দীর্ঘ ১৩ দিন পর সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরত আসা রিজিয়া বেগম অবশেষে পরিবারের কাছে ফিরলেন। তার তিন সন্তান ফিরে পেল মাকে। মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় তাকে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের কাছে হস্তান্তর করেছিল সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) সদস্যরা। এই ১৩ দিন সেখানেই ছিলেন।
পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সহায়তায় আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে তার নিশ্চিত হওয়া যায় যে রিজিয়ার বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার মামদনগর গ্রামে। তিনি তিন সন্তানের জননী। দীর্ঘদিন যোগাযোগ না থাকায় পরিবারের সদস্যরা ধরেই নিয়েছিলেন রিজিয়া বেঁচে নেই।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) উত্তরায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে রিজিয়াকে তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠোনে সৌদি আরব থেকে ধর্ষণ ও নিপীড়নের শিকার হয়ে ফেরত আসা আরেক নারী রিমা আক্তার (ছদ্মনাম) কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাঁর নিপীড়নের লোমহর্ষক বর্ণণা দেন। নিপীড়িত এমন বিদেশ ফেরত মানুষের সহায়তায় বিমানবন্দরে একটা আনুষ্ঠানিক কাঠামোর প্রস্তাব করেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান।
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এনায়েত হোসেন মান্নান, এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, সহকারী পুলিশ সুপার রাকিবুল হাসান ভুঞা, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের ইনচার্জ শরিফুল ইসলাম এবং সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটির (এভসেক) কর্মকর্তা মাহবুব আলম অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে সৌদি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন রিজিয়া বেগম। এভসেক কর্মকর্তা বিমানবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার মাহবুব আলম অনুষ্ঠানে জানান, ওই সময় তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা অসংলগ্ন ছিল। তিনি নিজের ঠিকানা বা পরিবারের কোনো তথ্য জানাতে পারছিলেন না। তখন সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে তাকে নিরাপদ আশ্রয় ও পরিবারের সন্ধানের উদ্দেশ্যে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে হস্তান্তর করেন। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে দেখাটা ভীষন স্বস্তির।
ব্র্যাক জানিয়েছে, রিজিয়ার কাছে কোনো পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র বা ব্যক্তিগত নথিপত্র পাওয়া যায়নি। ফলে তার পরিবার খুঁজে পেতে নানা প্রচেষ্টা চলছিল। বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার করা হয়। এরপর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) খুলনা অঞ্চলের পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন ব্র্যাকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরবর্তীতে ঢাকায় পিবিআই সদস্যরা রিজিয়ার আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হন যে তার বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার মামদনগর গ্রামে। এরপর ব্র্যাক ওই গ্রামে গিয়ে পরিবারটিকে খুঁজে বের করে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, অপরাধী শনাক্তকরণে পিবিআই কাজ করলেও দেশের বাইরে থেকে আসা ক্ষতিগ্রস্ত নারী কর্মীদের পরিচয় শনাক্তকরণে পিবিআই এই প্রথম কাজ করলো। ভবিষ্যতেও এমন পরিস্থিতিতে পিবিআই ভুক্তভোগীদের পাশে থাকবে এবং যাদের কারণে বিদেশে নারীদের এমন দুর্ভোগে পড়তে হয় সেই পাচারাকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
সৌদি ফেরত রিজিয়ার মেয়ে লিজা আক্তার জানান, ২০১৯ সালে গ্রামের এক দালালের মাধ্যমে ঢাকার এটিবি ওভারসিজ লিমিটেড এজেন্সির সহায়তায় তার মা সৌদি আরবে যান। সেখানে যাওয়ার পর থেকেই তিনি নিয়োগকর্তার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। দালাল ও সংশ্লিষ্টদের কাছে একাধিকবার অভিযোগ জানানো হলেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। বরং ২০২১ সালের পর মায়ের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
২০২৩ সালে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু কোন প্রতিকার পাননি। গত ব্র্যাক সদস্যরা বাড়িতে আসলে জানতে পারেন তাঁর মা ফিরেছেন। কান্নাজড়িত কন্ঠে লিজা বলেন, নির্যাতনে তাঁর মায়ের যে চেহারা হয়েছে যে চিনতেই পারছেন না। আর তার মাও কোন কথা বলছেন না।
অনুষ্ঠানে রিমা আক্তার নামে সৌদি ফেরত আরেক নারী তাঁর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, ছোটবেলায় মা-বাবা হারিয়ে এতিমখানায় বড় হন তিনি। পরবর্তীতে ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন এবং বিয়ে হয়। দুই সন্তানের জন্মের পর স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান। এই দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। সেখানে তাকে চারবার বিক্রি করা হ। শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়। একপর্যায়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। গত ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ফেরেন। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাঁর নিরাপদ আবাসন ও চিকিৎসার জন্য এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ তাকে ব্র্যাকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মানব পাচারের শিকার এই নারী এখন নিজের ও অনাগত সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে আতঙ্কিত।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফেরা রিমা বা রিজিয়ার মতো নারীদের দুর্দশা দেখার কেউ নেই। নিপীড়নের পর বা মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু যাদের কারণে এই দশা তাদের কোনো বিচার হয় না। আবার দেশে ফেরত এলেও বিমানবন্দরে কোনো এসওপি না থাকায় এমন নারীদের নিয়ে কোন দপ্তর কী করবে বুঝে উঠতে পারবে না। সৌদি ফেরত নারীদের এমন অসহায়ত্বের ঘটনাগুলো আমাদের ভীষণ বেদনার্ত করে। এগুলো বন্ধ করতে হবে। আর ফেরত আসা এমন নারীদের সহায়তায় এই রাষ্ট্র সরকার। সবাই মিলে আমাদের একটা কাঠামো গড়ে তুলতেই হবে।
অর্থ-বাণিজ্য: অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল প্রায় ৩৯ লাখ