বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা জমেছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফার্নেস অয়েলচালিত ৪০টি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮-১০ মাসের বিল বকেয়া। বিল পরিশোধে দেরির কারণে ডলারের বিনিময় হার ও সুদের কারণে ৮ হাজার কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। দ্রুত বকেয়া শোধ করা না হলে পবিত্র রোজা ও গ্রীষ্মে জ্বালানিসংকটের কারণে ব্যাপক লোডশেডিংয়ের শঙ্কা আছে।
সোমবার, (০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছে বিআইপিপিএ। সংগঠনের নেতারা বলেন, এক বছর আগেও বকেয়া ছিল ৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে বিআইপিপিএর সভাপতি কে এম রেজাউল হাসনাত (ডেভিড হাসনাত) বলেন, গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা যদি ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়, তাহলে দুর্যোগ ঘটে যাবে। বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে জীর্ণশীর্ণ, আর চাপ নেয়ার ক্ষমতা নেই। রোজার আগে বকেয়ার একটা অংশ শোধ করা না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিস্থিতি খারাপ হবে।
এ সংক্রান্ত অন্য এক প্রশ্নের জবাবে কে এম রেজাউল হাসনাত বলেন, নতুন সরকার এসেই বকেয়া শোধের চাপে পড়বে। বকেয়ার ৬০ শতাংশ পরিশোধ করা হলে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। ৩-৪ মাসের বকেয়া থাকলে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়ে নেয়া যায়।
‘বিদ্যুৎ খাতে বৈষম্যমূলক আচরণ, চুক্তি লঙ্ঘন ও বিনিয়োগ আস্থার সংকট’ শিরোনামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে কে এম রেজাউল হাসনাত দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তার মধ্যে চুক্তির বৈষম্য তুলে ধরেন। এতে বলা হয়, দেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জরিমানা আদায় করা হলেও আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের জরিমানা কর্তন থেকে বিরত থাকছে পিডিবি।
লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন বিআইপিপিএর সাবেক সভাপতি ইমরান করিম। তিনি বলেন, দেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি আমদানিতে শুল্ক দিতে হয়। অথচ বিদ্যুৎ আমদানিতে কোনো শুল্ক দিতে হয় না। বকেয়া থাকলেই বিদ্যুৎ বন্ধের হুমকি দেয় আদানি, বন্ধও করেছে। অথচ দেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া কখনো চার মাসের নিচে নামেনি, এর চেয়ে বেশি বকেয়া ছিল সব সময়। এখন জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলা, সরবরাহকারীদের বিল পরিশোধ এবং ব্যাংক দায় মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
প্রসঙ্গত, চুক্তি অনুসারে দেশের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে নেয় পিডিবি। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে ১০ শতাংশ সময় উৎপাদন বন্ধ রাখতে (আউটেজ) পারে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর বাইরে বন্ধ রাখার সময় কেন্দ্রভাড়া (ক্যাপাসিটি পেমেন্ট) পাবে না তারা। জরিমানা দিতে হবে তাদের। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিল জমতে থাকায় তারা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে অস্বীকৃতি জানালে ২০২২ সালের জুলাই থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখার সময় হিসাব না করেই বিদ্যুৎ বিল দিতে থাকে পিডিবি।
বিদ্যুৎ বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই পিডিবির বোর্ডে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এসে এটি বাতিল করে জরিমানা আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জরিমানা, অতিরিক্ত কেন্দ্রভাড়া সুদসহ আদায়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ২ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধান্ত নেয় পিডিবি।
এ জরিমানা আদায়ের বিরোধিতা করা হয় বিআইপিপিএ’র সংবাদ সম্মেলনে। এতে বলা হয়, চুক্তি অনুসারে পিডিবি বিদ্যুৎ বিল দিতে না পারলে বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন বন্ধ রাখতে পারে। বিপুল বকেয়া থাকলেও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। বকেয়াজনিত আর্থিক সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন যখন সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে, ওই সময় অপর্যাপ্ত সরবরাহ দেখিয়ে জরিমানা হিসাব করা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। পিডিবির নিজস্ব ব্যর্থতার দায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপানো আইন ও চুক্তির পরিপন্থী।
বিআইপিপিএ বলছে, দেশীয় ও বিদেশি কোম্পানির ক্ষেত্রে জরিমানার বিধান ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। ৩০টি ফার্নেস কেন্দ্রের জরিমানা কর্তনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে নালিশ দিলেও তারা তা খারিজ করে দিয়েছে। রোজা ও সেচ মৌসুমের আগে এ ধরনের বিরোধ বিদ্যুৎ খাতে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
বিআইপিপিএ’র সভাপতি কে এম রেজাউল হাসনাত বলেন, নতুন সরকার গঠনের পর এক থেকে দেড় মাস সময় লাগে গুছিয়ে আনতে। নতুন সরকারকে বিপদে ফেলার কোনো ইচ্ছা নেই তাদের। তারা হুমকিও দিচ্ছেন না, বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। নতুন সরকার আসার কয়েক দিন আগে ইচ্ছাকৃতভাবে জরিমানা কাটার ব্যবস্থা নিয়েছে। একটি ঝামেলা তৈরি করতেই এটি করা হয়েছে।