image

অতীতের ডজন নির্বাচনের সাতকাহন

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার ইতিহাস। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের দ্বাদশ নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটি ভোটই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্দোলন–সংগ্রাম এবং ক্ষমতার পালাবদলের সাক্ষী।

১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম সংসদ নির্বাচনে ১৪টি দল অংশ নেয়। আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টিতে জয় পায়। ভোটের হার ছিল ৫৫ শতাংশের কিছু বেশি। এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গণতান্ত্রিক পরীক্ষা।

১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপির নেতৃত্বে। ২৯টি দল অংশ নেয় এবং বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। ভোটের হার ছিল প্রায় ৫১ শতাংশ।

১৯৮৬ সালের তৃতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় পার্টির অধীনে। বিএনপি ভোট বর্জন করে। জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসনে জয়ী হয়। ১৯৮৮ সালের চতুর্থ নির্বাচনেও বিএনপি ও আওয়ামী লীগ বর্জন করে; জাতীয় পার্টি আবারও ক্ষমতায় আসে। তবে ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনে এরশাদের পতন ঘটে।

১৯৯১ সালের পঞ্চম নির্বাচন ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ৭৫টি দল অংশ নেয়। বিএনপি ১৪০ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে আসে দেশ।

১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ষষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের কারণে ভোটের হার নেমে আসে ২৬ শতাংশে। সংসদের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১২ দিন। একই বছরের জুনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম নির্বাচন হয়, যেখানে ৮৮টি দল অংশ নেয় এবং আওয়ামী লীগ ১৪৬ আসন পেয়ে ক্ষমতায় আসে।

২০০১ সালের অষ্টম নির্বাচনে ৫৪টি দল অংশ নেয়। বিএনপি ১৯৩ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। ভোটের হার ছিল ৭৫ শতাংশের বেশি।

২০০৮ সালের নবম নির্বাচন সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল নিবন্ধন পদ্ধতি চালুর পর প্রথম নির্বাচন। ভোটের হার ছিল ৮৭ শতাংশের বেশি—যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আওয়ামী লীগ ২৩০ আসন পেয়ে বিপুল বিজয় অর্জন করে।

২০১৪ সালের দশম নির্বাচন বিএনপিসহ বড় দলগুলোর বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। ১৫৩টি আসনে প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ভোটের হার ছিল ৪০ শতাংশের কিছু বেশি।

২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচন অংশগ্রহণের দিক থেকে বড় হলেও নানা বিতর্কে আলোচিত হয়। আওয়ামী লীগ ২৫৮ আসন পায়। ভোটের হার ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ।

২০২৪ সালের দ্বাদশ নির্বাচনও প্রধান বিরোধী দলের বর্জনের মধ্য দিয়ে হয়। আওয়ামী লীগ ২২২ আসনে জয়ী হয়। ভোটের হার ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ। সংসদের মেয়াদ ছিল ছয় মাস সাত দিন। ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ওই বছরের ৫ আগস্ট সংসদ বিলুপ্ত হয় এবং অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।

এই দীর্ঘ পথচলায় বাংলাদেশের নির্বাচন কখনও উচ্চ ভোটার উপস্থিতি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রশংসিত হয়েছে, কখনও বর্জন ও বিতর্কে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অংশগ্রহণের পরিসংখ্যান, ভোটের হার, জোট রাজনীতি ও ক্ষমতার পালাবদল, সব মিলিয়ে জাতীয় নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের আয়না।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই ধারাবাহিকতারই নতুন অধ্যায়। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রতিটি নির্বাচন কেবল প্রতিনিধি নির্বাচন নয়, এটি সময়ের রাজনৈতিক চরিত্র নির্ধারণেরও একটি মুহূর্ত।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি