নিরঙ্কুশ জয়ে সরকারে বিএনপি, ‘আশাহত’ জামায়াত বিরোধীদলে

ফয়েজ আহমেদ তুষার

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি সরকার গঠনের জন্য নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া বেসরকারি ফল অনুযায়ী দলটি সংসদের দুই তৃতীয়াংশের বেশী আসনে জয় পেয়েছে। এ নির্বাচনে ২৯৭ আসনের ফলাফল অনুযায়ি বিএনপি ও তার মিত্ররা পেয়েছে ২১২ আসন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য পেয়েছে ৭৭ আসন।

বিএনপি একক দল হিসেবে পেয়েছে ২০৯টি আসন। তাদের মিত্রদের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় পাটি-বিজেপি ১টি, গণসংহতি আন্দোলন ১টি এবং গণঅধিকার পরিষদ ১টি আসন পেয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী একক দল হিসেবে পেয়েছে ৬৮টি আসন। তাদের মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি এবং খেলাফত মজলিস ১টি আসন পেয়েছে।

জামায়াত জোট ছেড়ে আসা চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পেয়েছে ১টি আসন। দলীয় প্রধান নিজের আসনে পরাজিত হয়েছেন। তবে বরগুনা-১ আসনে তার দলের প্রার্থী মো. ওলি উল্লাহ বিএনপি প্রার্থীকে ৪১৪৬ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে জয়লাভ করেছেন।

এবারের নির্বাচনে ৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। তারা সবাই বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী হিসেবে ভোটে অংশ নিয়েছিলেন। বিদ্রোহী হওয়ার কারণে এদের সবাইকে দল থেকে বহিস্কার করেছে বিএনপি।

নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। এদিকে ভোটের আগে জামায়াত নেতারা সরকার গঠনের প্রত্যাশার কথা বললেও এই প্রথম সংসদের প্রধান বিরোধী দল হতে যাচ্ছে দলটি।

জামায়াতের অতীত নির্বাচনী ইতিহাস পাশে রেখে দেখলে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৯১ সালে তারা ১৮টি আসন পেয়েছিল, ১৯৯৬ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে তিনে। ২০০১ সালে বিএনপি জোটের অংশ হিসেবে ১৭টি, আর ২০০৮ সালে মাত্র দুটি আসন নিয়ে তারা সংসদে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় তাদের রাজনৈতিক কর্মকা- আদালতের রায়, দমন-পীড়ন এবং সংগঠনগত সংকটের কারণে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়। সেই প্রেক্ষাপটে এ নির্বাচন তাদের জন্য নিঃসন্দেহে পুনরাগমনের নির্বাচন। আসনের সংখ্যা আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়েছে।

দলটি এবার উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণ পশ্চিমবঙ্গে বেশী আসন পেয়েছে। নীলফামরি জেলার চারটি আসন, সবগুলোতে জামায়াত জয়লাভ করেছে। যশোরের ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জয় পেয়েছে দলটি। রাজধানী ঢাকায় ২০টি আাসনের মধ্যে জামায়াত ৬টি আসন পেয়েছে।

চট্টগ্রাম ও রাজশাহী জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। এবারও চট্টগ্রামে বড় জয়ের আশা করেছিল জামায়াত। তবে এই জেলায় ১৬ টি আসনের মধ্যে দলটি ২টি আসনে জয় পেয়েছে। রাজশাহীতে ৪টি আসনের মধ্যে দলটি জয় পেয়েছে দুটিতে।

এছাড়া, মেহেরপুরে ২টি, কুষ্টিয়ায় ৩টি, চুয়াডাঙ্গায় ২টি, ঝিনাইদহে ২টি, খুলনাইয় ৩টি আসন পেয়েছে দলটি। সিলেটে একটি আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী জিতলেও জামায়াত কোন আসন পায়নি।

জামায়াতের আলোচিত প্রার্থীদের মধ্যে সেক্রেটারি গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫ আসনে ও সহকারি সেক্রেটারি হামিদুর রহমান আজাদ কক্সবাজার-২ আসনে, ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি শিশির মনির সুনামগঞ্জ-২ আসনে পরাজিত হয়েছেন।

নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫০টি দল এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। এরমধ্যে ৪১টি দল কোন আসনে জয়লাভ করতে পারেনি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।

দেশের তিনশ’টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে বৃহস্পতিবার সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ভোট অনুষ্ঠিত হয়। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত একটানা চলে ভোটগ্রহণ। বিচ্ছিন্ন কিছু সংঘাতের ঘটনা ছড়া সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনিত প্রার্থী মারা যাওয়ায় সেখানে নির্বাচন স্থগিত করা হয়। ওই আসনে পরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

শুক্রবার ২৯৭ আসনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ এই দুটি আসনে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া ফল ঘোষণা স্থগিত রেখেছে কমিশন। ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে ফলাফল ঘোষণার সমাপনী বক্তব্যে ইসি সচিব আখতার আহমেদ এসব তথ্য জানান।

ইসির তথ্য অনুযায়ি, এই নির্বাচনে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ঢাকা ও বগুড়ার দুটি আসন থেকে জয়লাভ করেছেন। ফলে বিএনপির আগের ঘোষণা অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসেবে তারেক রহমানই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। নির্বাচনে বিজয়ের জন্য তিনি ইতোমধ্যেই ভারত ও পাাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের নেতাদের কাছ থেকে অভিনন্দন পেতে শুরু করেছেন। দীর্ঘ সতের বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর তিনি গত ২৫শে ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরেছিলেন এবং ৩০শে ডিসেম্বর তার মা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কয়েকদিন পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন।

এখন তার নেতৃত্বেই নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসনে বিএনপির জয় নিশ্চিত হলো এবং এর ফলে ২০০৬ সালের অক্টোবরে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার প্রায় দুই দশক পর দলটি আবার ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে।

এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারে ছিল । সেই সরকারের অন্যতম অংশীদার এবং দলটির দীর্ঘদিনের মিত্র রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর সাথেই এবার নির্বাচনী লড়াই হয়েছে বিএনপির।

নিয়মানুযায়ী ইসি সংসদ সদস্যদের নামে গেজেট প্রকাশের পর তাদের শপথ ও পরবর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

বিএনপি এবার নির্বাচনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও এই নির্বাচনে ছিল না দলটির দীর্ঘকালের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ। শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যূত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দলীয় প্রধান ও সাবেক প্রধানমনন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দলের অনেক নেতা ভারতে অবস্থান করছেন। আর দলটির যেসব নেতা দেশে ছিলেন, তাদের প্রায় সবাইকেই গ্রেফতার করে কারাগারে রেখেছে অন্তর্বর্তী সরকার। দলটির কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করেছে সরকার । ফলে এই নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারেনি।

এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে বিএনপির লড়াই হয়েছে পুরনো মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সাথে। যদিও দলটি বিএনপির সাথে এ নির্বাচনী লড়াইয়ে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। তবে নির্বাচনে তাদের আসন সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে।

নির্বাচনে তারেক রহমান ছাড়াও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির জেষ্ঠ্য নেতাদের যারা নির্বাচন করেছিলেন তারা প্রায় সবাই ভোটে জয়লাভ করেছেন।

বিএনপি এই নির্বাচনে ২৯২ টি আসনে এককভাবে প্রার্থী দিয়েছিলো এবং সমমনা দলগুলোকে বাকী আটটি আসন ছেড়ে দিয়েছিল। তবে দলটির কুমিল্লা-৪ আসনের প্রার্থী মনজুরুল আহসান মুন্সী প্রার্থিতা বাতিল হয়েছিল ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী বিএনপির সমমনা দলগুলোর মধ্যে আন্দালিভ রহমান পার্থ, জোনায়েদ সাকি এবং নুরুল হক বিজয়ী হয়েছেন।

অন্যদিকে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামী জোট ৭৭ আসনে জিতলেও দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এই নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন।

তবে জামায়াত জোটে থাকা এনসিপির নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, হাসনাত আবদুল্লাহ, আবদুল হান্নান মাসউদ, আবদুল্লাহ আল আমিন ও আতিকুর রহমান মোজাহিদ এই নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন।

ওদিকে বিএনপিরই বিদ্রোহী নেতাদের মধ্যে রুমিন ফারহানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, এজেডএম রেজওয়ানুল হক দিনাজপুর-৫, আতিকুল আলম শাওন কুমিল্লা-৭, সালমান ওমর রুবেল ময়মনসিংহ-১ আসনে, লুৎফর রহমান খান আজাদ টাঙ্গাইল-৩ আসনে, মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান চাঁদপুর-৪ আসনে এবং শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেছেন।

*জাতীয় পার্টির ভরাডুবি*

আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের মিত্র জাতীয় পার্টি (জাপা) এই নির্বাচনে অংশ নিলেও দলটির ভরাডুবি হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর এই প্রথম এইচ এম এরশাদের প্রতিষ্ঠিত এই দলের কোনো প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি। এমনকি দলটির কোনো প্রার্থী এবার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেননি। এর মধ্যে দলটির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুরেও বিপর্যস্ত হয়েছে দলটি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাপা ২০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এর মধ্যে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের রংপুর-৩ (সিটি করপোরেশন ও সদর) আসনের ভোটে তৃতীয় হয়েছেন। জাপার মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীও গাইবান্ধ-১ আসনে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন।

*অংশ নেয়নি নিবন্ধিত ৯ দল*

ইসির নিবন্ধন থাকলেও এবার নির্বাচনে অংশ নেয়নি ৯টি দল। দলগুলো হলো- জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এম এল), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম)।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

» আইনি ভিত্তি পেলে ভোট পুনর্গণনার আবেদন করবো: গোলাম পরওয়ার

» ৬৮.০৫ শতাংশ গণভোটে ‘হ্যাঁ, আসবে কী কী বদল

» গোপালগঞ্জে ‘না’ ভোট জয়ী

» ‘তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শক্তিশালী হবে’

» আমন্ত্রণ পেলেও নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠায়নি ভারত: জয়সওয়াল

» গণভোট: ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ৬৮ শতাংশের বেশি ভোটার

» ব্যাপক বিজয়ের পর তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানালো বিভিন্ন দেশ

সম্প্রতি