আওয়ামী লীগের পতনের পরে রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা, সংস্কার ও নির্বাচনের ‘ভিত্তি স্থাপনের’ যে প্রত্যাশা ও দায়িত্ব ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের, দেড় বছরেও সেসব ‘নাজুক’ বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ সরকারের ইতিবাচক যে অর্জন হয়েছে, তার তুলনায় ‘ঘাটতি বা পথভ্রষ্ট হওয়ার’ উপাদানের ‘পাল্লাটা তুলনামূলক ভারী’।
সোমবার, (০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) ঢাকার ধানমন্ডি মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে তিনি এ মন্তব্য করেন। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে যে অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটি আইনগত হোক, সাংবিধানিক হোক বা অন্য মানদ-ে...সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক ঝুঁকি আমরা দেখতে পাচ্ছি।’
সেই অবকাঠামোটিকে ‘দুর্বল মন্তব্য করে তিনি বলেছেন, ঝুঁকি প্রতিহত করার মতো সম্ভাবনা ‘দেখা যাচ্ছে না’।
সংবাদ সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন শাহজাদা এম আকরাম এবং মো. জুলকারনাইন। গবেষণা প্রতিবেদনে বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচন এবং রাষ্ট্র পরিচালনের নিরিখে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সার্বিক পর্যবেক্ষণে চারটি ক্ষেত্রেই সরকারের উল্লেখযোগ্য ‘অগ্রগতি ও অর্জন হয়েছে’ মন্তব্য করে ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। বিচার ও নির্বাচনের অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কার অবকাঠামো তৈরি হয়েছে।’
তবে অবকাঠামো ‘পর্যাপ্ত শক্তিশালী নয় এবং মজবুত নয়’ বলে ভাষ্য তার।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে যতটুকু মজবুত বা শক্তিশালী হতে পারতো, ততটুকু হয়নি। এর কারণে ভবিষ্যতেও এই ভিত্তিটা আরও দুর্বল এবং আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে।’
তার কথায়, ‘রাষ্ট্র সংস্কারের ম্যান্ডেট’ নিয়ে দায়িত্ব শুরু করা এ সরকার শুরু থেকে সংস্কারকে ‘শুধু সংস্কার’ হিসেবে দেখেছে, বাস্তবায়নের পথে ঝুঁকিগুলো বিশ্লেষণ করে নিরসনের উপায় অনুসন্ধান করার ‘প্রয়াস দেখা যায়নি’। ‘যার ফলে যতটুকু হয়েছে সংস্কারের ভিত্তি, সেটা দুর্বল থেকে গেছে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর অনড় অবস্থানের কারণে আমরা মনে করি যে জুলাই সনদ দুর্বল হয়েছে। জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে যে ধরনের সুপারিশগুলো ছিল বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের, সেই সুপারিশগুলোকে কেন্দ্র করে বড় রাজনৈতিক দলগুলো সবার এক ধরনের অনীহা ছিল।’
জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে যে গণভোট, সেটি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ‘বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে’ এবং বাংলাদেশের মধ্যে ‘দ্বিধা সৃষ্টি হয়েছে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে এ সরকারের নেয়া উদ্যোগের মধ্যে বিচার বিভাগের সংস্কারকে ‘সর্বোচ্চ’ হিসেবে দেখছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
তিনি বলেন, ‘মোটাদাগে আগে যেটা আমরা দেখেছি, কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিচার বিভাগের সংস্কারসহ বিশেষ করে মানবতাবিরোধী এবং দুর্নীতি অভিযোগের যে বিচার প্রক্রিয়া রয়েছে বেশ অ্যাগ্রেসিভলি, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত। সেখানে কিছু কিছু সুফল পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু আমরা যেটা লক্ষ্য করেছি, স্বাভাবিকভাবে ধীরগতি এবং প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা। আমি মনে করি যে, বিচার এবং প্রতিশোধ দুটির মধ্যে এক ধরনের একাকার করে হয়েছে। বাস্তবে বিচার কতটুকু প্রতিশোধ, সেই প্রশ্ন.. বিতর্কটা সব সময় থেকে যাবে বলে আমি মনে করছি।’
নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ‘অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কা’ থাকলেও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার যে প্রবণতা সব সময় ছিল, সেটি অব্যাহত আছে বলে মনে করেন ইফতেখারুজ্জামান।
সুষ্ঠু বা নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে কিনা এমন প্রশ্ন তুলে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘অর্থ, পেশীশক্তি এবং ধর্ম এই তিনটি শক্তির অপব্যবহার প্রকট দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে। যার ফলে বাস্তবে সমান প্রতিযোগিতাসহ কতটুকু সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, সেটি আমাদের দেখার বিষয়।’
এ সরকার প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অপসারণের মাধ্যমে ‘দলীয়করণ মুক্ত করার চেষ্টা করেছে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, আগের মনোপলিস্ট বা একটি প্রভাব থেকে বেরিয়ে সেখানে ‘ত্রিমুখী প্রভাব’ বিরাজ করছে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে অবাধ তথ্যের প্রবাহ, যেটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ব্যাপকভাবে প্রত্যাশিত ছিল মানুষের। সরকারের অঙ্গীকারের মধ্যে ছিল, জাতির কাছে সরকার প্রধানের প্রথম যে ছিল ভাষণ ছিল, সেই ভাষণে পরিষ্কারভাবে বিষয়টির ওপরে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকারি দপ্তরে আমরা দেখেছিÑ সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা ছিল, অংশগ্রহণমূলক হয়নি এবং গোপনীয়তার সংস্কৃতিক কাজ করেছে।’
সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে ঘোষণা ছিল, উপদেষ্টা পরিষদ তাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যে সেটি করা হয়নি তা মনে করিয়ে দেন তিনি।
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন নিয়ে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে টিআিইবি নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘সেখানে সরকারের নির্লিপ্ততা বরং প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয় যে, নারী কমিশনের প্রতিবেদন তাদের সরকারের প্রতিবেদন নয়। এই এই ন্যারেটিভের ফলে একদিক থেকে প্রতিবেদনের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। অন্যদিক থেকে যারা নারী ক্ষমতায়নের প্রতিরোধক শক্তি, তাদের অতি ক্ষমতায়িত করেছে সরকার।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ‘সবচেয়ে দুর্বল’ জায়গা ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে সরকারের ‘শেষ সময়ে’ জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন এবং সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশকে ‘বিদায়ী পরিহাস’ আখ্যা দিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এটি একটা লোক দেখানো পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই নয়। লোক দেখানো পদক্ষেপের মাধ্যমে মিডিয়াকে আরও বেশি সরকারি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পাঁয়তারা ছাড়া আর কিছুই নয়।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যদি মব সন্ত্রাস যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রিত না হয়, তাহলে অন্য যে কোনো ক্ষেত্রের মধ্যে নির্বাচনে সেটা প্রভাব পড়তে বাধ্য। সেটা ইতোমধ্যেই যে দেখা যাচ্ছে না, তা নয়। এমনকি বিভিন্ন দলের মধ্যে যে সহিংসতা বা অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে সহিংস রূপ নিচ্ছে, সেখানেও কিন্তু শুধুমাত্র দলীয় কর্মী অংশগ্রহণ করছেন, সেটি নয়; এটি দেখার বিষয়।’
মবের বিষয়ে সরকার শুরু থেকে ‘তৎপরতা দেখাতে পারেনি মন্তব্য করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশে এই যে মবের বিষয়টা, কিন্তু শুরু হয়েছে সরকারের ভেতর থেকেই। সরকারের যে পরিচালন কেন্দ্রস্থল বাংলাদেশ সচিবালয়, সেখানে কিন্তু মবের উৎপত্তি প্রথম। সরকারের বাইরের শক্তি যাদের আমরা আজকে মব বলি, তারা ক্ষমতায়িত হয়েছে সেই মবের কারণে। সেই মব শক্তির কারণে কিন্তু সরকারের সেই নৈতিক স্থান দুর্বল হয়েছে।’
নির্বাচনি সহিংসতার বিষয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি যে, এখন থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি (আগামী) শুধু না; তার পরবর্তী বেশ কিছুদিন পর্যন্ত সহিংসতার ঝুঁকি রয়ে গেছে। এটি সরকার আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ভালো বুঝবেন।’