মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
ঢাকার ক্যাম্পাস রাজনীতিতে বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতারা দীর্ঘদিন ধরেই নৈতিক অবস্থান, প্রতিবাদী কণ্ঠ ও বুদ্ধিবৃত্তিক দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তবে গেল এক দশকের বেশি সময়ে একাধিক আত্মহত্যা ও আত্মহত্যাচেষ্টার ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে, সংগ্রামের মুখ হয়ে ওঠা তরুণ নেতারা নিজের লড়াইয়ে কেন একা হয়ে পড়ছেন?
সেই ২০১২ সালের ২৬ জানুয়ারি দিনটির দিকে ফিরে তাকালে দেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হাসান ইকবাল সজিবের এক মর্মান্তিক ঘটনা। সেদিন ট্রেন থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন সজিব। এরপর অনেক বছর কেটে গেছে। ২০২২ সালের ২৯ জুন গলায় ফাস দিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন ঢাকা মহানগর ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাদাত মাহমুদ।
তারপরের ঘটনা গেল বছরের ১০ জুন ঘটেছে। বেসরকারি বিশ্বিবদ্যালয়ের শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সংস্কৃতি সম্পাদক দিয়াত মাহমুদ শাকিল গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।এরপর চলতি বছরের আজ শুক্রবার অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ঠিক আগের দিন ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান ঢাবির শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেঘমল্লার বসু।পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মহানগর শাখার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বে থাকা কয়েকজন ছাত্রনেতার আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া বা চেষ্টা করার ঘটনাগুলো ছড়িয়ে আছে দশকের বেশি সময় জুড়ে। প্রত্যেকটি ঘটনা আলাদা। প্রেক্ষাপট আলাদা। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক বিশ্লেষণে কিছু অভিন্ন চাপের রেখা দৃশ্যমান।
বামপন্থী ছাত্ররাজনীতিতে নেতৃত্ব কেবল সাংগঠনিক পদ নয়; এটি আদর্শিক দায়বদ্ধতা। একজন সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক মানেই, নৈতিকভাবে নির্ভুল থাকার প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত জীবনে সংযমী ও ত্যাগী চিত্র আর সংগঠনের সংকটে সর্বাগ্রে দাঁড়ানো।এই প্রত্যাশা সামাজিকভাবেও পুনরুৎপাদিত হয়। সহপাঠী, অনুসারী, এমনকি বিরোধিরাও নেতাকে ‘প্রতীক’ হিসেবে দেখেন। ফলে ব্যক্তিগত দুর্বলতা প্রকাশের জায়গা সংকুচিত হয়।
মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘রোল ইনগালফমেন্ট’ বা ভূমিকা-গ্রাস। যেখানে ব্যক্তির পরিচয় তার ভূমিকায় সম্পূর্ণ গ্রাস হয়ে যায়। যখন ব্যক্তি নিজেকে ‘মানুষ’ নয়, ‘প্রতীক’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন, তখন ব্যক্তিগত ভাঙন গভীর আঘাত হানে। ছাত্ররাজনীতির চাপ বহুমাত্রিক। যার মধ্যে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনের চাপ, প্রশাসনিক টানাপোড়েন, অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ ও আর্থিক সংকট।এই চাপ তাৎক্ষণিক না হয়ে দীর্ঘস্থায়ী হলে তৈরি হয় ক্রনিক স্ট্রেস সিনড্রোম।
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ মস্তিষ্কে সিদ্ধান্তগ্রহণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দুর্বল করে। ঘুমের ব্যাঘাত, আত্মসমালোচনা, হতাশা- এসব ধীরে ধীরে জমতে থাকে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক সংগঠনে নিয়মিত মানসিক সহায়তা কাঠামো না থাকলে নেতারা প্রায়ই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন।
বামপন্থী ছাত্ররাজনীতি সাধারণত ক্ষমতার সরাসরি সুবিধা দেয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ পেশাগত স্থিতি অনিশ্চিত হয়। একদিকে আদর্শিক লড়াই, অন্যদিকে ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ-এই দ্বৈত টানাপোড়েন মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি করে। মনস্তত্ত্বে একে বলা হয় কগনেটিভ ডিজোনেন্স।যেখানে ব্যক্তি দুই বিপরীত বাস্তবতার মধ্যে আটকে যায়। দীর্ঘস্থায়ী হলে তা হতাশা ও আত্মমূল্যায়নের সংকটে রূপ নেয়।
বামপন্থী সংগঠনের অনেক নেতাই সামাজিক বৈষম্য, অন্যায় ও মানবিক সংকট নিয়ে গভীরভাবে ভাবেন। এই সংবেদনশীলতা তাদের রাজনৈতিক শক্তি। তবে গবেষণা বলছে, উচ্চ সহানুভূতিশীল ব্যক্তিরা দীর্ঘমেয়াদি চাপের মুখে দ্রুত মানসিক ক্লান্তিতে ভোগেন।যাকে বলা হয় কম্পেশন ফ্যাটিগ। যখন অন্যের কষ্টের ভার বহন করতে করতে নিজের আবেগিক শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়।
একাধিক সাবেক ছাত্রনেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংগঠনের ভেতরে ব্যক্তিগত মানসিক সংকট নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রায় নেই। যার পেছনের কারণগুলো হলো, দুর্বলতার ভাবমূর্তি তৈরি হওয়ার ভয়, নেতৃত্ব হারানোর আশঙ্কা আর ‘সংগ্রামী’ ইমেজ নষ্ট হওয়ার আতঙ্ক।ফলে সংকট গোপন থাকে। আর সংকট গোপন থাকলে তা তীব্র হয়।
এসব আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনার পর সাধারণত শোক, স্মরণসভা, আবেগপূর্ণ লেখা হয়। অথচ, কাঠামোগত অনুসন্ধান বা মনস্তাত্ত্বিক অডিট হয় না। যে কারণে সংকটের পূর্বলক্ষণ ছিল কি? সহায়তার সুযোগ ছিল কি? সংগঠন কীভাবে সাড়া দিয়েছিল? প্রশ্নগুলোতে ধুলোর আস্তরণ পড়ে। আর প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুপস্থিত থাকায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও তৈরি হয় না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি কেবল রাজনৈতিক সমস্যা? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা একক কারণের ফল নয়। এতে জড়িত থাকতে পারে, ব্যক্তিগত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, বিষণ্ণতা বা উদ্বেগজনিত ব্যাধি, সম্পর্কগত বা পারিবারিক সংকট, আর্থিক চাপ অথবা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। বলা ভালো যে, রাজনৈতিক পরিচয় কেবল একটি স্তর। কিন্তু যখন সেটিই প্রধান পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন ভাঙনও গভীর হয়।
তাহলে করণীয় কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া সমাধান নেই। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গোপন ও পেশাদার কাউন্সেলিং সেবা দরকার। দ্বিতীয়ত, ছাত্রনেতাদের জন্য নিয়মিত মানসিক সুস্থতা প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তৃতীয়ত, আত্মহত্যা-পরবর্তী স্বাধীন মনস্তাত্ত্বিক পর্যালোচনা জরুরি। চতুর্থত, নেতৃত্বের সংস্কৃতিতে ‘দুর্বলতা স্বীকারের’ জায়গা তৈরি করতে হবে।
শেষে আবারও প্রশ্ন আসে, সাহসের প্রতীকরা কি তবে ভেঙে পড়েন? উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ। কারণ তারাও মানুষ। নেতৃত্বের ভাষণ, মিছিল, আদর্শ- সবকিছুর আড়ালে থাকে এক ব্যক্তিগত মন। যা চাপ, অনিশ্চয়তা ও একাকিত্বে ক্ষতবিক্ষত হতে পারে। তাই, নেতাদের দেবতা নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। তাহলেই হয়তো ভবিষ্যতের কোনো মেধাবী প্রাণের ভেঙে পড়া রোধ করা যাবে।
সবশেষে এটা মনে রাখতেই হবে, আত্মহত্যা একটি জটিল ও চিকিৎসাযোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের ফল হতে পারে। পরিচিত কেউ সংকটে থাকলে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতাল, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।সহানুভূতির হাত প্রসারিত করতে হবে।ব্যক্তিগতভাবে মানুষ ভালো না থাকলে জাতির অবদানে বেশি ভূমিকা রাখতে পারেন না।
অর্থ-বাণিজ্য: বিনিয়োগ বাড়াতে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি এফআইসিসিআই’র