এক্সপ্লেইনার
দরজায় টোকা দিচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। চারদিকে ভোটের উৎসবমুখরতা। প্রার্থীরা যাচ্ছেন ভোটারের দরজায় দরজায়। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নির্বাচনী মাঠের চিত্র পাল্টে গেছে। নতুন, আনকোড়া বহু রাজনৈতিক দল এসে হাজির হয়েছে ভোটের মাঠে। চেনা মুখের পাশাপাশি দেখা মিলছে বহু অচেনা, অজানা মুখেরও। ভোটের এই ডামাডোলের চরিত্র ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পেছনে যারা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছিল সেই জেন-জিরাই ভোটের মাঠে পিছিয়ে পড়েছে। সেখানে পেছনের দরজা দিয়ে পুরোনোই সামনে হাজির হয়েছে।
গেল এক দেড় বছরে তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জিদের দেখা গেছে রাজনৈতিক ইতিহাসের অনন্য ভূমিকায়। বিশেষত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনে তরুণদের নেতৃত্ব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে। অনেকে ভেবেছিলেন, রাজনীতিবিমুখ তরুণরাই নির্বাচনী রাজনীতির নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলবে। তাদের হাত ধরে প্রথাগত রাজনীতির পুরোনো কাঠামো বদলাবে। তবে বাস্তবক্ষেত্রে ভোটের রাজনীতিতে জেন-জিদের সরাসরি নেতৃত্ব অপেক্ষাকৃত কম। উল্টো পুরোনো প্রথাগত রাজনৈতিক দল ও নেতারা আবারও নেতৃত্বে ফিরেছেন। ভোটের মাঠে তাদের কণ্ঠই বেশি উঁচু। ভোটাররাও তাদের ভুলতে পারছেন না।
প্রত্যাশিত ঘটনার বিপরীতমুখী প্রবণতা ব্যাখ্যা করতে হলে কিছু মৌলিক রাজনৈতিক ও কাঠামোগত বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। আগে বলা ভালো যে, তরুণরা আন্দোলনের শক্তি ঠিকই, তবে তারা অনেকটা রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে। এটা তো জানাই যে, ২০২০ দশকের শুরু থেকে বিশ্বজুড়ে জেন-জিদের নেতৃত্বে বিরোধী আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে শুরু করে যে ঢেউ আছড়ে পড়ে আফ্রিকা অবধি। জেন-জিদের এসব আন্দোলনের পেছনের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসমতা, দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব, সরকারের প্রতি আস্থা কমে যাওয়া। অনলাইনে তোলা সেই প্রতিবাদ শেষ অবধি রাস্তায় আন্দোলনে বাস্তবতা পায়।
বিশ্লেষকদের মতে, জেন-জিদের আন্দোলনগুলো একেবারেই অনিয়ন্ত্রিত, নেতৃত্বহীন তথা ‘হরাইজন্টাল’ ধাঁচের। সোজা কথায় তাদের আন্দোলনগুলো হঠাৎ আসা ঢেউয়ের মতো। সংগঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর মতো প্রবল আর কাঠামোবদ্ধ নয়। যার মাধ্যমে নির্বাচনী রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও সময় দিতে পারে। আন্দোলন করতে প্রয়োজন হয় শুধুই গণজোয়ার। আর বিপরীতে নির্বাচন পরিচালনা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি রাজনীতিতে প্রভাব সৃষ্টি করতে হলে দরকার দল, স্থানীয় কমিটি, অর্থ, নির্বাচনী নেটওয়ার্ক ও অভিজ্ঞতা। সড়কে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো কিংবা প্রবল শক্তিতে আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে দেওয়ায় সক্ষম জেন-জিদেরর মধ্যে সেগুলো এখনও অনুপস্থিত। যে কারণে প্রবল আন্দোলন তৈরি করতে পারলেও সংগঠিত রাজনৈতিক পরিমণ্ডল তৈরিতে তাদের সক্ষমতা অনেকটা ধীরগতির।
তরুণ তথা জেন-জিদের প্রবল উত্থান ঘটেছে প্রাথমিকভাাবে অনলাইনে। সেখান থেকে প্রসারিত হয়েছে তা রাস্তায়। ভার্চুয়াল জগত আর বাস্তব জগতের মধ্যে বিশাল এক ফারাক রয়েছে। জেন জিদের মূল শক্তি কাজ করছে অনলাইন সংগঠনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও, হ্যাশট্যাগ ও দ্রুত জনমত তৈরিতে তারা দারুণ কার্যকর। বিপরীতে নির্বাচনী রাজনীতির মাঠ গোছানো, কাঠামো তৈরি বা দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি তৈরিতে এসব অনলাইন ‘বসরা’ যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন না। অনলাইনে প্রচার ও জনমত তৈরির টুলস হিসেবে সামাজিকমাধ্যম যথেষ্ট কার্যকরী হলেও গ্রাম, ওয়ার্ড বা ইউনিয়নভিত্তিক ভোটার সংগঠন ও স্থানীয় যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরিতে তা তেমন কাজে আসে না। সেখানে যে সময় প্রয়োজন হয়, প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষেই তা অনেকটা সম্ভব হয়ে ওঠে।
আবার আরেক ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে, জেন-জিদের অনেকেই আছেন, যারা আন্দোলনে ভীষণ সক্রিয় অথচ ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত। জরিপগুলো দেখাচ্ছে যে, তরুণদের উল্লেখযোগ্য অংশ ভোট দিতে আগ্রহী হলেও নিজের পছন্দ ও দল নির্বাচন করতে খানিকটা সিদ্ধান্তহীন। যা ভোটের দিনে ভোটকেন্দ্রে তাদের উপস্থিতি আর নির্বাচনী অভিজ্ঞতাকে অনেকটা প্রভাবিত করে। এক্ষেত্রে প্রচলিত রাজনৈতিক সংগঠনগুলো আর সমর্থকরা ভীষণ সক্রিয়। তারা যেকোনোভাবে ভোটের দিনে সরব থাকতে চায়।পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন আদায় করে নেয়।
জেন-জিদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দল বা সংগঠন হঠাৎ গড়ে উঠতে পারে না। বিপরীতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি সংগঠন, স্থানীয় নেতাদের নেটওয়ার্ক, আর্থিক শক্তি ও ভোটারদের পরিচিতি। এসব উপকরণ নির্বাচনী বা ভোটের রাজনীতির ক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, তরুণদের আন্দোলনের চেতনা, উত্তেজনা প্রবল থাকলেও, পরিচিত রাজনৈতিক নেতাদের ‘পেছনের দরজায়’ উপস্থিতি ছাড়া জেন-জিদের ভোটের মাঠে জয় তুলে আনা সত্যিই কঠিন।
জেন-জি প্রজন্ম বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামাজিক সমতা, রাষ্ট্রীয় গণতন্ত্র, দমন-নিরাপত্তা, দুর্নীতিবিরোধী বার্তা নিয়ে প্রভাবিত হয়, প্রবল আন্দোলনে নেমে পড়তে পারে। যে বার্তা নির্বাচনের সময়ও কার্যকর হতে পারে। তবে ভোটের মাঠে সেই বার্তা নির্দিষ্ট পরিকল্পনা, রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির সঙ্গে মিলিয়ে কার্যকরভাবে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে হয়। এক্ষেত্রে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোই জেন-জিদের চেয়ে এগিয়ে থাকে। কারণ তারা দৃঢ় ও সংগঠিত।
ফলস্বরূপ দেখা যায়, জেন-জিরা স্বৈরাচার শক্তির পতনের মতো আন্দোলন জমাতে পারলেও নির্বাচনী রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে না। সংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর অভাবে নির্বাচন মাঠে তুলনামূলকভাবে তাদের পিছিয়ে পড়তে হয়। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, অন্দোলন ও রাজনীতি এক জিনিস নয়। আন্দোলনে থাকে প্রবল আবেগ আর দ্রুত বিকাশের ক্ষমতা। তবে রাজনীতি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সংগঠন ও স্থানীয় স্তরের দীর্ঘমেয়াদি আয়োজন।
সারাদেশ: দুপচাঁচিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় যুবক নিহত