ঘটনা পুলিশের তথ্য মতে কমপক্ষে একটি। তবে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেকেই ভয়ে অভিযোগ করে না।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিচ্ছিন্নভাবে ছোটখাটো ঘটনা কমপক্ষে ৪২টি রেকর্ড করা হয়েছে। সবমিলিয়ে পুলিশ সদস্য দপ্তর গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান মতে, প্রায় ২শ’ সহিংস ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। রোববার, (০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) পর্যন্ত এই সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পুলিশের একজন ডিআইজি জানান, নির্বাচনে এ ধরনের সংঘর্ষেও ঘটনা ঘটবে। তবে পুলিশের তৎপরতায় এ বছর এখনও সহিংসতা অনেক কম বলে ওই ডিআইজি মন্তব্য করেন।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটগুলো কাজ করছেন।
এছাড়াও বিজিবি ও সেনাবাহিনীর টহল বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না ঘটে তার জন্য বিজিবির সদস্যরা তৎপর রয়েছে। ১৩৪ প্লাটুনের বিজিবি সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন।
জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবির র্যাপিড অ্যাকশন টিম, কুইক রেসপন্স ফোর্স নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে। বিজিবির দায়িত্ব পালনের সময় তাদের কাছে বডি ওর্ন ক্যামেরা, মেটাল ডিটেক্টর, এপিসিসহ অন্যান্য সরঞ্জাম রয়েছে।
এদিকে কয়েকজন নগরবাসী বলেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় একপক্ষ আরেক পক্ষকে ঘায়েল করার জন্য যেভাবে উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে, তাকে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ডিম নিক্ষেপ, বকাবকিতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যা কাম্য নয় বলে অনেকেই মন্তব্য করেন।
এ সম্পর্কে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন ডিসি জানান, এখনও নির্বাচনী পরিবেশ তুলনা মূলকভাবে ভালো আছে। আর কেউ আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সুনিদিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।