ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে ২৯৯টি আসনের মধ্যে বেসরকারি ফলাফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় পেয়েছে দলটির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থীরা। এই নির্বাচনে ৮৫ নারী প্রার্থীর মধ্যে এবার জয় পেয়েছেন ৭ জন নারী। তবে নির্বাচনে জনগণের মধ্যে আলোচনায় থেকেও ভোটযুদ্ধে হেরে গেছেন বেশ কয়েকজন নারী প্রার্থী।
বিজয়ীর মধ্যে বিএনপি থেকে ছয় নারী প্রার্থী বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে যাচ্ছেন। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর আংশিক) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা (হাঁস প্রতীক) বড় ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি জোটের প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবের চেয়ে ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোট বেশি পেয়েছেন। ১৫১ কেন্দ্রে হাঁস প্রতীক পেয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৯৫ ভোট। তার নিকটবর্তী প্রতিদ্বন্দ্বী জুনায়েদ আল হাবিব পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৯২৭ ভোট।
মানিকগঞ্জ-৩ (সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ পৌর ও জেলা সদরের ৮ ইউনিয়ন) আসনে বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খানম ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৫ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ সাইদ নূর (রিকশা) পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২৪২ ভোট। ঝালকাঠি-২ (ঝালকাঠি সদর-নলছিটি) আসনের ১৪৭ কেন্দ্রে পোস্টাল ভোটসহ বিএনপি জোটের প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী এস এম নেয়ামুল করিম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৮০৫ ভোট। সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) আসনে ৭৯ হাজার ৩২১ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন ‘গুম’ হওয়া বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর (লুনা)। ধানের শীষের প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় ঐক্য জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ মুনতাছির আলী পেয়েছেন ৩৮ হাজার ৬৩৫ ভোট। সিলেট জেলার ছয়টি আসনের ৩৩ প্রার্থীর মধ্যে তাহসিনা রুশদীর একমাত্র নারী। নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল ১ লাখ ২ হাজার ১৯৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী আবুল কালাম পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৪৩১ ভোট। ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা-সালথা) আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ২০ হাজার ৯০৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ১১ দলীয় জোটের আল্লামা শাহ্ আকরাম আলী পেয়েছেন ৮৭ হাজার ৯৫৬ ভোট। শামা ওবায়েদের বাবা ছিলেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী কে এম ওবায়দুর রহমান। আর ফরিদপুর-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নায়াব ইউসুফ আহমেদ ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। এই আসনে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মো. আবদুত তাওয়াব পেয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ১১৫ ভোট।
এবারের ভোটযুদ্ধে ৮৫ নারী প্রার্থীদের মধ্যে আরও বেশ কয়েকজন নারী তাদের জয়ের ব্যাপারে আলোচনায় ছিলেন। তবে ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এসবব নারী প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত বিজয়ের হাসি হাসতে না পারলেও পারলেও নির্বাচনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। বিজয়ী প্রতিদ্বন্দী প্রার্থীদের জয় নিশ্চিতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। এমনই একজন ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলি। তিনি আওয়ামী লীগ আমলে জোরপূর্বক ‘গুমের’ শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাকের’ সমন্বয়ক। এই আসনে ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আরমান ১৫ হাজার ৮৫৭ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সানজিদা ইসলাম তুলি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৮০ হাজার ৯২৭ ভোট। যদিও ঢাকা-১৪ আসনে নির্বাচনে ‘দুর্নীতিমূলক কার্যকলাপ, আচরণ বিধি লঙ্ঘন এবং ফলাফল প্রকাশে অনিয়মের’ অভিযোগ এনে ফলাফল স্থগিত এবং পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন বিএনপি মনোনীত তুলি। শুক্রবার, (১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) নির্বাচন কমিশনে (ইসি) এ সংক্রান্ত একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন তিনি।
এর মধ্যে ঢাকা-৯ আসনে জনগণের মধ্যে আলোচনায় থাকার পরও পরাজিত হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করা স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রশিদ ধানের শীষ প্রতীকে তিনি মোট ১ লাখ ১১ হাজার ২১২ ভোট পেয়ে জয়ী হলেও জারা আছেন তৃতীয় অবস্থানে। এই আসনে আলোচিত এ স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী ফুটবল প্রতীকে পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৬৮৪ ভোট।
ঢাকার বাইরে দক্ষিণাঞ্চলের জেলা বরিশাল-৫ (মহানগরী ও সদর) আসেন নির্বাচনী যুদ্ধে আলোচনায় ছিলেন গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) নেত্রী ডাক্তার মনীষা চক্রবর্ত্তী। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি শক্ত প্রতিদ্বন্দিতা গড়তে পারেননি। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। মনীষা চক্রবর্তী ২২ হাজার ৪৮৬ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছেন। তবে নির্বাচনকালীন সময়ে নারী প্রার্থী উপস্থিত থাকায় মিডিয়ার টকশোতে কথা বলতে না চাওয়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীম ৯৫ হাজার ৪৪ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন।
এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ১৭। ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিনের পর নির্বাচন কমিশন যে তালিকা দিয়েছে, সেই তালিকা অনুসারে, নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৪। অর্থাৎ মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৪ শতাংশ। দলের হয়ে প্রার্থী হয়েছেন ৬৬ জন নারী। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন ১৯ জন। এর বাইরে ১ জন প্রার্থী হিজড়া জনগোষ্ঠীর। নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেয়া নারী প্রার্থীদের হলফনামা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, নারী প্রার্থীদের ৬৪ জনই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, অর্থাৎ ৭৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। ২৫-৩৯ বছর বয়সী প্রার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৩২। পেশাগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৬৭ শতাংশ নারী কর্মজীবী।