image

ট্রাইব্যুনাল: আনিসুল ও সালমানের মামলায় সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন, তাদের ‘পরামর্শেই দেখামাত্র গুলির নির্দেশ’ দাবি চিফ প্রসিকিউটরের

‘আনিসুল ও সালমানের ভোট দেয়ার খবর মিথ্যা’: আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায়

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে করা একটি মামলায় সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এর মধ্য দিয়ে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হলো। সূচনা বক্তব্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের ‘পরামর্শেই’ জুলাই আন্দোলন দমনে ‘কারফিউ জারি ও দেখামাত্র গুলির নির্দেশ’ দেয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই মামলায় মঙ্গলবার,(১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এর অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এই মামলার আসামি আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। আজ তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি মামলার প্রথম সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য করেছে ট্রাইব্যুনাল।

সূচনা বক্তব্যে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে যে ছাত্র-জনতার আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘ ১৬ বছরের পরিকল্পিত দমনপীড়ন, স্বৈরতন্ত্র ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধ, একটি ঐতিহাসিক গণজাগরণ। এই মামলায় দুই আসামির বিরুদ্ধে যে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে এবং যে প্রমাণাদি উপস্থাপন করা হবে, তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করবে যে এই হত্যাযজ্ঞ ছিল পূর্বপরিকল্পিত, পদ্ধতিগত, লক্ষ্যভিত্তিক এবং ব্যাপক মাত্রায় সংঘটিত।

চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, আসামি সালমান এফ রহমান সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। আসামি আনিসুল হক আইন রক্ষার শপথ নিয়েও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে আইনি ও নীতিগত প্রশ্রয় দিয়েছেন।

মামলার সূচনা বক্তব্যে তাজুল বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাতে আনিসুল ও সালমান আন্দোলন দমনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গণভবনে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং সেনা মোতায়েন ও দেশব্যাপী কারফিউ জারি করা হয়, যা হত্যাযজ্ঞকে আরও ত্বরান্বিত করে। এরপর ২০২৪ সালের ২০ জুলাই, ২৮ জুলাই, ৪ আগস্ট এবং ৫ আগস্ট, পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসেও এই রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞ থামেনি। এই হত্যাযজ্ঞের অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগরীর মিরপুরে সিফাত হাওলাদার, আখতারুজ্জামান, শাহরিয়ার আলভীসহ একের পর এক তরুণ প্রাণ ঝরে পড়ে। শুধু ২০ জুলাই একদিনেই কমপক্ষে ২০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

শুনানি শেষে তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে আসামি আনিসুল হক এবং সালমান এফ রহমান নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তারা পরস্পরের সঙ্গে একাধিক বৈঠক ও টেলিফোনে কথোপকথনের মাধ্যমে জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতাকে নির্মূল করার ষড়যন্ত্র করেছেন। বারুদাস্ত্র, হেলিকপ্টার এবং সামরিক বাহিনী ব্যবহারের পরিকল্পনা তারাই করেছেন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে প্রভাবিত করেছেন। এরই ফলশ্রুতিতে দেশজুড়ে পাখির মতো গুলি করে ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়েছে।’

কারফিউ ও গুলির নির্দেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখিয়েছি যে কারফিউ জারির ব্যাপারে সালমান এফ রহমান এবং আনিসুল হকের শলাপরামর্শ ছিল। তাদের পরামর্শেই দেখামাত্র গুলির নির্দেশ বা পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছে। আনিসুল হক বিশেষ করে ‘টু স্কুল অব থটস’-এর কথা বলেছিলেন, যার একটি ছিল আন্দোলনকারীদের একেবারে নির্মূল করে দেয়া। এই দুজনের মাথা থেকেই এসব পরিকল্পনা এসেছে। তাদের গ্যাং অব ফোরের সদস্য বলা হয়।’

এই দুই আসামির বিরুদ্ধে ২৮ জন সাক্ষীর তালিকা দেয়া হয়েছে জানিয়ে তাজুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘ডিজিটাল, ডকুমেন্টারি ও লাইভ এভিডেন্সের মাধ্যমে তাদের অপরাধ অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হবে প্রসিকিউশন।’

গত ১২ জানুয়ারি সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। ওইদিন নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ট্রাইব্যুনালের কাছে ন্যায় বিচার চেয়েছিলেন আসামিরা। প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগে বলা হয়, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতেন সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ফোনে কথা বলেন তারা। তাদের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনায় অনেক ছাত্র-জনতার প্রাণহানি ঘটলেও নির্যাতন বন্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এছাড়া ওই বছরের ২৩ জুলাই মিরপুরে হত্যাকা-, ২৮ জুলাই মিরপুর-১০ এ মারণাস্ত্র ব্যবহার, ৪ আগস্ট মিরপুর-১ এ ১২ জন এবং ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘিরে মিরপুর-২, ১০ ও ১৩ নম্বর এলাকায় ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনাকে তাদের পরিকল্পনা ও নির্দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর এই দুজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। একইদিন তাদের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল-১। আওয়ামী লীগের এই দুই প্রভাবশালী নেতা বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন।

‘আনিসুল ও সালমানের ভোট দেয়ার খবর মিথ্যা’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো কারাগারে থেকে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের ভোট দেয়ার খবরকে ‘মিথ্যা ও গুঞ্জন’ বলে দাবি করেছেন তাদের আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায়।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের মক্কেলদের নির্দেশনায় জানাচ্ছি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি খবর ছড়িয়েছে যে তারা জেলখানা থেকে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এই কথাটি আসলে মিথ্যা। জেলখানা থেকে ভোট দেয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, আগে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। উনারা কোনো রেজিস্ট্রেশনই করেননি। যেহেতু রেজিস্ট্রেশন করেননি, তাই ভোট দেয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।’

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি