হরমুজ প্রণালি বন্ধ
ইরানের হুমকির মুখে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হওয়ার উপক্রম।আর তাতে সরাসরি ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা। পারস্য উপসাগরের সঙ্গে সংযোগকারী এই কৌশলগত নৌপথ দিয়েই গত বছর বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি হয়েছে। প্রণালিটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা।
কেপলার ইনসাইট ও উড ম্যাককেঞ্জির তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রায় ৩৬ লাখ টন এলএনজি আমদানি করেছে। যার প্রধান উৎস ছিল কাতার। গত বছর মোট আমদানির ৫০ শতাংশের বেশি এসেছে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। অর্থাৎ বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহের বড় অংশই নির্ভরশীল হরমুজ প্রণালির ওপর।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান গ্যাস উৎপাদনকারী অঞ্চল। পাইপলাইনের বদলে বিশেষায়িত ট্যাংকার জাহাজে করে এখান থেকে এলএনজি রপ্তানি হয়। ফলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালি কার্যত জীবনরেখা।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতার বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক। বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশই আসে দেশটি থেকে। শেল এলএনজি আউটলুক ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদার প্রায় ১৩ শতাংশ এলএনজি দিয়ে পূরণ হয়েছে। এই বাজারে এশীয় দেশগুলোর নির্ভরতা দ্রুত বাড়ছে।
কেপলার ইনসাইটের তথ্য বলছে, কাতার থেকে এলএনজি আমদানিতে চীন ও ভারত শীর্ষে থাকলেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তানও বড় ক্রেতাদের তালিকায় রয়েছে। ২০২৫ সালে পাকিস্তান তার ৯৯ শতাংশ এলএনজি চাহিদা পূরণ করেছে কাতার ও ইউএই থেকে। ভারত ও বাংলাদেশ তাদের চাহিদার অর্ধেকের বেশি সংগ্রহ করেছে এই দুই দেশ থেকেই।
এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে এলএনজি সরবরাহ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের। তখন এশীয় ক্রেতাদের যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঝুঁকতে হবে। তবে বৈশ্বিক এলএনজি প্ল্যান্টগুলো ইতিমধ্যেই পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে, ফলে স্বল্পমেয়াদে অতিরিক্ত সরবরাহ পাওয়া কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার রপ্তানি কমে গেলে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে উঠে আসে। এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের ‘গোল্ডেন পাস’ এলএনজি প্ল্যান্ট চালুর কথা থাকলেও পূর্ণ উৎপাদনে যেতে সময় লাগবে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
আরব উপদ্বীপের ওমান হরমুজ প্রণালির বাইরে থেকে এলএনজি রপ্তানি করে। ফলে আংশিক বিকল্প হিসেবে ওমান থেকে সরবরাহ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে কাতারের তুলনায় ওমানের উৎপাদন অনেক কম, যা বাংলাদেশের প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই গ্যাসনির্ভর। স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পখাতে গ্যাস সংকট ও জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শুধু সরবরাহ সংকটই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে দামও বাড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। বিকল্প উৎস ও সরবরাহ বৈচিত্র্যকরণে দ্রুত কৌশল না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে দেশ।