image

এক্সপ্লেইনার

পে স্কেলের জন্য আন্দোলন কেন

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

নবম জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের ব্যানারে আন্দোলন করছেন সরকারি কর্মচারীরা। তাদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নবম পে কমিশন গঠন হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। বার বার আশ্বাস দিয়েও তা বাস্তবায়ন না করায় তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে বলেও দাবি তাদের। মূলত, বেতন বাড়ানোর এই আন্দোলনের পেছনে কিছু গভীর বাস্তবতা কাজ করছে।

পে স্কেল কী, কেন

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ও ভাতার কাঠামোকে ‘পে স্কেল’ বলা হয়। দেশে অষ্টম পে স্কেল প্রায় এক দশক ধরে কার্যকর রয়েছে। যা বর্তমান বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না। সরকারি কর্মচারীদের দাবি, মূল্যস্ফীতির কারণে ভোগ্যপণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। অথচ পে স্কেল আপডেট না হওয়ায় তাদের বেতন বাস্তবিকপক্ষে কমে গেছে। ফলে তাদের জীবনযাত্রা ও পরিবারের ব্যয় চাপ সামলানো কঠিন হয়ে উঠেছে।

বেতন কমিশন ও প্রতিবেদন

বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অষ্টম পে স্কেল ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ঘোষণা করা হয়েছিল। যা সে বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়। এর এক দশক পর গেল বছরের ২৪ জুলাই নতুন বেতনকাঠামো নির্ধারণে জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ গঠন করা হয়।কমিশনের প্রধান করা হয় সাবেক অর্থসচিব ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খানকে।

কমিশন নবম পে-স্কেলের সুপারিশ নিয়ে চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে কমিশন সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি স্কেলে বেতন সুপারিশ করে। সর্বনিম্ন বেতন স্কেল ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়। সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সুপারিশ করা হয় এক লাখ ৬০ হাজার টাকা।

প্রতিবেদনে কোনো কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে, বেতন কমিশন সংশ্লিষ্ট মাসিক ২,০০০ (দুই হাজার) টাকা ভাতা প্রদানের সুপারিশ করেছে। শর্ত রাখা হয়েছে, সকল ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ দু’জন সন্তান এই সুবিধা পাবে। আরও বলা হয়েছে, টিফিন ভাতার বর্তমানে প্রচলিত বিধানাবলি অব্যাহত থাকলে, তবে কমিশন ভাতার হার বৃদ্ধির সুপারিশ করে। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বর্তমানে প্রচলিত মাসিক টিফিন ভাতা ২০০ টাকার স্থলে ১,০০০ (এক হাজার) টাকা করা যেতে পারে।

বাস্তবায়ন রূপরেখা

নবম পে স্কেল মোট ৩টি ধাপে বাস্তবায়িত হওয়ার প্রস্তাবনা ছিল। প্রথম ধাপে বিদায়ী জানুয়ারি মাসে চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দেওয়ার কথা ছিল। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, নতুন কাঠামো আংশিক বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে ১ জানুয়ারি থেকে। তবে পূর্ণাঙ্গ কাঠামো কার্যকর হতে পারে আগামী ১ জুলাই থেকে। তিনি আরও জানান, কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনায় আরও কয়েকটি কমিটি কাজ করবে। যা শেষ হতে ৩-৪ মাস সময় লাগতে পারে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার বেতন কমিশন প্রতিবেদন জমা দেওয়াকেই বড় অর্জন হিসেবে দেখছে।

আন্দোলন

সরকারি কর্মচারীরা আগেই আল্টিমেটাম দিয়েছিল ৩০ নভেম্বর বা ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যেই গেজেট প্রকাশ না হলে কঠোর কর্মসূচির দিকে যাওয়ার কথা। সময়সীমা পার হওয়ায় আন্দোলন জোরদার হয়েছে। গত ১ জানুয়ারি থেকে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা ছিল। ১৯ জানুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের পক্ষ থেকেও আন্দোলনের ঘোষণা আসে। জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজীজি ঘোষণা দেন ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নবম পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ না করলে কঠোর কর্মসূচি নেবেন তারা।

সরকারি কর্মচারীদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ’ বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সর্বশেষ শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নবম পে স্কেল বাস্তবায়ন দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে জড়ো হন আন্দোলনকারীরা। তারা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার দিকে যেতে চাইলে পুলিশ দফায় দফায় বাধা দেয়। জলকামান, টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। এতে কিছু কর্মচারী আহত হওয়ার খবরও এসেছে।

আন্দোলনের কারণ

প্রথমত, দৈনন্দিন দ্রব্যপণ্যের মূল্য বাড়লেও বেতন কাঠামো পরিবর্তন না হওয়া। দ্বিতীয়ত, পে স্কেলের বাস্তবায়ন বার বার পিছিয়ে যাওয়া ও সিদ্ধান্ত সরকারের তরফ থেকে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না হওয়া। তৃতীয়ত, কর্মচারীরা তাদের অধিকার হিসেবে দেখছেন, ন্যায্য মজুরি দাবি করছেন যেন জীবনযাত্রা চালিয়ে যেতে পারে। চতুর্থত, নির্বাচনের আবহে কর্মচারীরা চাইছেন চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ ভোটের আগে হোক যাতে দীর্ঘস্থায়ী সুবিধা নিশ্চিত হয়। তবে নতুন বেতন কাঠামোর প্রভাব বেসরকারি খাতেও পড়ছে। বেসরকারি খাতে চাপ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এর ফলে খরচ বাড়তে পারে। রাজস্ব আদায় করা কঠিন হতে পারে।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি