ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর এখন সরকার গঠনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। দলের ঘোষণা অনুযায়ী, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। স্বচ্ছ ভাবমূর্তি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকাকে প্রাধান্য দিয়ে একটি ছোট কিন্তু কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক মন্ত্রিসভা গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন প্রথম মন্ত্রিসভার আকার ক্ষমতাচ্যুত বিগত সরকারের তুলনায় অনেকটাই ছোট হতে যাচ্ছে। বর্তমান কাঠামোর ৪৩টি মন্ত্রণালয় কমিয়ে ৩০-এর নিচে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে বিএনপি। একই ধরনের কাজ করে এমন মন্ত্রণালয়গুলোকে এক ছাতার নিচে আনার কথা ভাবা হচ্ছে। এর ফলে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কাজের গতি বাড়বে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।
নতুন সরকারের মূল অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং দুর্নীতি নির্মূল করা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, নির্বাচনী ইশতেহার, ‘৩১ দফা’ এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অনুযায়ী রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার ও সংবিধানের কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আনা হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হতে যাচ্ছে নবীন ও প্রবীণের সমন্বয়ে। অভিজ্ঞ প্রবীণ নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হতে পারে, যারা অতীতে সফলভাবে মন্ত্রণালয় চালিয়েছেন। অন্যদিকে মেধাবী তরুণ নেতাদের উপমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রবীন ও তারুণ্যের সমন্বয়ে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় ২০-২২ জন সদস্য থাকতে পারেন, যার মধ্যে দুই ডজনের মতো পূর্ণমন্ত্রী এবং এক ডজনের মতো প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএনপি নেতাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ছাত্রদলের সাবেক শীর্ষ নেতাদের মধ্যে যারা এবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের অনেককেই মন্ত্রিসভায় দেখা যেতে পারে। এছাড়া নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভায় কারা ডাক পাচ্ছেন তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে ব্যাপক জল্পনা। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তারেক রহমানের হাতেই থাকতে পারে। এছাড়া দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আব্দুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ ও হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের জন্য আলোচনায় রয়েছে।
দপ্তর বন্টন নিয়ে সম্ভাব্য আলোচনায় শোনা যাচ্ছে রাষ্ট্রপতি অথবা পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি অথবা বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেখা যেতে পারে মির্জা আব্বাসকে।
এছাড়া প্রবীন ও অভিজ্ঞদের মধ্যে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, সালাহউদ্দিন আহমদ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, আলতাফ হোসেন চৌধুরীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেখা যেতে পারে। তরুণ ও নারী নেতাদের মধ্যে শামা ওবায়েদ (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা), শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি (প্রবাসী কল্যাণ) এবং তাবিথ আউয়াল বা ইশরাক হোসেনের নামও আলোচনায় আছে।
দলীয় নেতাদের বাইরে মিত্র দলগুলোর নেতাদেরও মন্ত্রিসভায় রাখা হচ্ছে। আন্দালিব রহমান পার্থ (রেলপথ), জোনায়েদ সাকি (ভূমি) এবং নুরুল হক নুরের (নৌ-পরিবহন) নাম মন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া ববি হাজ্জাজ এবং টেকনোক্র্যাট কোটায় ২-৩ জন বিশেষজ্ঞ বা অনির্বাচিত নেতাকে (যেমন: নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভী, মাহদী আমিন) মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নির্বাচিতদের বাইরে থেকে দক্ষ কাউকে দায়িত্ব দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আগামীকাল ১৭ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। একই দিন বিকেলে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হবে, যা পড়াবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।