image

প্রচারের কোলাহল শেষ, কর্মচঞ্চল নির্বাচনী ক্যাম্প

ফয়েজ আহমেদ তুষার

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা মঙ্গলবার,(১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) সকালে শেষ হয়েছে। আইনগত নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মিছিল, জনসভা, জনসংযোগ হয়নি। প্রতীক বরাদ্দের পর টানা বিশ দিনের প্রচারণায় দেশজুড়ে যে ভোটের আমেজ তৈরি হয়েছিল, মঙ্গলবার তা নীরব হয়ে গেছে। তবে রাজধানীসহ সারাদেশে প্রার্থীদের নির্বাচনী ক্যাম্পে দিনভর কর্মী-সমর্থকদের সরব উপস্থিতি ছিল।

২৯৯ আসনে ভোট কাল, প্রার্থী ২০২৮ জন

৪২৬৫৯টি ভোটকেন্দ্র: অর্ধেকই ঝুঁকিপূর্ণ

সিসি ক্যামেরা আছে ‘৯০ শতাংশ কেন্দ্রে’

ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি

অনলাইন ও এসএমএসে ‘প্রচারণা চলছে’

মাঠে বিভিন্ন বাহিনীর ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য

৯৭০০ সংবাদকর্মীর নিবন্ধন, বিদেশি ১৫৬ জন

প্রবাসীদের ৪ লাখ ২০ হাজার ভোট দেশে পৌঁছেছে

কোন দল কতটি আসন পাবে, কত শতাংশ ভোট পাবে নির্বাচন সামনে রেখে এ সংক্রান্ত বেশকিছু জরিপ হয়েছে। বেশ কয়েকটি নতুন সংস্থাও এবার জরিপ করেছে। বেশ কয়েকটি জরিপ প্রতিবেদনে বিএনপিকে ‘দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে’ এগিয়ে রাখা হলেও বিপরীত রিপোর্টও দিয়েছে দু-একটি সংস্থা। একটি জরিপে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ‘হড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের’ আভাসও দেয়া হয়েছে

আগামীকাল একইদিনে সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। সেজন্য আগের নির্বাচনগুলোর চেয়ে এবার ভোটের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে।

আগামীকাল সকাল সাড়ে ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে একটানা চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। সেদিন দেশের তিনশটি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে একযোগে ভোটের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। শেরপুর-৩ আসনে সম্প্রতি জামায়াত ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মারা যাওয়ায় সেখানে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। ওই আসনে পরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

মঙ্গলবার দেশের ২৯৯টি আসনে ব্যালট পেপার পৌঁছে গেছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে কমিশন।

চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বছরের মাথায় অনুষ্ঠ্যেয় এই নির্বাচনে নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫০টি দল অংশ নিচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না আওয়ামী লীগ।

প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী

ভোটে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর ভূমিকায় রয়েছে বিএনপি ও জামায়াত ইসলামী। কোন দল কতটি আসন পাবে, কত শতাংশ ভোট পাবে ভোট সামনে রেখে এ সংক্রান্ত বেশকিছু জরিপ হয়েছে। বেশ কয়েকটি নতুন সংস্থাও এবার জরিপ করেছে। কয়েকটি জরিপ প্রতিবেদনে বিএনপির এগিয়ে থাকার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও বিপরীতমুখী ফলাফলও এসেছে কোনো কোনো জরিপের ফলাফলে। কয়েকটি জরিপ বিএনপিকে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে এগিয়ে রাখলেও একটি জড়িপ বিএনপি-জামায়াতের হড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কথা বলছে।

নির্বাচনে দলীয় ৫০টি দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ২৯৯টি আসনে ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী অংশগ্রহণ করছেন। এর মধ্যে ৮১ জন নারী প্রার্থী বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।

এবারের নির্বাচনে সবমিলিয়ে ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি আরও জানান, এর মধ্যে ৮১ জন নারী প্রার্থী।

ইসির তথ্যনুযায়ী, মোট প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে আড়াইশ’র বেশি স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন।

একবার সুযোগ চায় জামায়াত

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে ‘একবার’ সুযোগ চাইছেন। প্রচরণায় চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির চিত্র সমানে এনে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছেন তারা। জামায়াত বলছে, তার দলকে বিশ্বাস করে জনগণ ভোট দিলে, জামায়াত সরকার গঠন করতে পারলে দেশ থেকে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি নির্মূল করা হবে।

অভিজ্ঞতার কথা বলছে বিএনপি

বিএনপির প্রার্থীরা দলীয় পরিকল্পনা উপস্থাপন করে দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। সরকার চালাতে অভিজ্ঞতার প্রয়োজনীয়তার কথা, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে অবস্থানের উঠে আসছে তাদের বক্তব্যে। বিএনপি বলছে, একমাত্র তাদের দলকে ভোট দিলেই কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব।

‘৯০ শতাংশ’ কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা

নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, এবার মোট ৪২ হাজার ৬৫৯ টি কেন্দ্রে সশরীরে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। আর ২৯৯টা কেন্দ্রে পোস্টাল ভোটের কাউন্টিং হবে। মোট ৪২ হাজার ৯৫৮টি কেন্দ্রে এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তিনি জানান, ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সারাদেশে এখন মোতায়েন আছে বিভিন্ন বাহিনীর ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য। এছাড়া ২ হাজার ৯৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত আছেন।

এই কমিশনার বলেন, ‘আমরা আনুমানিক ৫০ ভাগ (শতাংশ) সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছি। বাকি ৫০ ভাগ গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। যেটাকে আমরা অনেক সময় বলে থাকি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছি।’

তিনি জানান, মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখের বেশি। তিনি বলেন, ‘এই পর্যন্ত ৯ হাজার ৭০০ জন সংবাদকর্মী নিবন্ধন করেছেন। যার মধ্যে ১৫৬ জন বিদেশি সাংবাদিক।’

প্রার্থিতা বাতিল

গত ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়। ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রচারণা শেষ করতে হবে। সেই হিসেবে, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার সময় শেষ হয়েছে। এরপর আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় কোনো জনসভা, মিছিল বা শোভাযাত্রা করা যাবে না বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে ইসি। এখন কোনো প্রার্থী ভোটের প্রচারণা চালালে সেটি নির্বাচনী বিধিমালা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে, যার ফলে তার প্রার্থিতা ‘বাতিল হয়ে যেতে পারে’।

এদিকে, গতকাল সোমবার প্রচারণার শেষদিনে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে দৌড়াতে দেখা গেছে বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের। নানান ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজের পক্ষে ভোট চেয়েছেন তারা।

সরেজমিন পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অনেক জায়গায় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা গতকাল সোমবার রাতভর নির্বাচনী গণসংযোগ করেছেন। বিশেষ করে বাজার, লঞ্চঘাট, বাস টার্মিনালসহ রাতে যেসব এলাকা জমজমাট থাকে, সেসব এলাকায় সারারাত ভোটের প্রচারণা চলতে দেখা গেছে।

*অনলাইন প্রচারণা*

মঙ্গলবার সকাল থেকে স্বশরীরে নির্বাচনী প্রচারণা না দেখা গেলেও মোবাইল ফোন ও অনলাইনে প্রচারণা চলছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ফেইসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। মোবাইল ফোনের এসএমএসেও (খুদে বার্তা) প্রচারণা অব্যাহত আছে।

নির্বাচন সামনে রেখে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। আগামীকাল সবাইকে ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। নির্বাচন ফলাফল যাই হোক না কেন, তা মেনে নেয়ার আহ্বানও এসেছে সরকারপ্রধানের ভাষণে। নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন দেড় বছর আগে দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান।

*পোস্টাল ভোট*

পোস্টাল ভোট এবারের নির্বাচনে নতুন মাত্র যুক্ত করেছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে ও দেশের বাইরে থেকে আসা ৭ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি ডাকযোগের ভোট (পোস্টাল ব্যালট) সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ইসি।

ইসি জানায়, প্রবাসীদের ভোট দেয়ার সুবিধার্থে মোট ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি ব্যালট পেপার বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। এরমধ্যে ৪ লাখ ৭১ হাজার ৯৫৭ জন প্রবাসী তাদের ভোট দিয়ে পুনরায় দেশে পাঠিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তাদের হাতে এসে পৌঁছেছে ৪ লাখ ১৯ হাজার ৯১৮টি ব্যালট। বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দেশের অভ্যন্তরে সরকারি চাকরিজীবী, কারাবন্দী ও যারা ভোটকেন্দ্রে যেতে অক্ষম, এমন ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮৯৮ জন ভোটারের কাছে ব্যালট পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ৩ লাখ ১০ হাজার ১৫৪ জন ভোটার তাদের ব্যালট পূরণ করে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়েছেন।

দেশের ৭৫টি কারাগারে প্রায় ৮৬ হাজার বন্দীর মধ্যে এবার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন ৫ হাজার ৬৭ জন।

ইসি জানায়, পোস্টাল ব্যালট সংগ্রহের প্রক্রিয়া এখনও চলমান। আগামীল বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত যেসব ব্যালট পেপার রিটার্নিং কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছাবে, কেবল সেগুলোই গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এরপরই শুরু হবে চূড়ান্ত ভোট গণনা কার্যক্রম।

এবারে একই সঙ্গে দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় নির্বাচনের ফলাফলে দেরি হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি