image

‘কামান দাগিয়ে’ মশা নিধন, শেষে আইনি নোটিশ

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

ঘটনাটা গেল বছরের ৩১ অক্টোবরের। রাজধানীতে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে জান্নাতি রেহানা জয়া নামের এক নারী হাসপাতালে মারা যান। একই বছরে মিরপুরের বাসিন্দা আইনজীবী এইচ এম রাশিদুল ইসলাম ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা নিয়ে অবশেষে প্রাণে বেঁচে যান।

শুধু জান্নাতি বা রাশিদুলই নন, দীর্ঘদিন ধরে ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন রাজধানীর হাজার হাজার বাসিন্দা।বহু মানুষ প্রাণও হারাচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গেল বছরে ডেঙ্গুতে সারা দেশে প্রাণ হারিয়েছেন ৪০১ জনের বেশি। আক্রান্তের সংখ্যা ছিল লাখের কাছাকাছি। এর আগে ২০২৪ সালে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন।

গেল বছরের চেয়ে চলতি বছরে মশার দাপট যেমন বেড়েছে, তেমনি মৃত্যুর হারও বিপজ্জনক।বিশেষ করে ঢাকায় মশার উপদ্রব শুধু বেড়েই চলছে না, মারাত্মক আকার নিয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল বলছে, গেল জানুয়ারির তুলনায় চলতি ফেব্রুয়ারিতে মশার সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আর মশার ৯০ শতাংশই কিউলেক্স।মার্চে মশার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা নিধন সিটি করপোরেশনের প্রধান কাজগুলোর একটি। তাই রাজধানীতে মশার উপদ্রব অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে কাজটি ঠিকমতো হচ্ছে না। অতি সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় মশার অস্বাভাবিক ও বিপজ্জনক মাত্রায় বিস্তার লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে এডিস ও কিউলেক্স প্রজাতির মশার আধিক্যের ফলে ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। যা নাগরিকদের জীবন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি হুমকি।

এমন পরিস্থিতিতে অবশেষে মশার উপদ্রব বন্ধ ও উৎসস্থল ধ্বংসের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে স্থানীয় সরকার বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের (এলজিআরডি) সচিব ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

আজ রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) ডাকযোগে নোটিশটি পাঠান ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে যাওয়া ঢাকার জজ কোর্টের আইনজীবী এইচ এম রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ)। নোটিশে বলা হয়েছে, নোটিশ প্রাপ্তির সাত দিনের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২ অনুযায়ী রিট পিটিশন দায়েরসহ প্রয়োজনীয় সব আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

নোটিশে বলা হয়, এডিস ও কিউলেক্স প্রজাতির মশার আধিক্যের ফলে ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। যা নাগরিকদের জীবন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি হুমকি।

আইনজীবী রাশিদুল ইসলাম চিঠিতে উল্লেখ করেন, মশা নিধনের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা ও অবহেলা প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং বিধিবদ্ধ দায়িত্বে চরম গাফিলতি, যা সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্যযোগ্য। অন্যথায় নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২ অনুযায়ী রিট পিটিশন দায়েরসহ প্রয়োজনীয় সব আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রমতে, চলতি অর্থবছরে শুধু মশা নিধন কার্যক্রমের জন্য ৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে ব্যয় করা হয়েছে ৪৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। কেবল মশা নিধনেই গত পাঁচ বছরে প্রায় ১৮৮ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে।

জনগণের করের বিপুল এই অর্থ ব্যয়ের পরও কেন মশা নিয়ন্ত্রণে আসছে না- তা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কার্যকর তদারকি, ওষুধের মান যাচাই ও মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দাবি, কাজ নিয়মিতই হচ্ছে। কিন্তু মশা কেন মরছে না, সেটি নিয়ে তারাও চিন্তিত।

নগরবিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ধোঁয়া বা ফগিং দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ফগিং মূলত পূর্ণবয়স্ক মশা কমাতে কার্যকর হলেও লার্ভা ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নির্মাণাধীন ভবন, ছাদে জমে থাকা পানি, খোলা ড্রেন ও জলাবদ্ধ জায়গাগুলোয় নিয়মিত নজরদারি না থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন।

প্রসঙ্গত, ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ প্রথম দেখা দেয় ২০০০ সালে। সে বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫ হাজার ৫৫১ জন।যাদের মধ্যে মারা যান ৯৩ জন। তখন ঘটনাটি সাধারণ মানুষের কাছে একদম নতুন ছিল। তবে ২০২৩ সালে এসে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত ও মারা যান। সে বছর আক্রান্তের সংখ্যা ছিল তিন লাখের বেশি। প্রাণ হারিয়েছিলেন ১ হাজার ৭০৫ জন।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি