দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় অপেক্ষার পর আজ বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কারের গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। জুলাই ’২৪-এর ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। তবে এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ বিগত যে কোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা স্পষ্ট করেই বলছেন, এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে বড় নিয়ামক হবে ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্ম। দেশের মোট ভোটারের বিশাল একটি অংশ এই তরুণরা, যারা এবার প্রথমবারের মতো নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে ব্যালটের মাধ্যমে আগামীর বাংলাদেশ গড়ার রায় দেবেন।
তরুণ ভোটারের সংখ্যা ৪ কোটি ৩৩ লাখ ৪৬ হাজার ৪২১ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৩৫ শতাংশ
সাইলেন্ট বা নীরব ভোট টানতে দলগুলো নানা কৌশল গ্রহণ করছে
আওয়ামী লীগের ভোটও এবারের নির্বাচনের অন্যতম নিয়ামক হতে পারে
বিভিন্ন বিভাগের মোট ২৯০৬টি কেন্দ্রকে সংঘাতের সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি ছিল তরুণ সমাজ। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে মোট ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা ৪ কোটি ৩৩ লাখ ৪৬ হাজার ৪২১ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৩৫ শতাংশ। জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী ১৮-৩৫ বছর বয়সীরা তরুণ হিসেবে বিবেচিত হন। বিশ্লেষকদের মতে, গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) সাজানো ও পাতানো নির্বাচনের কারণে দেশের তরুণদের একটি বড় অংশ ভোট দেয়ার সুযোগ পাননি। ভোটাধিকার হরণের সেই ক্ষোভ আর নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এবার ভোটকেন্দ্রে তাদের উপস্থিতি হবে ব্যাপক।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘তরুণ ভোটাররা এবার নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে। তারা পুরনো রাজনীতিকে বিশ্বাস করে না। সুতরাং তাদের ভোট কোথায় যাবে, তার ওপর নির্ভর করবে নির্বাচনে জয়-পরাজয়।’
তরুণদের চাওয়া খুবই স্পষ্ট। তারা নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজিসহ সব অনিয়মের অবসান চান। পুরনো ধারার হিংসা-হানাহানির রাজনীতি তারা আর দেখতে চান না। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাশ করা শিক্ষার্থী নূর-ই-মায়শার কথায়, ‘নারীর নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে সমান অধিকার ও হয়রানি বন্ধে যে দল কার্যকর ভূমিকা নেবে, আমি তাদেরই বেছে নেব।’ অন্যদিকে সদ্য গ্র্যাজুয়েট তামজিদুল ইসলাম অঙ্কন গুরুত্ব দিচ্ছেন কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তাদের হয়রানি বন্ধের ওপর।
কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) ও বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজের সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, নতুন ভোটারদের মধ্যে ৩৭.৪ শতাংশের সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর প্রতি। বিএনপিকে সমর্থন করেন ২৭ শতাংশ এবং জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া তরুণদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতি সমর্থন আছে ১৭ শতাংশ তরুণের। তবে ১৮.৬ শতাংশ তরুণ ভোটার এখনও সিদ্ধান্ত নেননি, যা নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে।
১৯৯৬ সালের পর এই প্রথম আওয়ামী লীগবিহীন (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকলেও তাদের বিশাল কর্মী-সমর্থক গোষ্ঠীর ভোট এবারের নির্বাচনে ‘ডিসাইডিং ফ্যাক্টর’ (অন্যতম নিয়ামক) হতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগ ভোট বর্জনের ডাক দিলেও দলটির তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের একটি বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে যাবেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ১০ শতাংশ সমর্থক ভোট দিতে যেতে পারেন। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যাবেন নিরাপত্তাজনিত কারণে। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা যাবেন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য।’
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেছেন, আওয়ামী লীগের নিরপরাধ কর্মীদের পাশে থাকবে বিএনপি। গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরও একই সুরে কথা বলেছেন। মূলত এই ‘সাইলেন্ট ভোট’ বা নীরব ভোটগুলো টানতেই দলগুলো এমন কৌশল নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
উৎসবমুখর পরিবেশের পাশাপাশি ভোটের নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে শঙ্কাও কম নয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এবারের ব্যালটে সবচেয়ে বড় হুমকি হতে পারে ‘বুলেট’। ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই এবং সহিংসতার আশঙ্কায় গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে ১৩টি আসনকে ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো- ঢাকা-৮, ১৫, ৭, পাবনা-১ ও ৩, খুলনা-৫, পটুয়াখালী-৩, বরিশাল-৫, টাঙ্গাইল-৪, শেরপুর-৩, কুমিল্লা-৪, নোয়াখালী-৬ এবং চট্টগ্রাম-১৫। এছাড়া ঢাকা বিভাগের ২২টি, ময়মনসিংহের ৮টি, চট্টগ্রামের ১৬টিসহ বিভিন্ন বিভাগের মোট ২৯০৬টি কেন্দ্রকে সংঘাতের সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকার ভোটকেন্দ্রগুলোতে বাড়তি সতর্কতা জারি করা হয়েছে, কারণ দলটির নেতাকর্মীরা ভোট বানচালের চেষ্টা করতে পারে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। এছাড়াও ঢাকা-১৪, ১৬ ও ১৮ আসনের প্রায় ১৮ শতাংশ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, যার মধ্যে ঢাকা-১৪ ও ১৬ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছে সেনাবাহিনী। তবে সারাদেশের মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২১ হাজার ৫০৬টি কেন্দ্রকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে নামানো হয়েছে প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। এর মধ্যে ১ লাখ সেনা সদস্য, ১ লাখ ৮৭ হাজার পুলিশ এবং ৫ লাখ ৭৬ হাজার আনসার সদস্য রয়েছেন। আকাশপথে নজরদারির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে সহস্রাধিক ড্রোন। ৯০ ভাগ ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে দায়িত্বরতদের শরীরে থাকবে বডিওর্ন ক্যামেরা।
আইজিপি বাহারুল আলম ও ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী আশ্বস্ত করেছেন, কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। সোয়াত, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও ডগ স্কোয়াডকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য।
এবারের নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের এক অনন্য সুযোগ। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে ‘জুলাই চার্টার’ বা রাষ্ট্র সংস্কারসংক্রান্ত সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ভোটারদের হাতে তুলে দেয়া হবে দুটি ব্যালট পেপার, একটি সরকার নির্বাচনের জন্য, অন্যটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণের জন্য। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বলেছেন, ‘আমরা সবাই মিলে একটি নতুন সরকার নির্বাচন করবো এবং একই সঙ্গে একটি গণভোটের মাধ্যমে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ করবো।’
নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, ভোটের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ২৯৯টি আসনে ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে ভোটগ্রহণ স্থগিত রয়েছে।
ফলাফল প্রকাশ প্রসঙ্গে ইসি সচিব বলেন, ‘সত্য যত কঠিনই হোক, সত্যই বলা হবে।’ তিনি জানান, পোস্টাল ব্যালট গণনা ও যাচাই-বাছাইয়ের কারণে ফলাফল প্রকাশে কিছুটা সময় লাগতে পারে। আগামীকাল সকাল ১০টা থেকে রিটার্নিং অফিসারের দপ্তরে পোস্টাল ব্যালটসহ চূড়ান্ত ফলাফল সংকলন শুরু হবে। তবে অযথা ফলাফল দীর্ঘায়িত হবে না বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন। স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুল বলেছেন, ‘সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, ত্রুটিমুক্ত সবার গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন হতেই হবে। এটা এখন আর কারও পছন্দের পর্যায়ে নেই, এটা এখন দেশের জন্য আবশ্যিক।’
নগর-মহানগর: ফাঁকা ঢাকা, নেই চিরচেনা যানজট-কর্মচঞ্চলতা