মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত
# সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো কৃষকদের কাছে পাওনা প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, যা এই মওকুফের আওতাভুক্ত হবে
সরকারের লক্ষ্য
# কৃষিখাতের মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করা
# ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণের দায় থেকে মুক্ত করা
# সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার (১৯৯১-৯৬) আমলে ৫ হাজার টাকা র্পযন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছিল
শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এ সিদ্ধান্তের ফলে ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা এ মওকুফের আওতাভুক্ত হবে। এতে প্রায় ১২ লাখ কৃষক উপকৃত হবেন। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
ক্ষমতায় গেলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিষয়টি দলের নির্বাচনী ইশতেহারেও ছিল। গত ৭ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে এক নির্বাচনী জনসভায় কৃষকদের জন্য আলাদা পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেছিলেন, “বাংলাদেশের মানুষ ধানের শীষকে নির্বাচিত করলে, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করতে চাই। এনজিও থেকে দুস্থ মানুষ বিভিন্ন সময় যে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণ করেছেন- তা জনগণের পক্ষ থেকে পরিশোধ করতে চাই।”
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পর ১৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভা বৈঠক করেছিলেন তারেক রহমান। তবে সেটি ছিল মূলত প্রাথমিক দিকনির্দেশনামূলক সভা। নতুন কোনো আইন বা নীতিগত সিদ্ধান্ত সেদিন গৃহীত হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নজি কার্যালয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভা বৈঠক করেন তারেক রহমান। সকালে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে অর্থ, বাণিজ্য, স্থানীয় সরকার, আইনসহ সকল মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবরা অংশ নেন। সংক্ষিপ্ত এই বৈঠকে কৃষি ঋণ সংক্রান্ত এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, প্রথা ভেঙে প্রধানমন্ত্রী নিজেই নিজের ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় ফাইল-পত্র বহন করে সম্মেলন কক্ষে প্রবেশ করেন।
বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী দেশের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে মন্ত্রীদের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান। বৈঠক শেষে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সাংবাদিকদের জানান, কৃষি ঋণ বিষয়ক প্রস্তাবনার অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
বৈঠক শেষে সচিবালয় থেকে হেঁটে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি।
বিকেলে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ নেওয়ার পর যত সুদই হোক, সুদ-আসলসহ পুরোটা মওকুফ হবে।
এ বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো দরিদ্র কৃষকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষি খাতের মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করা।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আজ (২৬ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত সুদসহ কৃষকদের কাছে পাওনা আছে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, যা এই মওকুফের আওতাভুক্ত হবে। এই ঋণ মওকুফ করা হলে আনুমানিক ১২ লাখ কৃষক প্রত্যক্ষভাবে লাভবান হবেন। ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা ঋণের দায় থেকে মুক্ত হতে পারবেন, যা তাদের কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি করবে এবং দেশের কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।”
নাসিমুল গনি আরও বলেন, “এখন ঋণের কিস্তি বাবদ যে অর্থ কৃষকের ব্যয় হতো, সেই অর্থ তারা উন্নত মানের বীজ বা আধুনিক সেচ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারবেন। মাথার ওপর ঋণের বোঝা না থাকায় কৃষক পরবর্তী মৌসুমে নতুন উদ্যমে চাষাবাদ শুরু করতে সক্ষম হবেন। এ ছাড়া এই মওকুফ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কৃষকদের ক্রেডিট রেকর্ড বা ঋণমান ভালো হবে। ফলে তারা ব্যাংক থেকে পুনরায় স্বল্প সুদে কৃষিঋণ গ্রহণ করতে পারবেন, যা তাদের স্থানীয় মহাজনী ঋণের উচ্চ সুদের হাত থেকে রক্ষা করবে।”
মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও বলেন, “ঋণের বোঝা কমে যাওয়ায় কৃষকেরা শস্য, মৎস্য ও পশুপালন খাতে আরও উৎসাহিত হবেন। এতে জাতীয় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। ঋণ মওকুফের প্রায় তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে গ্রাম থেকে নগরমুখী অভিবাসন কমবে এবং গ্রামীণ মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাবে।”
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সরকারের ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ মেয়াদে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সুদ-আসল মওকুফ করা হয়েছিল উল্লেখ করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, কৃষকদের কষ্ট লাঘব করে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল।
খেলা: সাঙ্গাকারার সতর্কতা