image

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ‘জাতীয় ঐকমত্য গঠনের’ আহ্বান বিশেষজ্ঞদের

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

দেশে চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত, টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, এজন্য দেশের স্বার্থে দলমত নির্বিশেষে জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে দল সরকার গঠন করবে তাদেরই এ উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের আগে দলগুলোর ইশতেহারে এ সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি এবং বিদ্যুৎ জ্বালানি খাত নিয়ে তাদের কর্মপরিকল্পনা থাকা জরুরি।

দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে এ সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি ও কর্মপরিকল্পনা থাকা জরুরি

সরকার পরিবর্তন হলে নীতিমালাও যদি বদলে যায়, তাহলে পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না: বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু

সরকার কিংবা বিরোধীদল; জামায়াত ইসলামী যে অবস্থায়ই থাকুক, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে: জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের

‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট উত্তরণে আগামী সরকারের জন্য টেকসই পথনির্দেশনা’ শীর্ষক এক সংলাপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে গত মঙ্গলবার এ সংলাপের আয়োজন করে ইংরেজি অনলাইন সংবাদ মাধ্যম জাস্ট এনার্জি নিউজ টুয়োন্টিফোর ডট কম। সংবাদ মাধ্যমটির সম্পাদক ও প্রকাশক মো. শামীম জাহাঙ্গীর অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।

সংলাপে জ্বালানি বিশেষজ্ঞর ও এ খাতের বিশ্লেষকরা বলেন, জ্বালানি চাহিদা নিরূপণের ক্ষেত্রে অতীতের ‘অতিরঞ্জিত পূর্বাভাস পরিহার করে’ তথ্যভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। কারণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এখনও গভীর সংকটে রয়েছে।

সংলাপে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘বিদ্যুৎ একটি জটিল বিষয়। বিদ্যুৎ একদিকে বাণিজ্যিক পণ্য, অন্যদিকে এটি রাষ্ট্র পরিচালিত একটি জনসেবামূলক ব্যবস্থা। সরকারকে একদিকে উৎপাদন ও ব্যয়ের হিসাব রাখতে হয়, অন্যদিকে জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হয়।’

এই ভারসাম্য রক্ষা করতে গভীর চিন্তাভাবনা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন, যা পাঁচ বছরের মেয়াদে সম্ভব নয় মন্তব্য করেন বিএনপির আমলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা এই রাজনীতিবিদ।

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, সরকার পরিবর্তন হলে নীতিমালাও যদি বদলে যায়, তাহলে পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘জাতীয় ইস্যুতে সব রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে ঐকমত্য প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিটি নতুন সরকারের সঙ্গে নীতি পরিবর্তন সমস্যার সমাধান করে না বরং অনেক ক্ষেত্রে সংকট আরও বাড়িয়ে তোলে।’

তিনি বলেন, ‘জামায়াত ইসলামী জাতীয় ইস্যুতে বাস্তবভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তাবনা প্রস্তুত করেছে, যা আগামী সরকারের নীতি প্রণয়নে ব্যবহার করা যেতে পারে।’ সরকার কিংবা বিরোধীদল, জামায়াত ইসলামী যে অবস্থায়ই থাকুক জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দলের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে বলে আশ্বাস দেন এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক জ্বালানি খাতে অবহেলার কারণেই বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির জন্য এফএসআরইউর সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত-এই বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।’

বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘২০০১ সালের পর থেকে কোনো বাস্তবসম্মত রিজার্ভার ব্যবস্থাপনা সমীক্ষা করা হয়নি। গত ১৬ বছর ধরে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম কার্যত বন্ধ ছিল। জ্বালানি খাতে বরাদ্দ সীমিত থাকলেও বিদ্যুৎ খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। প্রাথমিক জ্বালানিতে বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, ‘কয়লা খাতে কোনো অগ্রগতি হয়নি এবং ১৯৯৬ সালের পর থেকে কোনো সমন্বিত জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করা হয়নি।’

জালাল আহমেদ বলেন, ‘নতুন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিবর্তে বিদ্যমান সম্পদের দক্ষ ব্যবহার ও বিকল্প জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেয়া জরুরি। বিশেষ করে, ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শর্তানুযায়ী রপ্তানি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এখনই নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।’

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৭/৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। তিনি আরও বলেন, দেশের মোট জ্বালানি ও বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানিনির্ভর, যা গত এক বছরে আরও বেড়েছে।

এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ জানান, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা কমপক্ষে ৪০০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ গড় দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২৫০০-২৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যার প্রায় ৫৯-৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্যাপটিভ পাওয়ারে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘গৃহস্থালি খাতে গ্যাস ব্যবহারের হার দেখানো হয় প্রায় ১১ শতাংশ, কিন্তু বাস্তবে তা ৫-৬ শতাংশের বেশি নয়। অন্যদিকে, গ্যাস বিতরণ ও সঞ্চালন কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লস দেখানো হচ্ছে প্রায় ৮.৫ শতাংশ। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহের ৩০-৩৩ শতাংশ আমদানিকৃত এলএনজি। ফলে এই ১০ শতাংশ ক্ষতি সরাসরি এলএনজির ক্ষতির সমান, যার আর্থিক মূল্য বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ।’

বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের (বিইপিআরসি) সদস্য ও অতিরিক্ত সচিব ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ, বায়োমাস এবং ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ড. রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব নয়। গবেষণাভিত্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য নীতির মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা এবং জ্বালানি সাশ্রয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বিগত সরকারের আমলে করা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চুক্তিগুলো খতিয়ে দেখার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় রিভিউ কমিটির আহ্বায়ক সাবেক বিচারপতি মাইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল ও কয়লার ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। যদিও দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, তবু গ্যাস সংকট ও বৈশ্বিক জ্বালানির দামের ওঠানামা এই খাতকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।

তিনি বলেন, এই প্রেক্ষাপটে এলএনজি আমদানি, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সংযোগ এবং সৌর, বায়োমাস ও পারমাণবিক শক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ খাত অস্থিতিশীল থাকলে দ্রুত শিল্পায়ন ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘নতুন সরকারকে কঠিন সময় অতিক্রম করতে হবে এবং রাজনৈতিকভাবে জটিল সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিদ্যুৎসংক্রান্ত কোনো চুক্তি বাতিলের আগে চলমান পরিস্থিতি যাচাই ও পর্যালোচনা করা জরুরি, নচেৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হবে এবং জনগণ ভোগান্তিতে পড়বে।’ তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সূক্ষ্ম ব্যবস্থাপনা (মাইক্রোম্যানেজমেন্ট) এবং কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ অপরিহার্য হবে।

লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মুশতাক হোসেন খান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে কয়েকটি গুরুতর ও অমীমাংসিত সংকটের মুখোমুখি, যা ধসের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে প্রায় ৩৫ শতাংশ খেলাপি ঋণ এবং বিদ্যুৎ খাতের গভীর আর্থিক সংকট সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংকটের মূল কারণ নীতির অভাব নয়, বরং ২০১০ সাল থেকে চলমান প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। বিদ্যুৎ উৎপাদন চারগুণ বৃদ্ধি পেলেও ব্যয় বেড়েছে ১১ গুণ এবং ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে ২০ গুণ।’

বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আগামী সরকারের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর সাবেক সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজুল্লাহ, বিইআরসির সাবেক সদস্য মো. মিজানুর রহমান, চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সিইও এম. জাকির হোসেন খান, আইইইএফএ-এর লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম, এলপিজি অটোগ্যাস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সেরাজুল মাওলা, এলওএবি-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন রশিদ, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল ফারহান নূর এবং রবির চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার শহীদ আলম প্রমুখ।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি