‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ করে ‘গৃহায়ন ধানমন্ডি’ প্রকল্পে দুদকের সাবেক দুই কমিশনারের নামে ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট বরাদ্দের অভিযোগে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান দেলওয়ারসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদক উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম সোমবার, (০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ধানমন্ডি গৃহায়ন প্রকল্পে ফ্ল্যাট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধান শেষে কমিশন আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
অনুসন্ধানের বরাতে দুদক জানিয়েছে, ‘গৃহায়ন ধানমন্ডি’ প্রকল্পের (প্রথম পর্যায়) দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মচারীরা ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ করে সিমপ্লেক্স (সাধারণ) ফ্ল্যাটের পরিবর্তে প্রায় দ্বিগুণ আয়তনের দুটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট অনুমোদন ও বরাদ্দ দেন। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ২২২তম ও ২২৫তম বোর্ড সভায় ‘বৈষম্যমূলক ও বিধিবহির্ভূত’ এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
যাদের নামে ফ্ল্যাট দুটি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, তারা হলেন দুদক ও বিটিআরসির সাবেক কমিশনার, সাবেক বিচারক জহুরুল হক এবং দুদকের সাবেক কমিশনার, সাবেক সচিব মোজাম্মেল হক খান।
দুদকের মামলায় এ দুজনের সঙ্গে আরও ৫ জনকে আসামি করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ৪ জন হলেন, সাবেক চেয়ারম্যান দেলওয়ার হায়দার, সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) শাহজাহান আলী, সাবেক সদস্য (ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা) মইনুল হক আনছারী, সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা, নকশা ও বিশেষ প্রকল্প) বিজয় কুমার মন্ডল, সাবেক সদস্য (প্রকৌশল ও সমন্বয়) কাজী ওয়াসিফ আহমাদ। এছাড়া মিথ্যা হলফনামা দেয়ার অভিযোগে সাবেক রেজিস্ট্রার জেনারেল (সিনিয়র জেলা জজ) ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য সৈয়দ আমিনুল ইসলামকে আসামি করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নীতিমালা ভেঙে ১২ কর্মকর্তার নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দের বিষয়ে গত বছরের ৫ মে একটি বেসরকারি টিভি স্টেশন খবর প্রচার করে। এতে বলা হয়, ধানমন্ডি-৬ এর প্লট নম্বর ৬৩ মূলত সরকারি খাস জমি, যার বাজারমূল্য অত্যন্ত বেশি।
অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে এই জমি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং সেখানে ১৪ তলা একটি ভবন নির্মাণের নির্দেশ দেয়া হয়। ভবনটিতে রয়েছে দুটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট ও নিচতলাসহ দুই তলা গাড়ি পার্কিং।
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘দিনের ভোট রাতে নেয়ার সঙ্গে জড়িত’ সচিব পদমর্যাদার ১২ কর্মকর্তাকে ‘পুরস্কার হিসেবে’ শেখ হাসিনার আমলে ‘পরিকল্পিতভাবে’ এসব ফ্ল্যাট দেয়া হয় বলে অভিযোগ।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের ‘সত্যতা পাওয়ার’ কথা গতবছরের মে মাসে জানিয়েছিল দুদক।
সংস্থাটির অধিকতর অনুসন্ধানের মধ্যে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের একটি তদন্ত কমিটির সুপারিশ আমলে নিয়ে গত ৮ জুলাই এসব ফ্ল্যাটের বরাদ্দ বাতিল করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুদকের সাবেক কমিশনার জহুরুল হকের নামে প্রকল্পের ডি-১২ ও ডি-১৩ এবং মোজাম্মেলের নামে সি-১২ ও সি-১৩ নম্বর ফ্ল্যাট একত্র করা হয়। তাতে করে ৪১০৫.০৫ বর্গফুট ও ৪৩০৮.৬৮ বর্গফুট আয়তনের দুটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা হয়।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ওই প্রকল্পের মূল পরিকল্পনা ও নীতিমালায় কোথাও ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটের উল্লেখ ছিল না বলে জানান তারা।
সম্পদ বিবরণী দিতে হবে ১০ জনকে। অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ১০ জনের প্রদর্শিতের চাইতে বেশি সম্পদ থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন দুদক কর্মকর্তারা। সম্পদের সঠিক হিসাব ও উৎস যাচাইয়ের জন্য তাদেরকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নির্দেশ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।
ওই ১০ জন হলেন- দুদকের সাবেক কমিশনার জহুরুল হক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব ইউনুসুর রহমান, দুদকের সাবেক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব এম এ কাদের সরকার, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের বর্তমান চেয়ারম্যান এম আসলাম আলম, পিএসসির সাবেক সচিব আকতারী মমতাজ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সাবেক সচিব সিরাজুল হক খান, সাবেক রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম, জ্বালানি বিভাগের সাবেক সচিব ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সচিব এস এম গোলাম ফারুক।