তেল-মুদ্রা-শেয়ারবাজার
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কাকে বাস্তবে পরিণত করতে এশিয়া-ইউরোপে শুরু হয়ে গেছে যুদ্ধ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালিয়েছে। ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়েছে বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে। ইরানের মিসাইল আছড়ে পড়ছে ইসরাইলে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন, ইরানে বড় সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে, যা ‘প্রি-এম্পটিভ অ্যাটাক’ নামে পরিচিত। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তারা ইরানের সামরিক স্থাপনা ও নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা নিহত হয়েছেন। এ পর্যন্ত ইরানে নিহতের সংখ্যা দুইশতাধিক ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছেন ৭ শতাধিক।
এ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। শনিবার রাতে ইরানের আধা সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সির খবরে এ তথ্য জানানো হয়।
ইরান ওপেকের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। এছাড়া, হলমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ তেল পরিবহন করা হয়। আমেরিকান এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ২০২৪ সালের তথ্য বলছে, এ প্রণালী দিয়ে যাওয়া ৮৪ শতাংশ তেল চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় যায়।
ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম জ্যাকসন বলছেন, সংঘাত নিয়ন্ত্রিত থাকলেও ব্রেন্ট ক্রুড ৮০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। আর যদি সরবরাহ ব্যাহত হয়, তবে তা ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা বিশ্ব মুদ্রাস্ফীতি ০.৬ থেকে ০.৭ শতাংশ বাড়িয়ে দেবে।
ডয়েচে ব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে ব্রেন্ট ক্রুড ১২০ থেকে ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। জ্বালানি তেলের দামের এ উত্থান মানেই পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া। ফলে পণ্যের দাম বাড়বে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে।
যুদ্ধ শুরু হতেই বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে শুরু করেছেন। মার্কিন ডলার, সুইস ফ্রাংক ও জাপানি ইয়েনের চাহিদা বেড়েছে। নরদার্ন ট্রাস্টের বিশ্লেষকরা বলছেন, তেল, ডলার ও সোনায় ‘স্বভাবজাত বিনিয়োগ’ বাড়বে ।
ভারতের অর্থনীতির জন্যও এটি বড়ো ধাক্কা। একদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা টাকা তুলে নিচ্ছেন (এফপিআই আউটফ্লো), অন্যদিকে তেলের দাম বেড়ে চলতি ঘাটতি বাড়াবে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের টাকার মতো উদীয়মান বাজারের মুদ্রাগুলোর ওপর চাপ বাড়বে, কারণ এই অঞ্চলের দেশগুলো জ্বালানি আমদানিকারক।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন হঠাৎ এই যুদ্ধ? গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল। ওমানের মধ্যস্থতায় জেনেভায় বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু শুক্রবার ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করার পরদিনই এই হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।
চায়না একাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের সিনিয়র গবেষক তাং ঝিচাও বলছেন, ‘আলোচনা ছিল পুরোপুরি ধোঁয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার মোতায়েন করেছিল, এটি ছিল পরিকল্পিত। তারা আলোচনায় আর আগ্রহী নয়, লক্ষ্য হচ্ছে ইরানের সরকার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা।’
ক্রিস্টোফার নিউপোর্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সান তাইয়ি অবশ্য একে বলছেন, ‘জোরপূর্বক দরকষাকষি’- অর্থাৎ সীমিত শক্তি প্রয়োগ করে আলোচনার টেবিলে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করা। তবে ইরান এরই মধ্যে পাঁচটি দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। ফলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
এমনিতেই অর্থপাচার ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতায় জর্জরিত দেশের অর্থনীতি নতুন এই ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাবে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় দাঁড়িয়ে। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়, যার সিংহভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বা বন্ধ হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা সবকিছুই স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অর্থ শুধু পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া নয়; এর প্রভাব পড়ে উৎপাদন খরচ থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের দাম পর্যন্ত। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বাংলাদেশ যে মূল্যস্ফীতির আগুনে পুড়েছে, তা এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে ।
শুধু জ্বালানি নয়, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক শিল্পও পড়বে হুমকির মুখে। যুদ্ধের কারণে ইউরোপ ও আমেরিকার মতো প্রধান বাজারে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। ফলে পোশাকের মতো বিলাসবহুল পণ্যে তাদের ব্যয় কমবে, যা সরাসরি বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যই বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতি সেখানে নতুন শ্রমিক নিয়োগে অনাগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিগত সরকারের আমলে ব্যাংক খাত থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে, অর্থনীতির মেরুদণ্ড প্রায় ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এখন ব্যাংকগুলো অনেকটা শূন্য হয়ে পড়েছে। নতুন সরকার মেগা প্রকল্পের বাজেট না দিয়ে অর্থনীতি সচল রাখার চেষ্টা করছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন করে সংকট তৈরি করবে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে ডলার সংকট আরও ঘনীভূত হবে, রিজার্ভে টান পড়বে এবং দেশীয় বাজারে মুদ্রাস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হবে ।
‘ফিন্যান্স ইউন ও বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের বিশ্লেষণ বলছে, এ সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক মন্দা অনিবার্য। আগামী সপ্তাহগুলোতে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমতে পারে, রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়তে পারে। আমরা আশা করছি, কূটনৈতিক উদ্যোগে দ্রুত এই সংকটের সমাধান হবে, কিন্তু বাস্তবতা বলছে, হরমুজ প্রণালী যতদিন অস্থির থাকবে, ততদিন বিশ্ব অর্থনীতিও অস্থির থাকবে।’
সোর্স : সিনহুয়া, সিজিটিএন, আনাদোলু এজেন্সি, ফিন্যান্স ইউন, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন
অর্থ-বাণিজ্য: ইরানে হামলার ধাক্কায় বড় পতন দেশের পুঁজিবাজারে
আন্তর্জাতিক: খামেনির হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভের ডাক জামায়াতের
আন্তর্জাতিক: যুক্তরাষ্ট্রের ২৭টি ঘাঁটিতে হামলা
সংস্কৃতি: একুশে পদকের অর্থ নেবেন না মোহন রায়হান
আন্তর্জাতিক: ইরানে স্কুলে হামলায় শতাধিক মেয়ে শিক্ষার্থী নিহত