image

বিশ্লেষণ

বায়ুদূষণে ‘গ্যাস চেম্বার’ হয়ে উঠছে ঢাকা

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

গুগলে ‘বায়ুদূষণে শীর্ষ শহর’ সার্চ দিলেই ঢাকা এসে পড়ছে। শুধু দিন বা মাস নয়, বছরের পর বছর ধরে বায়ুদূষণে বিশ্বের শীর্ষে থাকছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দূষিত রাজধানী শহরের নাম। অতিরিক্ত ধূলিকণা, বিষাক্ত ধোঁয়া আর অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে প্রায় প্রতিদিনই এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে শীর্ষ থাকছে ঢাকা। বাতাস হয়ে উঠেছে অত্যন্ত ‘অস্বাস্থ্যকর’,‘বিপজ্জনক’ আর ‘বিপর্যয়কর’। যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে। আর এভাবেই ধীরে ধীরে ‘গ্যাস চেম্বারে’ পরিণত হচ্ছে ঢাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বায়ুদূষণ মহামারির চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। বিপর্যয়কর দূষণে শারীরিক সমস্যায় পড়েছেন নগরবাসী। শ্বাসকষ্টজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে শ্বাসকষ্টজনিত রোগী আগের চেয়ে বেশি আসছেন। পরোক্ষভাবেও আক্রান্ত হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও সরকার নির্বিকার। বিপর্যয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করতে না পারা আর জনগণের প্রতি অবহেলার কারণেই দূষণ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

সর্বশেষ আজ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সোয়া ৮টার দিকে বিশ্বের ১০০টি নগরীর মধ্যে বায়ুদূষণে শীর্ষে উঠে এসেছে ঢাকা। এ সময়ে এখানকার বায়ুর মান ছিল ২৫৯, যা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বলে ধরা হয়। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, আজকের দূষণের মাত্রা ৪০০ ছাড়িয়েছে। যে অবস্থা ‘বিপর্যয়কর’ হিসেবে চিহ্নিত। ঢাকার যে ৮টি স্থানে বায়ুর মান অত্যন্ত খারাপ তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে নিকুঞ্জের এএসএল সিস্টেমস লিমিটেডের এলাকা। যেখানে বায়ুর মান উঠে গেছে ৪০৮-এ। অথচ কোম্পানিটি ঢাকার বায়ুর মান মনিটরিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র।

বায়ুদূষণের কথা তুললেই পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্তারা উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপান। বলেন, ভারতের দিল্লি বা পাকিস্তানের লাহোর বা করাচি হয়ে আসা উপমহাদেশীয় বায়ুপ্রবাহের কারণেই বাংলাদেশে এত দূষণ। তথ্য সত্য হলেও সেটাই একমাত্র বা বড় কারণ নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়নকেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদারের প্রশ্ন, উপমহাদেশীয় বায়ুপ্রবাহের কারণেই ঢাকায় এত দূষণ হলে, উৎসে থাকা অঞ্চল শীর্ষ থাকতো। অথচ সুদূর মিসরের কায়রোও বায়ুদূষণে শীর্ষে থাকে কীভাবে?

পরিবেশ অধিদপ্তরের বহু আইন থাকলেও তা মানা হয় না। আর মানার জন্য যে ক্যাপাসিটি দরকার সেটিও নেই সংস্থাটির। শীতে যে পরিমাণ দূষণ হচ্ছে এর উৎসগুলো খুঁজে প্রতিরোধ করতে পারছে না পরিবেশ কর্তারা। এক্ষেত্রে দায় গিয়ে পড়ে অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি সিটি গভর্ন্যান্স ও নাগরিকের কর্তৃত্ব, বিআরটিএ, বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির ওপর। সবার সমন্বয়েই দূষণ রোধ করতে হবে।’ অথচ বছরের পর বছর ধরে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে গৎবাঁধা কিছু কথা আর লোকদেখানো উদ্যোগ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে কিছুই করা হয়নি। বরং দিন দিন ঢাকাকে বায়ুদূষণের ‘গ্যাস চেম্বারে’ পরিণত করার চেষ্টা চলছে।

গ্যাস চেম্বারের প্রসঙ্গ এলেই আসে দিল্লির কথা। অসহনীয় ও লাগামছাড়া বায়ুদূষণের কারণে দিল্লি যে গ্যাস চেম্বার হয়ে উঠেছে তা প্রথম বলেছিলেন তৎকালীন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। গ্রিনপিস ও এয়ার ভিজ্যুয়ালের প্রতিবেদনে নয়া দিল্লি বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের ‘কৃতিত্ব’ লাভ করেছে। তাদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত ১০টি শহরের সাতটিই অবস্থিত ভারতে। সে সময় এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স-এ দিল্লির বায়ুদূষণের মান ৫০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। যা ‘সিভিয়ার প্লাস ইমারজেন্সি’ ক্যাটাগরিতে পড়েছিল।

বায়ুদূষণে ঢাকা ঠিক দিল্লির পথেই হাঁটছে। পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ বাস-ট্রাক থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া, অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত ঢাকনাযুক্ত নির্মাণকাজ, ঢাকার আশেপাশের ইটভাটাগুলো, যা প্রচুর পরিমাণে পার্টিকুলেট ম্যাটার ছড়াচ্ছে, শিল্প-কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও কঠিন বর্জ্য পোড়ানো, তাপমাত্রা ও বাতাসের প্রবাহ কমে যাওয়ায় দূষণ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে ঢাকায়। ফলে ঢাকাবাসীর গড় আয়ু মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপ বা দূষণকারী উৎসগুলো বন্ধ করার দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

» জাতীয় সংসদ নির্বাচন: ২শ’র বেশি সহিংস ঘটনা

সম্প্রতি