চট্টগ্রাম বন্দর নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটরের কাছে ইজারা দেয়ার সরকারি উদ্যোগের প্রতিবাদে আন্দোলনরত শ্রমিক ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলতে এসে বৃহস্পতিবার (০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) তোপের মুখে পড়েন নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। অবশ্য দুইপক্ষের বৈঠক শেষে কর্মবিরতি দুই দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি, ৫১ হাজার কনটেইনার আটকা
বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীদের টানা কর্মবিরতিতে কার্যত অচল হয়ে পড়া চট্টগ্রাম বন্দর সচল করতে বৃহস্পতিবার সকালে জরুরি বৈঠকে যোগ দিতে বন্দর এলাকায় যান নৌ উপদেষ্টা। সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে বন্দর প্রশাসনিক ভবনের দিকে যাওয়ার সময় ৪ নম্বর গেটের বাইরে আন্দোলনরত শ্রমিকদের বাধার মুখে পড়ে গাড়ি থেকে নামতে হয় তাকে।
এ সময় শ্রমিকরা সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব দেয়ার উদ্যোগের বিরোধিতা করে স্লোগান দেন। পাশাপাশি বন্দর চেয়ারম্যান এস এম মুনিরুজ্জামানের অপসারণের দাবিও তোলেন তারা। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, গত এক বছর ছয় মাসে চেয়ারম্যান ইচ্ছাকৃতভাবে শ্রমিক-কর্মচারীদের হয়রানি ও শাস্তি দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন উপদেষ্টার সামনে বলেন, তারা দেশবিরোধী নন এবং বন্দরে কোনো ‘মাফিয়া’ বা বিদেশি স্বার্থের দখল মেনে নেয়া হবে না।
শ্রমিকদের শান্ত করতে নৌ উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান এবং আশ্বাস দেন যে, বৈঠকে বন্দর চেয়ারম্যান উপস্থিত থাকবেন না। এ আশ্বাসের পর আন্দোলনকারীরা শান্ত হন এবং তাকে ভেতরে যেতে দেন। এ সময় উপদেষ্টাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কঠোর নিরাপত্তা দিতে দেখা যায়। পরে দুপুর ১২টায় বন্দর ভবনের কনফারেন্স রুমে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন নৌ উপদেষ্টা। বৈঠকে সন্তোষজনক সমাধানের আশ্বাস দেয়াতে চলমান কর্মবিরতি দুইদিনের জন?্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়।
এর আগে বেলা ১১টার দিকে কাস্টমস নিলাম শেড এলাকায় বিএনপিপন্থি শ্রমিকরা আবারও উপদেষ্টার গাড়ি আটকে দেন। তারাও এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করার পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে আলাদা আলোচনার আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
বৈঠক শেষে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাংবাদিকদের নৌ উপদেষ্টা বলেন, বন্দর বন্ধ না রেখেও দাবি আদায় করা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘পাঁচ দিন কাজ বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ভোগান্তিতে পড়ছে। সামনে রমজান, পণ্য সরবরাহ যাতে ব্যাহত না হয় সে বিষয়ে সরকার সচেষ্ট।’
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের ক্ষোভ আছে, সেটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে তিনি আশাবাদী।
এদিকে বন্দর শ্রমিকদের টানা কর্মবিরতির কারণে বৃহস্পতিবারও দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর কার্যত অচল ছিল। একটানা আন্দোলনের ফলে বন্দর ও বেসরকারি ডিপোতে প্রায় ৫১ হাজার আমদানি ও রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার আটকা পড়েছে। এতে শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি বাণিজ্য এবং আসন্ন রমজান মাসে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
গত শনিবার জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ব্যানারে ৮ ঘণ্টা, সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ২৪ ঘণ্টা এবং মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হয়। কর্মবিরতির ফলে বন্দরের ভেতরে কোনো অপারেশনাল কাজ চালানো সম্ভব হয়নি।
বহির্নোঙরে থাকা মাদার ভেসেলগুলো পণ্য খালাস করতে পারছে না। কনটেইনার জাহাজ বার্থিং এবং জাহাজীকরণও বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় বেসরকারি ডিপোগুলোতে রপ্তানি কনটেইনারের জট বাড়ছে।
বন্দর সূত্র জানায়, গত মঙ্গল ও বুধবার কোনো কনটেইনার ডেলিভারি কিংবা জাহাজীকরণ হয়নি। গত সোমবার বন্দরে মোট ৯৮টি জাহাজ অবস্থান করছিল। এর মধ্যে জেটিতে ১৭টি এবং বহির্নোঙরে ৮১টি জাহাজ রয়েছে। বুধবার বন্দরের অভ্যন্তরে কনটেইনার ছিল ৩৭,৩১২ টিইইউ। যার মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার কনটেইনার পুরোপুরি আটকা।
বেসরকারি ডিপোতেও সমস্যা দেখা দিয়েছে
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) জানায়, ১৯টি ডিপোতে বর্তমানে রপ্তানি কনটেইনার আছে ১১ হাজার। আমদানি কনটেইনার আছে ৮ হাজার এবং খালি কনটেইনার আছে ৫২ হাজার। গত তিনদিনে রপ্তানি কনটেইনার বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার।
বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বিপ্লব বলেন, ‘বন্দর কার্যক্রম স্বাভাবিক না হলে রপ্তানি পণ্যের জট আরও ভয়াবহ আকার নেবে।’
এদিকে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসও বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন জানায়, দাপ্তরিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় গত চার দিনে ৩৬টি মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস সম্ভব হয়নি। বর্তমানে বহির্নোঙরে প্রায় ১০০ জাহাজ পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে।
অন্যদিকে পবিত্র রমজান সামনে। ভোগ্যপণ্যের বাজারে এসব কারণে বিরূপ প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘রমজান মাসকে সামনে রেখে ছোলা, ডাল, খেজুর, চিনি ও তেলের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু বন্দরে কাজ বন্ধ থাকায় এসব পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। দু-এক দিনের মধ্যে দাম বেড়ে যেতে পারে।’
তাছাড়াও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে তৈরি পোশাক শিল্প। চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থায় বড় ধাক্কা খাচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্প খাত। এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ সালাম জানান, চলতি সপ্তাহে ৬০ কোটি টাকার বেশি পোশাক রপ্তানি হয়নি। এই শিল্পে দৈনিক প্রায় ১২ কোটি টাকার উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়েছে এবং কাঁচামাল খালাস না হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিজিএমইএ নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, বন্দর বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ডেমারেজসহ অতিরিক্ত খরচ বাড়বে।
অন্যদিকে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন ও শ্রমিক দল নেতা মো. হুমায়ুন কবীর জানান, ‘এনসিটি লিজ চুক্তি বাতিল না করা পর্যন্ত কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে।’ বৃহস্পতিবার ১৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বিকেলে বন্দর ভবনে নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেয়। এর আগে শ্রমিকরা পতেঙ্গার বোট ক্লাবে বৈঠকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বন্দর ভবনেই আলোচনার দাবিতে অনড় থাকে।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আলোচনা ছাড়া কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। আমাদের এক দফা দাবি, এনসিটি লিজ চুক্তি বাতিল করতে হবে। দাবি মানা হলে কর্মবিরতি প্রত্যাহার করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, চুক্তির অর্থনৈতিক দিক সম্পর্কে উপদেষ্টা পুরোপুরি অবগত নন বলে তাদের মনে হয়েছে এবং বিষয়টি তারা আলোচনায় তুলে ধরবেন। বৈঠকে উপস্থিত বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, বন্দরের অপারেশন চালু রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে শ্রমিকরা আন্দোলন স্থগিত না করলে কার্যক্রম স্বাভাবিক করা কঠিন হবে।
গত ৩১ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া কর্মবিরতি এবং ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচির ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় সব অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। দ্রুত সমাধান না হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি, শিল্প উৎপাদন, ভোগ্যপণ্যের বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে সংকট আরও গভীর হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।