image
সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ছবি: সংগৃহীত

অপারেশন ক্লিন হার্টে দায়মুক্তিকে ‘হত্যার লাইসেন্স’ বললেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামের অভিযানে যারা সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের দায়মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্তকে ‘হত্যার লাইসেন্স’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ডিজিএফআইয়ের হাতে গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রোববার,(০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দেয়া জবানবন্দিতে এ মন্তব্য করেন অবসরপ্রাপ্ত এই জেনারেল।

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ এর দুই সদস্যের বেঞ্চে অন্য সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ। ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দির মাধ্যমে এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। টানা দুই ঘণ্টার সাক্ষ্যে তিনি সেনাবাহিনীতে ‘গুম-খুনের সংস্কৃতি’ গড়ে ওঠা এবং সেনাপ্রধান থাকাকালে র‌্যাব সম্পর্কে অভিজ্ঞতার বিবরণ তুলে ধরেন।

আইকেবি নামে পরিচিত ইকবাল করিম ভূঁইয়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১২ সালের ২৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। সাক্ষ্যে তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীতে খুনের সংস্কৃতি আগে থেকেই ছিল, গুমের সংস্কৃতি পরবর্তীতে গড়ে উঠেছে। আমরা যদি ধরে নিই যে, ২০০৮ সাল থেকে খুন শুরু হয়েছে তবে সেটা ভুল বলা হবে।

‘প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার পর থেকেই খুনের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে সেনানিবাসের বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে। সে সময় কথিত অপরাধীদের ধরে সেনাক্যাম্পে এনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন করা হয়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।’ তবে ওই সংখ্যা ‘সীমিত’ ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, পরে তদন্ত আদালতের মাধ্যমে এবং আইন প্রয়োগ করে সেগুলোকে ‘নিয়মিত’ করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর অভিযান চলাকালে যেসব মৃত্যু হয়েছে, তার মধ্যে যেগুলো কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে, সেগুলোকে ধর্তব্যে নিয়ে দোষী ব্যক্তিদের ‘যথাযথ শাস্তি দেয়া হয়েছে’ বলে দাবি করেন সাবেক এই জেনারেল।

তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণকালে সেনা সদস্যদের ‘ডিহিউম্যানাইজ’ করা হয়, যাতে তারা ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ মনে করা ভুলে যায়, মানুষকে টার্গেট বলতে শুরু করে। ফায়ারিং রেঞ্জে মানুষ আকৃতির টার্গেটের ওপর গুলি করে তাদের মানুষ হত্যার মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর করা হয়। এ কথা মনে রেখে সেনাবাহিনীকে কখনো বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মেশানো ঠিক হয়নি। ‘অথচ সেটাই ঘটেছে ২০০৩ সালে, যখন র‌্যাব গঠন করা হয়। এটি ছিল একটি মারাত্মক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। সেনা সদস্যদের যে প্রশিক্ষণ তা র‌্যাবে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ছিল না। ২০০৩-২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে কিছু বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে। র‌্যাব গঠনের আগে অপারেশন ক্লিন হার্টে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।’

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামে যৌথ বাহিনীর ওই অভিযান চলে। ওই অভিযানের কার্যক্রমকে দায়মুক্তি দিয়ে ২০০৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন, ২০০৩’ করা হয়। এর এক যুগ পর এক রিট মামলার রায়ে হাইকোর্ট ওই দায়মুক্তি আইনকে ‘সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল’ ঘোষণা করে।

আইকেবি বলেন, ‘সেনাসূত্র অনুযায়ী ১২ জন হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে এই সংখ্যাটি ছিল ৬০ জন। পরবর্তীতে ক্লিন হার্টের সব সদস্যকে ইনডেমনিটি দেয়া হয়। বস্তুত এই ইনডেমনিটি ছিল হত্যার লাইসেন্স প্রদান।’ ২০০৭- ২০০৯ পর্যন্ত সময়ে ডিজিএফআই ‘দেশের মুখ্য নিয়ন্ত্রক’ হয়ে ওঠে মন্তব্য করে আইকেবি বলেন, বিভিন্ন সময়ে তারা বিভিন্ন ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে তাদের সেলে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করতো। এর মধ্যে অনেক মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন।

‘তারা বিএনপির জনাব তারেক রহমানকেও উঠিয়ে এনে নির্যাতন করে। ওই সময় থেকে বস্তুত বেসামরিক ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে আটক রাখার, সেলের মধ্যে রাখা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়। বস্তুত যে কোনো ব্যক্তিকে উঠিয়ে এনে যা ইচ্ছা তাই করা যায় মর্মে তারা ভাবতে শুরু করে। তারা ভাবতে শুরু করে যা কিছুই তারা করুক না কেন, শেষ পর্যন্ত তারা পার পেয়ে যাবে।’ ২০০৭ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়ানোর জন্য যে সংঘাত শুরু হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।

ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘জরুরি অবস্থা চলাকালে সেনা সদস্যদের সংস্কৃতিতে কিছু পরিবর্তন আসে। তারা রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করে, তাদের মধ্যে আধিপত্যবোধের জন্ম হয়, সিনিয়র ও জুনিয়রের মধ্যে একটি বিভাজন সৃষ্টি হয়, নগদ সংস্কৃতির উত্থান হয় এবং ওপরস্থদের আদেশ অন্ধভাবে পালন করার প্রবণতা জন্ম হয়।’ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পিলখাতা হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ ধরে তিনি বলেন, ওই ঘটনায় ৫৭ জন সামরিক কর্মকর্তা এবং ১৭ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। বিদ্রোহ দমন করার পর বিডিআর সদস্যদের অন্তরীণ করা হয় এবং সেখানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়।

সেই জিজ্ঞাসাবাদের সময় পিলখানায় (বিডিআর সদর দপ্তর) র‌্যাব ও সামরিক সদস্যদের ‘নির্যাতনে’ আনুমানিক ৫০ জন বিডিআর সদস্যের মৃত্যু হয় বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ধারণা দেয়। পরে আদালত পিলখানা হত্যা মামলার রায়ে ১৫২ জন বিডিআর সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়। ইকবাল করিম ভূঁইয়া মনে করেন, বিডিআর বিদ্রোহের পর সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ‘ভারত ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষ’ তীব্রতর হয়, ‘সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে বিভাজন’ ব্যাপক রূপ ধারণ করে, পেশাদার অফিসারদের একপাশে সরিয়ে অনুগত অফিসারদের ওপরে নিয়ে আসা হয় এবং বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে সেনাবাহিনীকে নিয়োজিত করে বাহিনীটিকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ করা হয়। ‘এর বড় কারণ হলো- শেখ হাসিনা ভাবতেন, একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনী তার জন্য নিরাপদ।’

সাক্ষ্যে তিনি বলেন, ১৯৯৬-২০০১ সালের শাসন আমলের ‘দুর্বল’ দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে শেখ হাসিনা ২০০৯ সালের পর দেশ ও প্রশাসনের ওপরে তার ‘নিরঙ্কুশ আধিপত্য’ বিস্তার করতে শুরু করেন। ‘এজন্য তিনি সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অনেক রাজনৈতিক নেতার বিচার করে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেন এবং সংবিধান লংঘনের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংবিধানে সংযোজন করেন।’ আইকেবি বলেন, শেখ হাসিনা তার আত্মীয় মেজর জেনারেল তারিক আহম্মেদ সিদ্দিককে তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন এবং তার মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করতে সচেষ্ট হন। ‘মেজর জেনারেল সিদ্দিক অচিরেই প্রধানমন্ত্রী ও বাহিনী প্রধানদের মধ্যে সুপার চিফ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন: ডিজিএফআই, এনএসআই, র‌্যাব, এনটিএমসি, আনসার, বিজিবি ইত্যাদি সংস্থাগুলোকে তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন।’ এর মাধ্যমে ‘চারটি চক্রের’ উদ্ভব ঘটেছিল এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, ‘প্রথম চক্রটি হচ্ছে অপরাধ চক্র, যেটি ডিজিএফআই, এনএসআই, র‌্যাব ও এনটিএমসিকে নিয়ে তিনি (তারিক আহম্মেদ সিদ্দিক) পরিচালনা করতেন। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়ন, হত্যা ও গুমের মতো ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে।

‘দ্বিতীয় চক্রটি ছিল ডিপ স্টেট। এটি তিনি পরিচালনা করতেন এমএসপিএম (প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব), ডিজিএফআই, এনএসআই ইত্যাদির মাধ্যমে। এর মাধ্যমে তিনি তিন বাহিনী সম্পর্কে সমস্ত নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতেন। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো বাহিনী প্রধানদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।

‘তৃতীয় চক্রটি ছিল কেনাকাটা চক্র। এটিতে সংযুক্ত ছিল পিএসও, এএফডি, ডিজিডিপি, বাহিনীপ্রধান ইত্যাদি। এই চক্রের মাধ্যমে তিনি (তারিক) বিভিন্ন কেনাকাটায় প্রভাব বিস্তার করতেন। ‘চতুর্থ চক্রটি ছিল সামরিক প্রকৌশলী চক্র। মেজর জেনারেল সিদ্দিক ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের অফিসার হওয়ায় তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে আলাদা চক্র গড়ে তোলেন। এদের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে তার প্রভাব বিস্তার করা শুরু করেন। এটি ছিল অবৈধ অর্থের প্রধান উৎস।’

# আইকেবির চোখে র‌্যাব

ইকবাল করিম ভূঁইয়া তার সাক্ষ্যে বলেছেন, সেনাপ্রধান হওয়ার আগে থেকেই অন্যান্য সামরিক সদস্যদের মতো তিনি র‌্যাব সদস্যদের ‘অবৈধ ও বিচারবহির্ভূত কার্যক্রম’ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। ‘সেনাপ্রধান হওয়ার পরপরই আমি র‌্যাবের এডিজি, তৎকালীন কর্নেল (পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল) মুজিবকে আমার অফিসে ডেকে পাঠাই এবং এসব ক্রসফায়ার বন্ধ করতে বলি। আমি তাকে র‌্যাব ইন্টেলিজেন্সের প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসানকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলি। তিনি আমাকে কথা দেন, আর এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না।

‘পরবর্তী কিছুদিন আমি পত্রিকায় ক্রসফায়ারের ঘটনা দেখিনি। কিন্তু অচিরেই উপলব্ধি করতে পারি, ঘটনা ঘটছে, কিন্তু তা চাপা দেয়া হচ্ছে।’ এরপর যখন বেনজীর আহমেদ র‌্যাবের ডিজি এবং জিয়াউল আহসান এডিজি হন, তখন পরিস্থিতি আরও ‘বদলে যায়’ মন্তব্য করে আইকেবি বলেন, ‘ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমি আমার ডাইরেক্টর, মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান ও কমান্ডিং অফিসার আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলকে (যিনি বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আছেন) জিয়াউল আহসানের সঙ্গে কথা বলতে বলি।

‘ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান এসে আমাকে জানান, তিনি কথা বলেছেন, কিন্তু কোনো ভালো প্রতিশ্রুতি তার কাছ থেকে পাননি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল এসে আমাকে বলেন, ‘কথা বলে কোনো লাভ হয়নি, ওর মাথা ইট ও পাথরের টুকরো দিয়ে ঠাসা’। পরবর্তীতে আমাকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল জানায়, জিয়াউল আহসান তার বাসায় অস্ত্র রাখে, গার্ড মোতায়েন রাখে ও সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছে।’

অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ইকবাল বলেন, ‘তাকে (জিয়াউল আহসান) সামরিক কোয়ার্টারে থাকার নিয়ম-কানুন মেনে এগুলো পরিত্যাগ করতে বলা হয়। পরবর্তীতে জিয়াউল আহসান মেজর জেনারেল সিদ্দিক ও তার কোর্সমেট এএমএসপিএম কর্নেল মাহবুবের (বর্তমানে মেজর জেনারেল) ছত্রছায়ায় আমার আদেশ অমান্য করতে শুরু করে।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি