জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাকড’ হওয়ার অভিযোগে করা মামলায় নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন বঙ্গভবনের কর্মী ছরওয়ারে আলম। রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের এই সহকারী প্রোগ্রামারের ভাষ্য, অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাকড’ করার মতো কাজ তিনি কখনো ‘কল্পনাও’ করেন না।
বৃহস্পতিবার (০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদের আদালতে জামিন শুনানিতে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন ছরওয়ারে আলম। হাতিরঝিল থানার সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় গতকার বুধবার রাতে তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর কথা জানিয়েছিল পুলিশ।
পরের দিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার এসআই খন্দকার সালেহ্ আবু নাইম তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। আসামিরপক্ষের আইনজীবী মো. আলমগীর জামিন চেয়ে শুনানি করেন। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিহংসার কারণে তাকে ফাঁসানো হয়েছে। জামিন দিলে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিবে, ট্রায়াল ফেইস করবে।’
বাদীপক্ষে জামায়াতপন্থি আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক জামিনের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, ‘এ আসামি যে কাজ করেছে, সেটা স্বৈরাচারি সরকারের প্রেতাত্মা হিসেবে করেছে। স্বৈরাচারের প্রেতাত্মা তার ওপরে ভর করেছে। উনার কি কাজ ছিল যে জামায়াত আমিরের মতো সম্মানিত লোকের আইডি হ্যাকড করতে হবে?
‘উনি দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য এটা করেছেন। মহিলা ভোটার যেহেতু অনেক, এ কারণে তাদেরকে উত্তেজিত করার জন্য জামায়াতের আমিরের নামে ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করেছেন।’ মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘দেশে শাকপাতা চুরি করলেও ৭-৮ দিন রিমান্ড চাওয়া হয়। তদন্ত কর্মকর্তা কী কারণে রিমান্ড চায়নি জানি না। নৈরাজ্য সৃষ্টি করার জন্য আসামি এটা করেছে। তার জামিন তো হবেই না। উনি দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য এটা করেছেন। তার জামিনের বিরোধিতা করছি।’
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘যেহেতু এ আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে, এজন্য তাকে কারাগারে পাঠানো হোক। পরে তদন্ত করে যখন দরকার রিমান্ড চাওয়া হবে। যেহেতু রিমান্ড চায়নি এজন্য তাকে তাকে আপাতত কারাগারে পাঠানো হোক।’
পরে আদালতকে ছরওয়ারে আলম বলেন, ‘আমি শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলছি, এ কাজ আমার দ্বারা হয়নি। এ ধরনের কাজ আমি কল্পনাও করি না। আমি এত বছর ধরে চাকরি করি, আমার মন-মানসিকতা এমন নয়।
‘সাধারণ মানুষ মনে করছে, আমি হ্যাকড করেছি। আমি বলছি, নিজ হাতে কিছু করিনি। তদন্ত কর্মকর্তাকে বলেছি, তদন্তে সহযোগিতা করতে যা যা করার সব করবো।’ বিচারক তার কাছে জানতে চান, ‘আপনাকে কোথা থেকে গ্রেপ্তার করেছে ?’ ছরওয়ারে আলম বলেন, ‘বাসা থেকে।’ কবে গ্রেপ্তার করেছে জানতে চাইলে বলেন, ‘পরশু’। কখন গ্রেপ্তার করা হয়েছে বিচারকের প্রশ্নে ছরওয়ারে আলম বলেন, ‘১০টা থেকে সাড়ে ১০টার দিকে।’ ছরওয়ারে আলম বলেন, ‘আমি স্বেচ্ছায় মোবাইল, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ দিয়েছি। কল্পনাও করি না আইডি হ্যাকড করার, আমি শতভাগ নিশ্চিত।’
তিনি বলেন, ‘আমার আর এক বছর চাকরি আছে। আগামী বছর রিটায়ার্ড করবো। এ কাজ করে আমি কি পেনশন, অনুদান সব শেষ করবো! এমনটা কল্পনাও করি না।’ শুনানি নিয়ে আদালত আদেশ অপেক্ষমাণ রাখেন। পরে তার জামিনের আদেশ দেন। ছরওয়ারে আলমকে হাজির করা হবে জেনে দুই ছেলেকে নিয়ে আগেই আদালতে আসেন তার স্ত্রী শামীম আরা। স্বামীর জামিনের আদেশ শুনে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানান।
স্বামীকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে শামীম আরা সাংবাদিকদের বলেন, ‘উনি ৩২ বছর ধরে সম্মানের সঙ্গে চাকরি করেছেন। এটা একটা বাচ্চাও বোঝে যে, কোনো হ্যাকার কি নিজের ঠিকানা দিয়ে হ্যাক করবে? তিনি কোনো রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত না। রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হলে আওয়ামী লীগের ১৭ বছর এবং এর আগে কোনোভাবে চিহ্নিত হতো। কারণ সে এখানে দীর্ঘ বছর চাকরি করেছে।
‘তার কাজ ছিল চাকরি করে বাসায় আসা এবং বাজারে যাওয়া-আসা করা। এছাড়া আর কিছু করতো না সে। তার এখন রিটায়ার্ডের সময়, কোনো মানুষ কি জেনে-বুঝে নিজের পায়ে কুড়াল মারবে?’ এ মামলায় বাদী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সিরাজুল ইসলাম।
গত শনিবার জামায়াত আমিরের ‘এক্স’ অ্যাকাউন্ট থেকে আসা ‘নারী বিদ্বেষী’ একটি পোস্ট নিয়ে নানা সমালোচনা শুরু হয়। ওই পোস্টে বলা হয়, ‘নারী প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান বিভ্রান্তিকর বা কুণ্ঠাবোধের নয়, বরং নীতিগত। নারীদের নেতৃত্বে আসা উচিত, এটা আমরা বিশ্বাস করি না। জামায়াতে এটা অসম্ভব। আল্লাহ এটা অনুমোদন করেননি।
‘আমরা বিশ্বাস করি, আধুনিকতার নামে নারীদেরকে ঘরের বাইরে ঠেলে দেয়া হলে তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়। এটা পতিতাবৃত্তি ছাড়া কিছু নয়।’ এই পোস্ট নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, দলের প্রধানের এক্স হ্যান্ডেল ‘হ্যাকড’ করে ওই পোস্ট দেয়া হয়েছে।
এর মধ্যে গত মঙ্গলবার বিকেলে বঙ্গভবনে গিয়ে জামায়াতের একটি প্রতিনিধি দল এ বিষয়ে অভিযোগ দেয়। এরপর মধ্যরাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের অভিযানে মতিঝিল এলাকা থেকে আটক করা হয় ছরওয়ারেকে। তাকে আটকের আগে অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাকড’ হওয়ার অভিযোগে হাতিরঝিল থানায় একটি জিডি হয়। তবে বুধবার রাত পর্যন্ত ছরওয়ারে আলমকে গ্রেপ্তারের কোনো তথ্য পুলিশের তরফে আসেনি। এরপর রাত ১১টার দিকে সংবাদ সম্মেলনে এসে বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার ছরওয়ারে আলমকে গ্রেপ্তারের কথা জানান ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম।
তবে গোয়েন্দা শাখার একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, আটক ওই ব্যক্তির (ছরওয়ারে আলম) বিরুদ্ধে জামায়াত আমিরর এক্স পোস্টের সঙ্গে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তারা বলেছেন, মূলত রাজনৈতিক চাপে তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।