জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এই সব ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ (বেশি ঝুঁকিপূর্ণ) ভোটকেন্দ্র ৮ হাজার ৭শ’ ৮০টি (২০ দশমিক ৫৩ শতাংশ)। আর গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) ভোটকেন্দ্র ১৬ হাজার ৫৪৮টি (৩৮ দশমিক ৭০ ভাগ)।
ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র গুলোতে বাড়তি নিরাপত্তার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে
দূর্গম ও সীমান্ত এলাকার ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় বিজিবি মোতায়েন
সারাদেশে মোট ভোটার ১২,৭৬,৯৫,১৮৩
বেশি ঝুঁকি ও কম ঝুঁকিপূর্ণ মিলিয়ে সারাদেশে ২৫ হাজার ৩২৮টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। এ পরিমাণটা শতাংশ হিসাবে ৫৯ শতাংশ হবে। আর সাধারণ ভোটকেন্দ্র ১৭ হাজার ৪শ’ ৩৩টি। ভোটকেন্দ্রগুলোতে সারাদেশে মোট ভোটকক্ষ হলো ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৯টি। এসব ভোট কক্ষে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন ভোটার ভোট দিবেন। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
মাঠপর্যায়ের একজন ওসি বলেন, আগের তথ্য ও বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ভোটকেন্দ্র বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই সব ভোটকেন্দ্রে অনলাইন ক্যামেরা, সিসি ক্যামেরা থাকবে। নিরাপত্তা ফোর্স বেশি থাকবে। তার মধ্যে সেনাবাহিনী, বিজিবি মোতায়েতন থাকবে।
পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, ভোটকেন্দ্রগুলোতে এবার পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বলয় থাকবে। এরমধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে (ঝুঁকিপূর্ণ) বেশি নিরাপত্তা থাকবে। এজন্য নিরাপত্তা ছক চূড়ান্ত করা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র (গুরুত্বপূর্ণ) গুলোতে ৩ জন পুলিশ সদস্য ও ১৩ জন আনসার সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে। পুলিশ ছাড়াও বিজিবি, সেনাবাহিনীসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে।
পুলিশের একজন ডিআইজি জানান, সারাদেশে ভোটকেন্দ্র ও আশপাশ এলাকায় ইতোমধ্যে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আগামী ১০-১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তায় পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে ৩ জন পুলিশ ও ১৩ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবে। সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১ জন পুলিশ ও ১৩ জন আনসার সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে।
আর ১০-১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় পুলিশ মোতায়েন ছাড়াও বিজিবি, সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচনী এলাকায় নিরাপত্তা টহল দিবেন।
সীমান্তবর্তী ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিজিবি সদস্য মোতায়েন থাকবে। উপকূলীয় ভোটকেন্দ্রে কোস্টগার্ড, যৌথবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ (গুরুত্বপূর্ণ) ভোটকেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত ফোর্স নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে।
বিজিবি সদর দপ্তর থেকে জানিয়েছে, পানছড়ির দুর্গম ভোটকেন্দ্রসহ সীমান্ত এলাকার বিজিবির বাড়তি নিরাপত্তায় ফোর্স মোতায়েন করা হবে। বডিওর্ন ক্যামেরা, বিজিবির চেকপোস্টসহ নানা তৎপরতা থাকবে।
সারাদেশে উপকূলীয় ৬টি উপজেলা ব্যতীত ৪৮৯টি উপজেলায় ৩৭ হাজারেরও বেশি বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আর সীমান্তবর্তী ৬১টি উপজেলায় বিজিবি নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে। বিজিবি সদর দপ্তর থেকে এ তথ্য জানিয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। তার জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কীভাবে পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে তা নিয়ে পুলিশ বাহিনীর প্রায় দেড় লাখ কর্মকর্তা ও সদস্যকে নির্বাচনী নিরাপত্তা, আচরণবিধি ও নির্বাচন কমিশনের গাইডলাইন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
নির্বাচনী প্রশিক্ষণে প্রতিপাদ্য হলো, থাকবে পুলিশ জনপদে, ভোট দিবো নিরাপদে। এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশের ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় এই প্রথম বারের মতো পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
প্রশিক্ষণের গাইডলাইন থেকে জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশের ভূমিকা ও আন্তঃসংস্থা বা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নির্বাচনের নিরাপত্তা ছক চূড়ান্ত করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে এলাকাভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, প্রয়োগ, সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা কেমন হবে তা-ও প্রশিক্ষণে শেখানো হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য: গোপন বা সরাসরিভাবে সংগৃহীত তথ্যকে যথাযথভাবে বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য, যেমন: নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষা। এসব বিষয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ব্যবহারযোগ্য করে তোলা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উসকানিমূলক পোস্ট, গুজব ছড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বা ভোটকেন্দ্রে সহিংসতার সম্ভাবনা আছে এমন এলাকা বা ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, জনগণের মনোভাব, ক্ষোভ, ছাত্র-তরুণদের গতিবিধি সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ করা।
নির্বাচনী অনিয়ম, ভোটকেন্দ্রে কারচুপি, অর্থ বিতরণ, প্রার্থীদের সম্পর্কে জানা, নিরাপত্তা হুমকি, সন্ত্রাসী হামলা, অস্ত্র, বিস্ফোরকের উপস্থিতি, কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা ও নির্বাচনী সামগ্রী সংগ্রহ সংক্রান্তে বাধা দিতে পারে এই রকম আশঙ্কার তথ্য আগাম সংগ্রহ করে ব্যবস্থা নেয়া।
নির্বাচনী কর্মতৎপরতার আলোকে জেলাভিত্তিক, গোয়েন্দা ঝুঁকি বিশ্লেষণের নমুনা, পেশিশক্তির প্রদর্শনী, প্রার্থীদের নিজস্ব বাহিনী তৈরি, স্বতন্ত্র প্রার্থীকে হুমকি, নদীর তীরবর্তী অঞ্চল ও বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দাপট, সীমানা পরিবর্তনসহ নানা কারণে ঝুঁকিপূর্ণের ধরন, রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য সংঘর্ষের সময় উচ্চঝুঁকির মাত্রা বিশ্লেষণ করে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া।
আচরণ ও দণ্ড: রিটানিং অফিসার, সহকারী রিটানিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসারসহ দায়িত্ব পালনকারী অন্যান্য কর্মকর্তা বা পুলিশের কোনো সদস্য যদি নির্বাচন পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনা বা ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকালে কোনো ব্যক্তিকে তার ভোট দেয়ায় প্ররোচিত করে, তার ভোট দেয়ায় প্রভাবিত করে, নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার জন্য অন্য কোনো কার্য করেন, তা দণ্ডনীয় অপরাধ।
নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিসংক্রান্ত এই প্রশিক্ষণ কোর্সে সাধারণত নির্বাচনী আইন ও বিধি-বিধান সম্পর্কে সমক্য জ্ঞান অর্জন, নির্বাচনী আচরণবিধি ও কমিশনের জারিকৃত পরিপত্র ও নির্দেশনা জানা। যুযোপযোগী প্রযুক্তির ব্যবহার জানা। জনগণের সঙ্গে পুলিশের আস্থা বৃদ্ধি করা।
প্রযুক্তির ব্যবহার বিশেষ করে বডি ওর্ন ক্যামেরাসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নীতিমালা সম্পর্কিত সম্যক ধারণা অর্জন। বডিওর্ন ক্যামেরাসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারিক অনুশীলন। পুলিশের অস্ত্র ব্যবহারের নীতিমালাসহ নানা ধরনের নির্বাচনী নিরাপত্তা ও আচরণবিধির প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।
এই বছর জাতীয় নির্বাচন দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য করতে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশন ও গাইডলাইন অনুযায়ী পুলিশ কাজ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছেন। পেশাদারিত্বের বাহিরে কেউ অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আর যেসব পুলিশ সদস্য কোনো নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেনি। তাদের ভোট কেন্দ্রের প্রামাণ্য চিত্র ও সরজমিনে রোল প্লে’র মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের জন্য ডকুমেন্টারি দেখানো হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। দেশে এই প্রথম পুলিশ নির্বাচনী নিরাপত্তার প্রশিক্ষণ নিয়ে মাঠে নামছে। টার্গেট নিছিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পূর্ণ করা। এজন্য পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে সারাদেশে মাঠপর্যায়ের পুলিশ প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছে।