চট্টগ্রাম বন্দর নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ না দেয়ার সুস্পষ্ট সরকারি ঘোষণা, বন্দর চেয়ারম্যানের অপসারণ, আন্দোলরত বন্দর কর্মীদের পূর্ণবহালসহসহ চার দাবিতে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ আজ সকাল ৮টা থেকে পুনরায় চট্টগ্রাম বন্দরে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। আন্দোলনে দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১২-১৫ হাজার কোটি, গতকাল শুক্রবার এবং শনিবার, (০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) আন্দোলন স্থগিত করা হলে এ সময়ে প্রায় ৯ হাজার কনটেইনার বন্দরে উঠানামা করেছে শুধু শুক্রবারে ৪ হাজার ৮শ’ ৩০টি কনটেইনার শনিবার সহ প্রায় প্রায় ৯ হাজার কনটেইনার উঠানামা করেছে বলে বন্দর সূত্রে জানায়। বন্দর শ্রমিকদের এমন কর্র্মসূচি ঘোষণা দেয়ার খবরে দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা এবং আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহীম খোকন। আন্দোলনরত বন্দর কর্মীদের বিদেশে কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি বাতিলের দাবির পাশাপাশি ‘চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান সংকটের কারণ’ বর্তমান চেয়ারম্যান এসএম মনিরুজ্জামানকে বন্দরের চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ তার বিরুদ্ধে বন্দরের ৫০০ কোটি দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়সহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদেও সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন। বন্দরসংক্রান্ত আন্দোলনে বিগত সময়ে যেসব কর্মচারীর বিরুদ্ধে বদলি, চার্জশিট, সাময়িক বরখাস্ত, পদাবনতিসহ নানাবিধ শাস্তিমূলক যে ব্যবস্থা নিয়েছে তা বাতিল করে প্রত্যেক কর্মচারীকে চট্টগ্রাম বন্দরের স্ব-স্ব পদে পুনর্বহাল করা। আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের মামলা এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করাসহ কয়েকটি দাবি জানান। এসব দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বন্দরের লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। কর্মসূচি ঘোষণার সময় সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর, ডক জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি মো. হারুণ, সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, কার্যকরী সভাপতি আবুল কাসেম, মার্চেন্ট শ্রমিক ইউনিয়নের সমন্বয়ক ইয়াসিন রেজা রাজু, জাহিদ হোসেন, মো. হারুন, উইন্সম্যান সমিতির ইমাম হোসেন খোকন, শরীফ হোসেন ভুট্টোসহ অনেক শ্রমিক নেতা উপস্থিত ছিলেন। আন্দোলন ঘোষণা দেয়ার বিষয়ে মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, এ ধর্মঘটে জেটি, ইয়ার্ড, টার্মিনাল, প্রশাসনিক ভবনের পাশাপাশি বহির্নোঙরেও (আউটারে লাইটারিং) অপারেশনাল কাজসহ সব বিভাগ বন্ধ থাকবে। আন্দোলনের গতি আরও জোরালো এবং শক্তিশালী হবে বলে দাবি করেন।
এ সময় বন্দর থেকে আমদানি পণ্য চালান ডেলিভারি, কনটেইনার হ্যান্ডলিং এমনকি বন্দর জেটিতে জাহাজ আনা-নেয়া বন্ধ হয়ে যায়। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের আশ্বাসে দুই দিনের জন্য অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিলেন শ্রমিক নেতারা। এর আগে চট্টগ্রাম বন্দর সুরক্ষা বনাম বন্দর অচলের রাজনীতি শীর্ষক এক আলোচনা সভা গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বন্দর সুরক্ষা কমিটির ব্যানারে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রাবন্ধিক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি অর্থনৈতিক স্থাপনা নয়। এটি জনগণের সম্পদ ও সামরিক স্থাপনাও। কোনো গোপনীয় চুক্তি হতে পারে না। বন্দরের বিষয়ে সব সিদ্ধান্ত জনগণকে জানিয়ে দিতে হবে। বন্দর ইস্যুকে শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখলে চলবে না। এটি সরাসরি সামরিক প্রশ্ন। জনগণের সম্পদের বিষয়ে চুক্তির ভার আমলাদের ওপর ছেড়ে দেয়া যায় না। অবশ্যই জনগণকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে। তাদের মত নিতে চুক্তি বাতিলসহ ৪ দফা দাবিতে আজ থেকে ফের আন্দোলন হবে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে বন্দর সুরক্ষা কমিটি আয়োজিত এক সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সদস্য সচিব মেজর (অব.) আহমেদ ফেরদৌসের সঞ্চালনায় সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনটির চট্টগ্রাম সমন্বয়ক ও চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান। লিখিত বক্তব্য উপস্থাপনা করেন সংগঠনের সমন্বয়ক ফিল্ম মেকার মোহাম্মদ রোমেল। মতবিনিময় সভায় অংশ নেন চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান আন্দোলেনর নেতৃত্বদানকারী শ্রমিক নেতা হুমায়ুন কবীর ও ইব্রাহিম খোকন, জুলাই যোদ্ধা তৌহিদুল ইসলাম, সাংবাদিক আব্দুল্লাহ তুহিন। শ্রমিকদের এই কর্মবিরতির ফলে বন্দর অচল হয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে বিদেশিদের সঙ্গে চুক্তির পেছনে যুক্তি হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা করছেন চিন্তক ফরহাদ মাজহার। তিনি বলেন, চুক্তি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের কারণে বন্দর অচল হয়েছে। এবার শ্রমিকদের দোষী করেই যুক্তি দিয়ে চুক্তির পক্ষের যুক্তি দেয়া হবে। এটি দ্বিমুখী তলোয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এখন দক্ষতা, অদক্ষতার প্রশ্ন সামনে আনা হয়েছে। আমাদের শ্রমিকদের দক্ষ করে তুলতে পারি না কেন আমরা? বন্দর পিছিয়ে রাখা হচ্ছে কেন?
গণসার্বভৌমত্বের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে ফরহাদ মজাহার বলেন, পাঁচ আগস্টের পর জনগণের ক্ষমতা ছিল। আমরা সেটাকে আবার ফিরিয়ে দিয়েছি পুরাতন ব্যবস্থায়। এই শব্দের অর্থ বুঝতে না পারায় জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখন সরকার, সংসদ বা রাষ্ট্র চাইলেই জনগণের মতামত না নিয়ে বিদেশিদের কাছে ইজারা দিতে পারছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় স্থাপনা নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার ভার মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেয়ার প্রতিবাদে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে গত বৃস্পতিবার পর্যন্ত টানা ছয় দিন কর্মবিরতি ছিল বন্দরজুড়ে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে দাবি করে সরকার এবং কোম্পানিসহ বন্দর সংশ্লিষ্ঠদের আন্দোলনের কারণে দৈনিক ১২-১৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। আসন্ন রমজান ঈদ কেন্দ্র করে আন্দোলনের প্রভাব বিভিন্ন জায়গায় পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত টানা তিন দিনের পূর্ণ অচলাবস্থায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫-৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর আগে তিন দিন প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতির কারণে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে ১৫৫টি জাহাজ অবস্থান করছে, এরমধ্যে ১২৭টি বহির্নোঙরে আটকে রয়েছে। খাদ্যশস্য, জ্বালানি ও কনটেইনারবাহী জাহাজ বেশি সংখ্যায় আটকে পড়ায় আমদানিরপ্তানি কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে জমে ৩৮ হাজার ৪৫৯টি কনটেইনার, যার মধ্যে প্রায় ১০ হাজারটি রপ্তানি কনটেইনার। এছাড়া বেসরকারি ডিপোগুলোতেও ১৩ হাজারের বেশি রপ্তানি কনটেইনার আটকে রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরকে বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চলমান অচলাবস্থায় দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক উল্লেখিত বিষয়ে জানিয়েছেন।