আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১১ জন প্রার্থী। পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচারণা প্রায় শেষ। ১১ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটের আসল লড়াই হবে বিএনপির প্রার্থী ও বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত ২ স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে। এর মধ্যে ১১ দলীয় ইসলামী জোটের নাটকীয়তায় বেকায়দায় পড়েছে জোটের দুই প্রার্থী।
সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ আসনে প্রার্থী হয়েছেন আজহারুল ইসলাম মান্নান (বিএনপি) ধানের শীষ প্রতীক, অধ্যাপক রেজাউল করিম (স্বতন্ত্র) ঘোড়া, মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন (স্বতন্ত্র) ফুটবল, গোলাম মসীহ্ (ইসলামী আন্দোলন) হাতপাখা, আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী (খেলাফত আন্দোলন) বটগাছ, ইকবাল হোসেন ভূইয়া (জামায়েতে ইসলামী) দাঁড়িপাল্লা, শাহজাহান (খেলাফত মজলিস) রিকশা, অঞ্জন দাস (গণসংহতি আন্দোলন) মাথাল, আরিফুল ইসলাম (আমার বাংলাদেশ পার্টি) ঈগল, ওয়াহিদুর রহমান মিল্কি (গণঅধিকার পরিষদ) ট্রাক প্রতীক ও আবদুল করিম মুন্সী (জনতার দল) কলম প্রতীক। নির্বাচনী এলাকার গ্রামগঞ্জে বিভিন্ন আশ্বাসে ভোট প্রার্থনায় মাঠ চষেছেন তারা। তবে ভোটের লড়াই হচ্ছে মূলত ধানের শীষ, স্বতন্ত্র (ঘোড়া) ও (ফুটবল) প্রতীকের প্রার্থীর মধ্যে।
বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীরা জানান, তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা যোগ্যতা দক্ষতার মূল্যায়ন না করে সবাইকে নিজের বশ্যতা স্বীকার করাতে চান ধানের শীষের মান্নান। বিভিন্ন শিল্পকারখানা নিয়ন্ত্রণ, প্রতিপক্ষের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, দখল, নৌ-চাঁদাবাজদের লালন পালন করে বিতর্কিত হয়েছেন তিনি ও তার ছেলে। তাছাড়া বিগত সময়ে উপজেলা বিএনপির হাল ধরা সিনিয়র নেতাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলা, দাম্ভিকপূর্ণ আচরণ করাসহ অনেক কারণে তৃণমূলের অভিজ্ঞ নেতাকর্মীরা মান্নানের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
এছাড়াও রাজনৈতিক কারণে তার নিয়ন্ত্রণে না থাকায় নির্বাচনের অযুহাতে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের বেশকিছু নেতাকে কেন্দ্র থেকে বহিষ্কারে প্রভাব খাটিয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী মান্নান। মূল্যায়ন না হওয়া বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীরা এবারের সংসদ নির্বাচনে অবস্থান নিয়েছেন বিএনপি থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রেজাউল করিম (ঘোড়া) ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি, সাবেক সাংসদ মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের (ফুটবল) পক্ষে। তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী বিপক্ষে থাকায় নির্বাচনী মাঠে দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে বিশেষ করে ফুটবল প্রতীকের কাছে মান্নানের ধরাশায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয় বোদ্ধারা।
অনেকেই জানান, বিএনপির সাবেক জেলা সভাপতি গিয়াস উদ্দিনের ভোট ব্যাংক হচ্ছে সিদ্ধিরগঞ্জ। সেখানে সব প্রার্থীর চেয়ে তার গ্রহণযোগ্যতা বেশি। তাছাড়া সোনারগাঁয়ের তৃণমূল বিএনপির অনেক নেতাকর্মী তার সমর্থক।এমনকি ধানের শীষের প্রার্থী মান্নানের নিজের এলাকায় বেশ প্রভাব সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে তার। অপরদিকে ঘোড়া প্রতীকের সঙ্গেও রয়েছেন তৃণমূলের অভিজ্ঞ নেতাকর্মীরা। তার নিজস্ব একটা ভোট ব্যাংক রয়েছে। তিনি অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। সোনারগাঁয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে রয়েছে তার বিপুল সমর্থক। মাঠ পর্যায়েও তার শক্ত অবস্থান রয়েছে। এদিকে মান্নান ধানের শীষ প্রতীক পাওয়ায় বিএনপিকে ভলোবেসে সাধারণ ভোটাররা তাকে নির্বাচিত করবেন বলে মনে করেন অনেকে।
অপরদিকে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকের প্রার্থী শাহজাহানকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও জামায়াতে ইসলামীর (দাড়িপাল্লা) প্রার্থী ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া প্রার্থীতা প্রত্যাহার না করায় তার নেতাকর্মীরা জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে দাঁড়িপাল্লায় ভোট চেয়ে বিপাকে ফেলে দেয় রিকশার প্রার্থীকে। পরবর্তিতে দুজনই ভোট চান দুই প্রতীকে। একই জোটভূক্ত দুই প্রতীকে ভোট চাওয়া নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েন ভোটাররা। পরে আবার বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকে রিকশাকে বসিয়ে দাঁড়িপাল্লাকেই জোটের প্রার্থী বলে ঘোষণা দেন দলটির প্রধান। এই ঘোষণার পরও রিকশার পক্ষে ভোট চাইছেন অনেকে।
ইসলামী দলভুক্ত জোটের এমন নাটকীয়তায় তাদের ভোট দেয়া থেকে ভোটাররা সরে আসছেন বলে জানান অনেকে। এছাড়াও ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন থেকে নির্বাচন করছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা গোলাম মসিহ্। সব মিলিয়ে ভোটের হিসেবে এই আসনে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদ্বয়ের মধ্যেই মূলত তুমুল লড়াই হবে বলে ধারণা করছেন ভোটার ও রাজনৈতিক বোদ্ধারা। এই আসনে নারী-পুরুষ ও তৃতীয় লিঙ্গ মিলিয়ে মোট ভোটার ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৩৪৮ জন। এখানে ১১ প্রার্থীর মধ্যে অনেক প্রতিদ্বন্দ্বির জামানত বাজেয়াপ্ত হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।