আগামী সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে পারবে বলে আমি আশাবাদী: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

কূটনৈতিক বার্তা পরিবেশক

অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ভারতের সঙ্গে ‘সম্পর্ক উন্নয়নে’ সফল না হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, আগামী সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে পারবে বলে আমি আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, এতে সন্দেহ নেই। আমরা তাদের সঙ্গে গুড ওয়ার্কিং রিলেশন চেয়েছিলাম। এখানে সফল হয়েছি, তা বলতে পারি না। কারণ সম্পর্কটা থমকে আছে। আমি কাউকে দোষারোপ করতে চাই না। ভারত তাদের স্বার্থ চিন্তা করেছে, আমরাও আমাদের স্বার্থ চিন্তা করেছি। দুইপক্ষের নিজস্ব স্বার্থের ধারণায় তফাৎ থাকায় অনেকক্ষেত্রে এগোতে পারিনি।’

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের পক্ষ থেকে কোনো চাপ নেই। আমার সঙ্গে যারা দেখা করতে এসেছেন, তাদের কেউ কেউ বিষয়টি জানতে চেয়েছেন, সবাই নয়। তবে কেউ কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি করেননি।

বৃহস্পতিবার (০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ‘মসৃণ ছিল না’ স্বীকার করে নিয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, তার উত্তরাধিকারী, অর্থাৎ পরবর্তী সরকার নিশ্চয়ই ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক ‘মসৃণ’ করবে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে আমরা ভালো সম্পর্কের কথা বলে আসছি। আমি আপনাদের এটুকু বলতে পারি, আমার দিক থেকে এবং আমার ওপরে যিনি ছিলেন- প্রধান উপদেষ্টা আছেন বা সরকারের যে মতামত, এতে কিন্তু কোনো দ্বন্দ্ব নেই। পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং দায়-দায়িত্বের জায়গা থেকে আমরা আসলেই ভারতের সঙ্গে একটা ভালো, কাজের সম্পর্ক চেয়েছি। এটা আমরা সবসময় চেয়েছি।’

সম্পর্ক প্রত্যাশিত মাত্রায় না পৌঁছানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সফল হয়েছি এটা ঠিক বলতে পারি না। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে এটি (সম্পর্ক) অনেকটা থমকে আছে। আমি বলবো না যে বিরাট কোনো সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তবে সম্পর্কটা থমকে আছে।’

এই পরিস্থিতির জন্য কাউকে এককভাবে দায়ী করতে চান না তৌহিদ হোসেন। তার মতে, ‘আমি কাউকে দোষারোপ করতে চাই না। ভারত নিশ্চয়ই তাদের স্বার্থ যেভাবে চিন্তা করে সেভাবে করেছে। আমরা আমাদের স্বার্থ যেভাবে রক্ষিত হয় বলে ভেবেছি, সেভাবে করার চেষ্টা করেছি। দুটো ঠিক অনেক ক্ষেত্রে মেলেনি। আমাদের দুইপক্ষের নিজস্ব স্বার্থের ধারণার মধ্যে একটা তফাৎ রয়ে গেছে, যার কারণে অনেক ক্ষেত্রে আমরা এগোতে পারিনি।’

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেন, পরবর্তী সরকারের সময়ে অমীমাংসিত বিষয়গুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করবো যে, আমার উত্তরাধিকারী যিনি আসবেন এবং এই সরকারের উত্তরাধিকারী যে সরকার হবে, তাদের সময়ে আবার মসৃণ একটা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে। ইস্যু থাকবেই। এটি আমি সব দেশের ক্ষেত্রে বলেছি। সেগুলো নিয়ে সংঘাতও থাকবে স্বার্থের। তারপরও একটা মসৃণ সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সময়ে সম্পর্ক খুব স্মুথ ছিল না, এটি আমি স্বীকার করেই নিয়েছি। কারণ, বেশ কয়েকটি সেটব্যাক (পিছুটান) হয়েছে।’

ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সেখানে রেখে সম্পর্ক কতটা মসৃণ হবে এমন প্রশ্নে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আপনি তো নৈরাশ্যবাদী হতে পারেন না। আপনাকে আশাবাদী হতেই হবে। আমি আশাবাদ ব্যক্ত করছি, এজন্য কোনো একটা পথ নিশ্চয়ই বের হবে; এই সমস্যাগুলোর সমাধানে পৌঁছানো যেতে পারে।’

শেখ হাসিনাকে ফেরত দেয়ার বিষয়ে ভারতের মনোভাব জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মনোভাব একটা বিমূর্ত বিষয়। মনোভাব নিয়ে কখনো কথা বলা উচিত নয়। অফিসিয়ালি যেটা করা হয়েছে, সেটাই বলা যাবে। আমরা তাকে ফেরত চেয়েছি, তাদের রেসপন্স (সাড়া) পাইনি। এর বাইরে আমাদের স্পেকুলেশনে (অনুমান) যাওয়া ঠিক হবে না।’

ভোটে আ.লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে কূটনীতিকরা চাপ দেননি

আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের পক্ষ থেকে কোনো চাপ আছে কিনা জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আমার সঙ্গে যারা দেখা করতে এসেছেন, তাদের কেউ কেউ বিষয়টি জানতে চেয়েছেন, সবাই নয়। তবে কেউ কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি করেননি। কেউ বলেননি, এটা আপনাদের করা উচিত বা উচিত নয়, কিংবা এটা করতে হবে। কেউ কেউ শুধু জানতে চেয়েছেন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিচ্ছে কিনা। আমি বলেছি, এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ অংশ নিচ্ছে না।

সাংবাদিকদের সঙ্গে বিদায়ী মতবিনিময়কালে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, আমরা আশা করছি, এক সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন হয়ে যাবে।

যদিও সন্দিহান লোকজনের এখনও অভাব নেই, তবে আমার মনে হয়, নির্বাচন না হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। এরপর কোয়ালিফিকেশনের প্রশ্ন আসে। নির্বাচন পারফেক্ট হয়, এটা খুবই রেয়ার। পারফেক্ট কোনো কিছুই হয় না।

জীবনে কোনো কিছুই পারফেক্ট হয় না, কিছু সমস্যা থাকেই। তবে দেখতে হবে, নির্বাচনটি জনমতের প্রতিনিধিত্বশীল হয়েছে কিনা। জনমত কী, তা বোঝার জন্য শুধু সংখ্যার দিকে তাকাতে হয় না। এটা আমরা মোটামুটি বুঝে যাই। এর আগে যে চারটি নির্বাচন হয়েছে, যেগুলোকে আমরা নির্বাচন বলি, সেখানে প্রতিটিতেই জনমতের প্রতিফলন ঘটেছিল।

তিনি বলেন, আমি দীর্ঘদিন ভারতে ছিলাম। বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ বলে তারা নিজেরাই গর্ব করে। সেখানেও পারফেক্ট নির্বাচন হয় না, কিছু সমস্যা থাকেই।

বিভিন্ন দেশে ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যানের জন্য আমরাই দায়ী

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বাংলাদেশিদের ভিসা না দেয়ার জন্য ‘সিস্টেমকে’ দায়ী করে বলেন, ‘বাংলাদেশিদের ভিসা দেয়া হচ্ছে না, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে এই দায় স্বীকার করতে রাজি না আমি। এটা দেশের দায়, পুরো সিস্টেমের দায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও না, ব্যক্তিগতভাবে আমারও না,’।

নিজের কথার ব্যাখ্যায় উপদেষ্টা বলেন, ‘পৃথিবীজুড়ে প্রচুর সুযোগ আছে। আমরা তা নিজেদের দোষে ব্যবহার করতে পারছি না। ভিসা দেয় না, এর জন্য সম্পূর্ণভাবে আমরা দায়ী। প্রধান উপদেষ্টা নিজেই বলেছেন, জালিয়াতিতে আমরা একেবারে সেরা। আপনি যখন জালিয়াতি করবেন, তখন আপনার কাগজ কেন বিশ্বাস করবে?’

তিনি বলেন, ‘ভিসা বলুন, অ্যাডমিশন বলুন, সবকিছু কাগজের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। কাগজ দেখে বিশ্বাস করানোর দায়িত্ব আমাদের। যদি দেখা যায়, কোনো মহিলা কোনো দেশে মেইডের চাকরি করতে গেছেন, কিন্তু তার ভিসা হলো ফ্রন্ট অফিসার ম্যানেজার হিসেবে। চিন্তা করুন যে আমরা কী পরিমাণ ধাপ্পাবাজি করেছি। আমরা যতক্ষণ ঘর না গোছাবো, এই সমস্যার সমাধান হবে না। আরও দুঃসময়ও আসতে পারে।’

বিদায়ের সময়ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার যেসব চুক্তি সই করছে, সেগুলো পরবর্তী সরকারের জন্য বোঝা হয়ে যাবে কিনা সাংবাদিকরা এমন এক প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি উল্টোটা মনে করি। আমি মনে করি, আমরা অনেক ইস্যু এগিয়ে দিচ্ছি, যাতে পরবর্তী সরকারের জন্য কাজ করা সহজ হয়।’

‘জাতীয়’ : আরও খবর

» নির্বাচন: ইসিতে ৩৪৫টি অভিযোগ, ৪১ শতাংশই মাঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে

» নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন বঙ্গভবনের কর্মী ছরওয়ার

» এলপি গ্যাসের দাম কমাতে স্থানীয় উৎপাদন ও ব্যবসায় ভ্যাট-ট্যাক্স অব্যাহতি

» রায়ে ন্যায়বিচার না পাওয়ার অভিযোগ এসআই আব্দুল মালেকের পরিবারের

» ভোটে হুমকি সোশ্যাল মিডিয়ার অপতথ্য: নিরাপত্তায় এক লাখ সেনা মোতায়েন

» ‘দ্রুত’ দায়িত্ব হস্তান্তর, নতুন প্রধানমন্ত্রীর শপথ ১৫ বা ১৬ ফেব্রুয়ারি: প্রেস সচিব

সম্প্রতি