রাষ্ট্রীয় শুদ্ধতায় অগ্রাধিকার
নির্বাচন শেষ, সরকার গঠনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত। রাজনৈতিক উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও কিছু বিচ্ছিন্ন গণ্ডগোলের মধ্যেও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। এমন মূল্যায়ন করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এখন আসল পরীক্ষা শুরু। নতুন সরকার কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম দিকের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সেটাই আসল চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দলীয় ইশতেহার বাস্তবায়নের আগে কিছু নির্দলীয় ও জাতীয় জরুরি কাজকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এগুলো দলীয় প্রতিশ্রুতির বিরোধী নয়; বরং পরিপূরক। যার মধ্যেই রয়েছে রাষ্ট্রীয় শুদ্ধতার ভিত্তি। এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আর শিক্ষাঙ্গনে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
বিশ্লেষকদের মতে, আস্থা ফেরানোর প্রথম সিগন্যাল হচ্ছে, নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করা। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের প্রকাশ। সরকার যদি স্পষ্ট করে জানায় যে তাদের মেয়াদ পাঁচ বছর। নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা হবে না, তাহলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে যাবে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, যে সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তারা নিজেদের কর্তৃত্ব হারায়। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নানা ঘটনায় সরকারকে অসহায় দেখিয়েছে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বা সংগঠিত ‘মব’ আচরণ। চুরি, ধর্মীয় আবেগ, ব্যক্তিগত জীবনযাপন কিংবা রাজনৈতিক বিরোধ- কোনো অজুহাতেই আইন হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ‘মবসন্ত্রাস’ মোকাবিলায় সরকারের লিখিত নীতি থাকতে হবে।
একই সঙ্গে পেশাদার ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। শুরুতেই কঠোর অবস্থান নিতে হবে। যেন ‘মবসংস্কৃতি মহীরুহে পরিণত হতে না পারে।আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য জাতীয় পর্যায়ে প্রচারাভিযান চালাতে হবে। যাতে নাগরিকেরা অন্যের অধিকারের প্রতি সংবেদনশীল ও সহনশীল হয়ে ওঠেন।
প্রশাসন ও পেশাজীবীদের বিরাজনৈতিকীকরণ একটা বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের প্রায় সব স্তরের পেশাজীবী- শিক্ষক, আমলা, চিকিৎসক, শিল্পীদের রাজনৈতিক পরিচয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ার প্রবণতা ঠেকাতে হবে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধায় পক্ষপাতের কারণে অযোগ্য ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেন। এমন প্রবণতার ছিদ্রগুলো সিল করে দিতে হবে।
জনগণের করের অর্থে পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অস্থিরতার বড় ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। নেতৃত্ব সংকট, দলীয় প্রভাব আর রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিবেশ শিক্ষামুখী ও স্বাভাবিক করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্দলীয় শিক্ষাবিদদের হাতে তুলে দিতে হবে। জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার জায়গায় তালা, দখল বা দলীয় নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি যেকোনো মূল্যে পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে স্থিতিশীলতা ফিরলে সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের ফলাফল প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত করার তাগিদ দিচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় কাঠামো, যেমন অযথা উচ্চ পরিষদ গঠন, বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে। দলনিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হবে। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
‘দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনে রাষ্ট্রের নানা স্তরে জঞ্জাল জমেছে। নতুন সরকারকে সবার আগে এসব জঞ্জাল পরিষ্কারে নামতে হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তবেই দ্রুত জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব হবে।