আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের গাইডলাইন চূড়ান্ত করা হয়েছে।ইতোমধ্যে সব নির্দেশিকা মাঠ পর্যায়ে কনস্টেবল থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেয়াও হয়েছে। সেই সঙ্গে নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকালে চূড়ান্ত করা হয়েছে পুলিশের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলোও। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সাংবাদ ডিজিটালকে জানিয়েছেন, সদর দপ্তরের গাইডলাইন মাঠ পর্যায়ে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারি পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়েছে। তারা সেই নির্দেশ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন। তার আগে নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য এবারই প্রথম দেড় লাখ পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এইবার স্লোগান থাকবে, “পুলিশ জনপদে, ভোট দিবেন নিরাপদে। ”
গাইডলাইনে পুলিশের বর্জনীয় তালিকায় রয়েছে, কোনো প্রার্থী অথবা প্রার্থীর এজেন্ট কিংবা সমর্থকদের কাছ থেকে খাবার/উপঢোকন/অন্য কোনো সুবিধা নেয়া যাবে না। এমনকি প্রার্থীর সঙ্গে ছবি তোলা, আলাপচারিতা বা ঘনিষ্ঠ হওয়া যাবে না। আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে না গেলে বলপ্রয়োগ বা লাঠিচার্জ করা যাবে না। এ ভাবে নানা ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
পুলিশের করণীয়: পুলিশের ভূমিকা ও উদ্দেশ্য হচ্ছে গণতন্ত্রের ভিত্তি রক্ষা, আইনের শাসন বজায় রাখা, জণগণের আস্থা অর্জন করা, ভোটাধিকার ও গোপনীয়তা রক্ষা করা ও নিরাপত্তা ও সতর্ককতার দিক বিবেচনা করা। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা, নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। ভোটারদের অবাধ ও স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার পরিবেশ সুনিশ্চিত করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা গোষ্ঠির পক্ষে অবস্থান করা যাবে না। স্থানীয় জননিরাপত্তা রক্ষা ও ভোটগ্রহণ চলাকালে শৃঙ্খলা রক্ষা ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করতে হবে।সকল রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা সমর্থকের প্রতি সমতা বা নিরপেক্ষতা রেখে আইনগত সহায়তা দিতে হবে।
এছাড়া ভোট কেন্দ্র, ব্যালট বাক্সসহ অন্যান্য সরঞ্জাম, প্রিজাইডিং অফিসারসহ নির্বাচন অফিসার ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। টয়লেট/ওয়াশ রুম ব্যবহারের সময় সঙ্গীয় ক্যামরাসহ অস্ত্রগোলাবারুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।শুধুমাত্র অফিসিয়াল প্রয়োজনে ফোন ব্যবহার করতে হবে। সব ধরনের কথাবার্তায় সংযমী ও দায়িত্ববান হতে হবে। উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে মতামত দেওয়া বা বা উসকানি বা উত্তেজনাপূর্ণ কথা বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কথাবার্তা ও মোবাল ফোন ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে।ভোটকেন্দ্রের ভেতরে আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ে প্রিজাইডিং অফিসারের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। জাল ভোট, ভয়ভীতি, সহিংসতা বা আচরণবিধি লঙ্ঘনের অপচেষ্টা হলে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
নারী প্রতিবন্ধী, বয়স্ক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ ও ভোট দিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের সময় প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও নির্বাচন অফিসারকে অবহিত করতে হবে।
পুলিশের বর্জনীয়: রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত পছন্দ প্রকাশ অথবা কোনো বক্তব্য দেয়া যাবে না। কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর মিছিলে অংশ নেওয়া বা কার্যালয়ে উপস্থিত থাকা যাবে না। কোনো রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা সমর্থকের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ যেমন, পছন্দের দলের প্রার্থীর আচরণবিধি লঙ্ঘন উপেক্ষা করা, অন্যান্য প্রার্থীর ন্যায়সঙ্গত দাবিতে সাড়া না দেয়ার মতো আচরণ করা যাবে না। পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তারা গালিগালাজ, হুমকি বা অবমাননাকর কোনো আচরণ করতে পারবেন না।নির্বাচনী আইন ও বিধিমালার পরিপন্থি কোনো নির্দেশ পালন করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক পোস্ট বা শেয়ার বা কমেন্ট করা যাবে না। প্রচারণায় অযাচিত হস্তক্ষেপ বা একপাক্ষিক সহায়তা দেওয়া যাবে না।
দায়িত্বকালে অপ্রয়োজনে ফোন ব্যবহার বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় থাকা যাবে না। এছাড়াও ভোটগ্রহণের দিন ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় মোবাইল ফোন ব্যবহার একদমই নিষিদ্ধ। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে অনৈতিক আচরণ কিংবা অসাদাচরণ করা যাবে না। নির্বাচন সংক্রান্ত সংবেদনশীল কোনো তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। ভোটের ফলাফল বা সম্ভাব্য বিজয়ী প্রাথী সম্পর্কে পূর্বানুমান কথোপকথন করা যাবে না। অফিসিয়াল রিকোয়েস্ট ছাড়া কোনো অবস্থাতেই কোনো স্পর্শকাতর ঘটনার ছবি/ভিডিও কারও কাছে পাঠানো যাবে না। কোনো ধরনের ব্যক্তিগত আলাপে মশগুল হওয়া যাবে না। একত্রে জড়ো হয়ে উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি করা যাবে না।
বাদাম, ভাপা পিঠা, চানাচুর, জিলাপি, বিস্কুট, কলা ইত্যাদি মুখরোচক খাবার খাওয়া, অশোভন পোশাক পরিধান ও অপেশাদার কাজ থেকে বিরত থাকাসহ বিভিন্ন বর্জনীয় নির্দেশ পুলিশকে পালন করতে হবে। বিশেষ করে পুলিশ সদস্য থেকে ইন্সপেক্টর পর্যন্ত এ নির্দেশ কঠোরভাবে পালন করতে হবে।
পুলিশের আচরণবিধি: দেয়ালে লিখে বা অংকন করে কোনো প্রকার নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না। সড়ক কিংবা জনগণের চলাচল বা সাধারণ ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত স্থানে নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপন করা যাবে না। নির্বাচনী প্রচারণা ও ভোটগ্রহণের সময় কোনো প্রকার ড্রোন বা এরকম ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে না। ধমীয় উপসনালয় বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কোনো সরকারি অফিস বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না। নির্বাচনী এলাকায় একক কোনো জনসভায় প্রয়্জোনীয় সংখ্যক মাইক্রোফোন বা লাউড স্পিকার ব্যবহার করতে পারবেন। নির্বাচনী এলাকায় মাইক বা শব্দেরমাত্রা বর্ধনকারী যন্ত্রের ব্যবহার দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
প্রার্থী কিংবা তাদের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচনী ক্যাম্পে ভোটারগণকে কোনোরূপ কোমল পানীয় বা খাদ্য পরিবেশক বা কোনোরূপ উপঢোকন প্রদান করতে পারবেন না। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান বা ভোটারের নাম, ভোটার নম্বর ও ভোটকেন্দ্রের নাম উল্লেখপূর্বক ভোটার স্লিপ প্রদান করতে পারবেন। ভোট কেন্দ্রের ৪শ গজের মধ্যে উক্ত ভোটার স্লিপ বিরতণ করতে পারবে না।
অফিসার ও ফোর্সদের সতর্কতা: ভোটকেন্দ্রের ভৌগলিক অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জানা, যাতায়াত পথ, রাস্তা, প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে অবহিত হতে হবে। ভোটকেন্দ্রে স্থাপিত সিসি ক্যমেরার অবস্থান ও কার্যকারিতা সম্পর্কে অবহিত হতে হবে।ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ ও আনসার সদস্যদের এমনভাবে মোতায়েন করতে হবে যাতে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।আর বাহির থেকে কেউ কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করতে না পারে। যাদের ভোট দেয়া সম্পন্ন হবে, তাদের ভোট কেন্দ্রের বেষ্টিত তথা চারশ গজ ব্যাসার্ধ এলাকা ত্যাগ করতে অনুরোধ করতে হবে।বেষ্টিত এলাকায় আইন শৃঙ্খলা ও নিয়ম কাণুন কঠো ভাবে পালন নিশ্চিত করতে হবে। ভোট কেন্দ্রের নির্ধারিত চৌহাদ্দির মধ্যে নির্বাচন কমিশন অনুমোদিত কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ ব্যতীত অন্য কেউ কোনো ধরনের অস্ত্র বা বিস্ফোরক দ্রব্য লাঠি বা দেশীয় কোনো ধারালো বা ভোঁতা অস্ত্র বহন করতে পারবেন না।
ভোটারদের সঙ্গে সর্বদা বিনয়ী আচরণ করতে হবে। দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ, আনসার, দফাদার ও চৌকিদারগণ যেন কোনোভাবেই উত্তেজনার আচরণ না করেন এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। অস্ত্র গোলাবারুদের হেফাজতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলঙ্ঘন করতে হবে। পুলিশ,আনসার,দফাদার ও চৌকিদার সদস্যরা তাদের খাবার ও আবাসনের জন্য কোনো অবস্থাতেই কোনো প্রার্থী বা তার এজন্টের ওপর নির্ভরশীল হবেন না।
সাংবাদিকের জন্য নির্দেশনা: ভোটকক্ষের ভেতর থেকে সরাসরি সম্প্রচার, দুইয়ের অধিক সাংবাদিক একসঙ্গে একই ভোটকক্ষে প্রবেশ করতে পারবে না। কোনো সাংবাদিক ১০ মিনিটের বেশি ভোটকক্ষে অবস্থান করতে পারবেন না। ভোট দেয়ার গোপন কক্ষে কোনো ছবি তোলা বা ভিডিও করা যাবে না। ভোটকেন্দ্রে নিয়োজিত অফিসার ও নিরাপত্তা সদস্যদের সঙ্গে পরিচিত থাকা ও পারস্পারিক সহযোগিতা ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
স্ট্রাইকিং টিমের দায়িত্ব: নির্বাচনকালীন কুইক রেসপন্সের জন্য গঠিত আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী স্ট্রাইকিং টিম গুরুতর ও আকস্মিক আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকবে। তাদের দায়িত্ব হবে সহিংসতা, সংঘর্ষ, কেন্দ্র দখলের চেষ্টা বা গুরুতর বিশৃঙ্খলার খবর পেলে সুনিদিষ্টভাবে করণীয় সম্পর্কে জেনে দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়া। নির্বাচনকালীন কোনো সহিংসতা, মারামারি বা সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে আইনানুগ ও পরিমিত বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। প্রিজাইডিং অফিসার থেকে সাধারণ ভোটারদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
মোবাইল টিম, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা স্থানীয় পুলিশের অনুরোধে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। ভোটসংক্রান্ত সহিংসতা, কেন্দ্র দখল বা গুরুতর আইন লঙ্ঘনে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আটক করা ও আইনানুগ প্রক্রিয়া নিতে হবে। ভোগগ্রহণ শেষে ব্যালট বাক্সসহ অন্যান্য সরঞ্জাম পরিবহন, ভোটগণনা, কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও ফলাফল ঘোষণাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত ও নিয়মিত প্রবিবেদন জানাতে হবে।
মনিটরিং ও জবাবদিহিতা: কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধী চিহ্নিতকরণ, ঘটনাস্থল সংরক্ষণ, সিসিটিভি ও বডিওর্ন ক্যামরাসহ অন্যান্য মাধ্যমে সাক্ষ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।সিসিটিভি, মিডিয়া ফুটেজ, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ইসির মনিটরিং টিমের নজরদারিতে দোষী প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, দরকার হলে নির্বাচনী অপরাধে মামলা করতে হবে।নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯১ এর সর্বশেষ ২০২৫ সালের সংশোধনী অনুযায়ী নির্বচনী কাজে নিয়োজিত সব আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে ‘নির্বাচন কর্মকর্তা’র নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা অনীহা প্রকাশের মতো কোনো অপরাধ করলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে।