ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নাগরিকদের দলে দলে, সপরিবারে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ‘দ্বিধাহীন চিত্তে’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে এবং গৌরবের সঙ্গে নব-নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে, তাদের সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করে বিদায় নিয়ে নিজ নিজ কাজে ফিরে যাব
সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুদিন আগে মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, “বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন।”
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে না- এমন ‘অপপ্রচারে’ কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, “এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও পরিকল্পিত অপপ্রচার, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হল আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণে বিঘ্ন সৃষ্টি করা। আপনারা নিশ্চিত থাকুন, নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার দায়িত্ব সমাপ্ত করবে।”
নাগরিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আপনার মূল্যবান ভোট দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে দিন। দেশের চাবি আপনার হাতে। সে চাবিটি সঠিকভাবে ব্যবহার করুন। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন। এবারের ভোটের দিন হোক নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন।”
জুলাই অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হচ্ছে বৃহস্পতিবার। জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে নাগরিকদের অনুমোদন নিতে একই দিনে গণভোটও হবে। তার আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা; যিনি ২০০২৪ সালের অগাস্টে শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
ভাষণের শুরুতেই মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “আজ আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি এক অতি তাৎপর্যপূর্ণ, ঐতিহাসিক ও ভবিষ্যৎনির্ধারক মুহূর্তে। আর মাত্র একদিন পরই সারাদেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং তার সাথে জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট। সারা জাতির বহু বছরের আকাঙ্ক্ষার দিন।”
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করে তিনি বলেন, “আপামর জনগণের- বিশেষ করে জুলাইয়ের যোদ্ধাদের—আত্মত্যাগ ছাড়া এই নির্বাচন, এই গণভোট- কোনোটিই সম্ভব হতো না। সমগ্র জাতি তাই তাদের কাছে চিরঋণী।”
এই নির্বাচনের ফলাফল যে জাতির জীবনে ‘সুদূরপ্রসারী’ প্রভাব রাখবে, সে কথা তুলে ধরে ইউনূস বলেন, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, গণতন্ত্রের চরিত্র ও স্থায়িত্ব এবং আগামী প্রজন্মের ভাগ্য এর মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে। এবার নির্বাচনের প্রচার পর্বে তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো ‘সংযম’, প্রার্থীদের ‘দায়িত্বশীল আচরণ’ এবং সাধারণ মানুষের ‘সচেতনতার’ প্রশংসা করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।
তবে এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেও কয়েকটি সহিংস ঘটনায় প্রাণহানিতে ‘গভীর বেদনা’ প্রকাশ করেন তিনি।
ইউনূস বলেন, এবারের নির্বাচনে ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যা এ যাবৎকালের যে কোনো নির্বাচনের মধ্যে সর্বোচ্চ। স্বতন্ত্রসহ মোট প্রার্থীর সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি, আগের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে এর চেয়ে বেশি প্রার্থী প্রায় কখনোই দেখা যায়নি। তিনি বলেন, “এবারের নির্বাচন শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়। এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের যে জাগরণ আমরা দেখেছি, এই নির্বাচন তার সাংবিধানিক প্রকাশ। রাজপথের সেই দাবি আজ আপনাদের ব্যালটের মাধ্যমে উচ্চারিত হতে যাচ্ছে। তাই এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।”
তিনি বলেন, “এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছি না— একই সাথে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে। আমরা কি একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে পারব, নাকি আবারও পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃত্তে ফিরে যাব—এই প্রশ্নের উত্তর দেবে গণভোট।”
দেশের উন্নয়ন আর গণতন্ত্রের সংগ্রামে নারী ও তরুণদের অবদানের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ নয়, দাবি জানাচ্ছি–ভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে ভোটকেন্দ্রে যান। আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না; এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে এবং প্রমাণ করবে—এই দেশ তার তরুণ ও নারী এবং সংগ্রামী জনতার কণ্ঠ আর কোনদিন হারাতে দেবে না।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করতে সরকার ‘সর্বোচ্চ প্রস্তুতি’ গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, “এবার রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও ব্যাপকভাবে দায়িত্বে রাখা হয়েছে, যাতে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা দ্রুত ও কঠোরভাবে প্রতিহত করা যায়।”
নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরা, বডিক্যাম, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য পোস্টাল ভোটের ব্যবস্থা করার কথাও তিনি বলেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “ভোটাধিকার কারো দয়া নয়; এটি আমাদের সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার। এই অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমেই আমরা ঠিক করি, আমাদের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।”
রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনারা দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্দেশ দিন, যেন কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কেন্দ্র দখল, ভোটে প্রভাব বিস্তার করা কিংবা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না হয়।”
তিনি বলেন, “কেউ যেন সোশাল মিডিয়া বা অন্য কোনভাবে গুজব না-ছড়ায়। রাষ্ট্র কোনোভাবেই এ ধরনের আচরণ সহ্য করবে না।” অতীতের কথা মনে করিয়ে দিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—একটি ত্রুটিপূর্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ বা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না। বরং দেশের সর্বনাশ ডেকে আনে।”
নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই “একটি চিহ্নিত মহল পরিকল্পিতভাবে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে নাগরিকদের মনে সন্দেহ, ভয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে” বলে অভিযোগ করেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, “তাদের উদ্দেশ্য একটাই- নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করা, জনগণের আস্থাকে দুর্বল করা। নির্বাচন নিয়ে যারা বিগত মাসগুলিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংশয়-সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল, তারা সম্পূর্ণভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। জনগণকে বিভ্রান্ত করতে তারা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে।”
তথ্য যাচাইয়ের জন্য নির্বাচনবন্ধু হটলাইন- ৩৩৩- এ ফোন করে সঠিক খবর জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেন প্রধান উপদেষ্টা। গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, জুলাই সনদের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য হওয়া সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। এখন তাতে জনগণের সম্মতি নিতেই এ গণভোটের আয়োজন।
তিনি বলেন, “এই গণভোটে আপনার একটি ভোট শুধু একটি কাগজে দেওয়া সিল নয়- এটি আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ, আপনার পরিবারের নিরাপত্তা এবং দেশের আগামী দিনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। আজ আপনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তার প্রভাব পড়বে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে। এটি এমন একটি মুহূর্ত, যেখানে নাগরিক হিসেবে আপনার দায়িত্ব ও অধিকার এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছে। আমি তাই আপনাদের সবাইকে এই গণভোটে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। অবশ্যই ভোট দিন। নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নিশ্চিত করুন।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচন হয়ে গেলে নির্বাচিত সরকার দ্রুত দায়িত্ব গ্রহণ করবে; তার সঙ্গে শেষ হবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব। আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে এবং গৌরবের সঙ্গে নব-নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে, তাদের সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করে বিদায় নিয়ে নিজ নিজ কাজে ফিরে যাব। আমরা এই শুভ মুহূর্তের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।”
দেশবাসীর উদ্দেশে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “আসুন উৎসবমুখর নির্বাচন বাস্তবে রূপায়িত করে এই দিনটিকে ইতিহাসের স্মরণীয় দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে রাখি।”