একটির পর একটি বিস্ফোরণ। দিন বদলাচ্ছে, জায়গা বদলাচ্ছে- কিন্তু বদলাচ্ছে না দুঃসংবাদ। ফেব্রুয়ারির মাত্র চার দিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঁচটি গ্যাস–সম্পর্কিত দুর্ঘটনা যেন আবারও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে- আমরা কি আগুনের ওপর বসে আছি?
টানা চার দিনের ভয়াবহতা
গত ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার হাজারীবাগের রায়েরবাজারে একটি বাসায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের শিশুসহ চারজন দগ্ধ হন। পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের হালিশহরে জমে থাকা গ্যাসে ভয়াবহ বিস্ফোরণে পাঁচজন প্রাণ হারান। আরও চারজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে। মাত্র আট বছরের ফারহান একদিনেই হারায় তার মা–বাবা, চাচা–চাচি ও চাচাতো ভাইকে।
এর পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন। ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই ২৫ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুরের কচুয়ায় গ্যাস লাইন লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে তিনজন দগ্ধ হন। দিন শেষে রাতেই আবার কক্সবাজারে একটি নবনির্মিত গ্যাস স্টেশনে লিকেজ থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন। পুরো এলাকায় জারি করা হয়েছে সতর্কতা। মাত্র চারদিনের ব্যবধানে পাঁচটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা। একই চিত্র- লিকেজ, জমে থাকা গ্যাস, হঠাৎ বিস্ফোরণ, দগ্ধ শরীর, আর ভেঙে যাওয়া পরিবার।
এটা কি নতুন?
না। এর আগেও আমরা দেখেছি পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডি, নারায়ণগঞ্জের মসজিদে গ্যাস বিস্ফোরণ, রাজধানীর একাধিক আবাসিক ভবনে লাইন লিকেজ থেকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। প্রায় প্রতিবারই তদন্ত কমিটি হয়েছে, প্রতিবেদন জমা পড়েছে। কিছুদিন আলোচনা হয়েছে- তারপর আবার নীরবতা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শহর–গ্রাম সব জায়গায় গ্যাস অবকাঠামো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। পুরোনো লাইন, অবৈধ সংযোগ, মানহীন সিলিন্ডার, তদারকির ঘাটতি- সব মিলিয়ে বিপদের মাত্রা বাড়ছে।
কেন বাড়ছে গ্যাস দুর্ঘটনা?
প্রথমত, পুরোনো ও জরাজীর্ণ গ্যাস লাইনের কারণেই ঘটছে এসব ভয়াবহতা। অনেক এলাকায় দশকের পর দশক ধরে একই পাইপলাইন ব্যবহার হচ্ছে। নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় লিকেজ তৈরি হচ্ছে, যা অনেক সময় অদৃশ্যই থেকে যায়।
এরপর রয়েছে অবৈধ সংযোগ ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার। বাসা বা দোকানে অবৈধভাবে লাইন নেওয়া, সস্তা ও নিম্নমানের রাবার পাইপ ব্যবহার- এসব বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। সামান্য ফাঁক বা ঢিলে সংযোগ থেকেই জমে যেতে পারে প্রাণঘাতী গ্যাস।
তাছাড়া খাম খেয়ালি বা সচেতনতার অভাবে বদ্ধ ঘরে গ্যাস জমে থাকছে। যা বড় বিপদ ডেকে আনছে। রাতে চুলা খোলা থেকে যাওয়া বা অল্প লিকেজ হলে বদ্ধ ঘরে গ্যাস জমে থাকে। সকালে লাইট বা সুইচ অন করলেই ঘটে বিস্ফোরণ।
রয়েছে সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনায় শিথিলতাও। এলপিজি সিলিন্ডারের বাজার দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সব সিলিন্ডার কি নিয়মিত পরীক্ষা হয়? ভালভ বা রেগুলেটর ঠিক আছে কি না- সেই তদারকি অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল।
মোটের ওপর রয়েছে সচেতনতার ব্যাপক ঘাটতি। গ্যাসের গন্ধ পেলেও অনেকেই গুরুত্ব দেন না। জানালা না খুলেই চুলা জ্বালানো, ম্যাচ জ্বালানো বা সুইচ অন করা- এসব ভুল থেকেই একের পর এক ঘটে প্রাণঘাতী মর্মান্তিক সব দুর্ঘটনা।
প্রতিকার কীভাবে?
বিরামহীনভাবে ঘটে চলা প্রাণঘাতী এই সংকট কেবল প্রযুক্তিগত নয়, এটি প্রশাসনিক ও সামাজিকও। সমাধানও তাই বহুমাত্রিক হতে হবে।
প্রথমত, নিয়মিত লিকেজ টেস্ট ও অবকাঠামো সংস্কার করতে হবে। গ্যাস কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট সময় পরপর পাইপলাইন পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। পুরোনো লাইন ধাপে ধাপে প্রতিস্থাপন করতে হবে। শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে নয়- প্রোঅ্যাকটিভ তদারকি দরকার।
দ্বিতীয়ত, অবৈধ সংযোগে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। অবৈধ লাইন কেটে দেওয়া আর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ঝুঁকি কমবে না। একই সঙ্গে বৈধ সংযোগ প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।
তৃতীয়ত, এলপিজি সিলিন্ডারের মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।প্রতিটি সিলিন্ডারের মেয়াদ, ভালভ ও রেগুলেটর পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। নকল বা নিম্নমানের সিলিন্ডার বাজারে এলে কঠোর শাস্তি জরুরি।
চূড়ান্ত বিচারে গণসচেতনতা কর্মসূচি পালন করতেই হবে। টিভি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্কুল–কলেজ- সবখানে গ্যাস নিরাপত্তা নিয়ে প্রচার চালানো দরকার। যেমন- গ্যাসের গন্ধ পেলে সঙ্গে সঙ্গে চুলা বন্ধ করা, জানালা–দরজা খুলে দেওয়া, বৈদ্যুতিক সুইচ অন–অফ না করা আর দ্রুত গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে খবর দেওয়া বিষয়ে জনসচেতনা তৈরি করতে হবে। সেই সঙ্গে গ্যাস ডিটেক্টর ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। উন্নত দেশে বাসাবাড়িতে গ্যাস ডিটেক্টর ব্যবহার সাধারণ বিষয়। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে এ প্রযুক্তি জনপ্রিয় করা যেতে পারে, বিশেষ করে বহুতল ভবনে।
আমরা কি শিক্ষা নিচ্ছি?
প্রতিটি বিস্ফোরণের পর কয়েকদিন শোক, ক্ষোভ আর প্রতিশ্রুতি শোনা যায়। কিন্তু ফারহানের মতো একটি শিশুর জীবনভর বয়ে বেড়ানো শূন্যতা আমাদের মনে কতদিন থাকে?গ্যাস দুর্ঘটনা “দুর্ভাগ্য” নয়- অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি অবহেলার ফল। প্রযুক্তিগত ত্রুটি, নজরদারির ঘাটতি আর ব্যক্তিগত অসচেতনতা মিলেই তৈরি করছে আগুনের ফাঁদ।
এখন প্রশ্ন একটাই- আমরা কি আবার পরবর্তী বিস্ফোরণের খবরের জন্য অপেক্ষা করব, নাকি এবার সত্যিই কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে হাঁটব? কারণ প্রতিটি লিকেজ মানে শুধু একটি পাইপের ফাঁক নয়- একটি সম্ভাব্য ট্র্যাজেডির কাউন্টডাউন।
নগর-মহানগর: ৬ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না টিসিবির পণ্য
অপরাধ ও দুর্নীতি: খালাস পেলেন আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া খান আকরাম
সংস্কৃতি: অমর একুশে বইমেলা অবশেষে শুরু আজ
অপরাধ ও দুর্নীতি: এবার সুলতানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সরাতে ‘চিঠি দিয়েছিলেন’ তাজুল
নগর-মহানগর: ঢাকাকে গিলে ফেলেছে বিষাক্ত বায়ু
অপরাধ ও দুর্নীতি: চাঁদাবাজ–কিশোর গ্যাং দমনে রাতভর অভিযান, আটক শতাধিক