image

নিপাহ ভাইরাস

নতুন বিপদের শঙ্কা, প্রতিরোধ ও সতর্কতা

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

শীত আসলেই বাঙালি মেতে উঠে খেজুর রস আর পিঠার উৎসবে। শুরু হয় এক অন্য রকম আমেজ। কিন্তু সেই আমেজ সম্প্রতি রূপ নিচ্ছে ভয়াবহতায়। এই ভয়াবহতার নাম ‘নিপাহ ভাইরাস’

নিপাহ ভাইরাস শুধু মস্তিষ্ক বা ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায় বলেই ভয়ংকর নয়। এর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এই ভাইরাস মানবদেহের ইমিউন সিস্টেমকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। শরীর যখন ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে, তখন সেই লড়াইই উল্টো শরীরের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা ও আইসিডিসিআর এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে নিপাহ ভাইরাসে সংক্রমণের সংখ্যা ছিল ২ জন। দুইজনেরই মৃত্যু হয়েছে।

২০২২ সালে আক্রান্ত ৩ জনের মধ্যে ২ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৩ সালের এই বছর আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১১ জন, যার মধ্যে ৮ জন মারা যান। ২০২৪ সালে ৫ জন আক্রান্তের মধ্যে সবারই মৃত্যু হয়।

যদিও এ বছর বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যু বা আক্রান্তের কোনো খোজ পাওয়া যায়নি। তবে আমাদের পাশর্^বর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এশিয়ার বিভিন্ন অংশে উদ্বেগ ছড়িয়ে দিয়েছে। গত মাসের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গে পাঁচজন স্বাস্থ্যকর্মী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এছাড়া তাদের সংস্পর্শে আসা প্রায় ১১০ জনকে কোয়ারেন্টাইনে (সঙ্গনিরোধ) রাখা হয়েছে।

কেন নিপাহ ভাইরাস এত মারাত্মক

নিপাহ ভাইরাস এত প্রাণঘাতী হওয়ার মূল কারণ হলো, এটি ইমিউন সিস্টেমকে ভুল পথে পরিচালিত করে। ফলে শরীর সময়মতো ভাইরাসকে দমন করতে পারে না। এই ইমিউন বিপর্যয়ের কারণেই নিপাহ রোগীদের মধ্যে দেখা যায় তীব্র এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কে প্রদাহ), একাধিক অঙ্গ বিকল হওয়া এবং উচ্চ মৃত্যুহার। তাই এখনো পর্যন্ত নিপাহ মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো দ্রুত শনাক্তকরণ ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ।

নতুন বিপদের শঙ্কা

গত দুই বছরে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত শতভাগ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে এ রোগে ৭০ শতাংশের বেশি আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হতো। এদিকে, নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমে এলেও এটি এখন আগের চেয়ে বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া, দেশে প্রথমবারের মতো গরমকালে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

সমাধান

নিপাহ ভাইরাসে শরীর হারে কারণ সে চেষ্টা করে না বরং কারণ ভাইরাসটি ইমিউন সিস্টেমকে নিজের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করে। এখনো পর্যন্ত নিপাহের জন্য কোনগ অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তাই বিশেষজ্ঞরা তিনটি বিষয়ের জোর দেন। এগুলো হলো:

দ্রুত শনাক্তকরণ

সংক্রমিত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা

কঠোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ

এই তিনটিই নিপাহ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

নিপা ভাইরাস রোধে সতর্কতা

নিপা ভাইরাস মূলত শূকর ও ফলখেকো বাদুড়ের মতো প্রাণী থেকে মানবদেহে ছড়ায়। এসব প্রাণীর সরাসরি সংস্পর্শে এলে বা এদের লালা বা মলমূত্রের মাধ্যমে মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন।

মানুষের দেহে প্রবেশের পর এ ভাইরাস সাধারণত চার থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। সংক্রমণের প্রাথমিক বিভিন্ন লক্ষণ হচ্ছে, তীব্র জ্বর, বমি বমি ভাব, বমি ও শ্বাসকষ্ট, যা পরবর্তীকালে নিউমোনিয়ায় রূপ নিতে পারে। এমনটাই বলছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা।

খেজুরের রস নিরাপদ রাখার ভুল দাবি

নেট বা জাল দিয়ে ঢেকে বাদুড়ের মুখের সংস্পর্শ ঠেকানোর যে কথা বলা হয়েছে, তাকে পুরোপুরি অবাস্তব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

আইন হচ্ছে না

নিপাহ ভাইরাস থেকে সুরক্ষায় খেজুরের কাঁচা রস পান বন্ধ করা দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের কথা, বিজ্ঞাপন দিয়ে এর বিক্রিও বন্ধ করতে হবে। এর জন্য আইন দরকার। আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে এ বিষয়ে একাধিকবার বলা হয়েছে বলে জানান ডা. মুশতাক হোসেন।

উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার শূকর খামারিদের মধ্যে নিপাহ ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয়। ওই সময় এ ভাইরাসে ১০০ জনেরও বেশি মারা যান। যে গ্রামে প্রথম ভাইরাসটির খোঁজ মেলে, সেই নাম অনুসারেই এর নামকরণ হয়েছে। এরপর থেকে প্রায় প্রতি বছরই এশিয়াজুড়ে ভারত, ফিলিপিন্স, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। বাংলাদেশে তা নিয়মিতভাবে দেখা দিয়েছে। ভারতে প্রথম নিপা রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে। ভারতের এ রাজ্যটির সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে। বাংলাদেশেও ওই একই সালে মেহেরপুরে এই ভাইরাসটির প্রার্দুভাব হয়।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি