জুলাই আন্দোলনের সময় সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনের ‘লাশ পোড়ানো’সহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আশুলিয়া থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল মালেকসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এছাড়াও সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আর দুজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে এই মামলার রাজসাক্ষী পুলিশ কর্মকর্তা শেখ আবজালুল হক ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রায়ের পর ট্রাইব্যুনালে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আশুলিয়া থানার সাবেক এসআই আব্দুল মালেক, ‘মিথ্যা রায় দিয়েছে, যারা আগুন লাগিয়েছে তাদের ধরেনি’ বলে অভিযোগ করেন।
রায়ের পর আব্দুল মালেকের বড় ভাই মোহাম্মদ গোলাম হোসেন নিজেকে টাঙ্গাইলের গোপালপুর থানার বাসিন্দা উল্লেখ করে বলেন, “ঘটনার দিন আমি মোবাইলের মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে আশুলিয়া থানা থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিম দিকে কাইচ্ছাবাড়ি নামক স্থান থেকে আহত অবস্থায় আমার ভাইকে উদ্ধার করে নিয়ে টাঙ্গাইলে চলে যাই। সুস্থ হওয়ার পর আট তারিখে পুলিশ সুপার বরাবর আবেদন করে সে কাজে যোগদান করে। পুলিশ সুপারের কাছে তার ব্যবহৃত রিভলবার দশ রাউন্ড গুলিসহ জমা দেয়। এরপর তাদেরকে নবাবগঞ্জ থানায় রাখা হয়।”
তিনি বলেন, “কিছুদিন থাকার পর তাকে কিশোরগঞ্জে বদলি করা হয়, কটিয়াদীতে ছিল। আমরা ওই এলাকায় অনেক গেছি। যাওয়ার পরে আসলে দেখা যায় যে, প্রকৃতপক্ষে যে অপরাধী এএসআই মনিরুল ইসলাম সে সাক্ষী দিয়ে গেছে। অথচ সে গাড়িতে আগুন দিয়েছে। জুয়েল নামে যে কনস্টেবল আছে, সেও আগুন দিয়েছে।” তার ভাই ঘটনাস্থলে ছিল না দাবি করে তারা এখানে (ট্রাইব্যুনালে) ন্যায়বিচার পায়নি বলে মন্তব্য করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা জালালুদ্দিন প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে যারা নির্দোষ মানুষ তাদেরকে অভিযুক্ত করে এই মামলায় চার্জশিট দিয়েছেন দাবি করে গোলাম হোসেন বলেন বলেন, “এই মামলায় তাদের সাজাও দেওয়া হয়েছে। আপনাদের (সাংবাদিকদের) মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে এই জিনিসটাই জানিয়ে দিতে চাই যে, আমরা ন্যায়বিচার পাইনি।”
জুলাই আন্দোলনে ‘লাশ পোড়ানোর’ এই মামলায় ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে শেষ হয় চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি। প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন জুলাই আন্দোলনে নিহত আস সাবুরের ভাই রেজওয়ানুল ইসলাম ও সাজ্জাদ হোসেন সজলের বাবা মো. খলিলুর রহমান। মোট ২২ কার্যদিবসে তদন্ত কর্মকর্তা জানে আলম খানসহ ২৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। এরপর আসামিপক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন আসামি আরাফাত হোসেন। গত ১৪ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। আসামিপক্ষসহ প্রসিকিউশনের যুক্তি পাল্টা যুক্তি খ-ন শেষ হয় ২০ জানুয়ারি। ওই দিন মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখে ট্রাইব্যুনাল।
পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার এটি তৃতীয় রায়। গত ১ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল। গত বছরের ২১ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। সে সময় উপস্থিত আট আসামির সাতজনই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। তবে দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন এসআই শেখ আবজালুল হক। একই বছরের ২ জুলাই প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন আদালত।