ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ: জ্বালানি তেল নিয়ে শঙ্কা, বিকল্প সন্ধানের তাগিদ

রেজাউল করিম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা ও ইরানের পাল্টা হামলায় নতুন সংকটে পড়েছে বিশ্ব। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ইতোমধ্যেই তেল পরিবহনের অন্যতম গুরত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এই পরিস্থিতিতে এখনই বিকল্প জ্বালানির উৎসের ব্যবস্থা করার তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান (বাবু)। একই সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে বড় সংকট সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা করেন অর্থনীতিবিদরাও।

গত শনিবার ইরানের রাজধানী তেহরানের একাধিক স্থানে হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত যুদ্ধে উভয়পক্ষের শতাধিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ এখনও পর্যন্ত বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। আর মধ্যপ্রাচ্য সারা বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সারা বিশ্বের জ্বালানি তেলের বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্য। আর আকাশ যোগাযোগের বড় কেন্দ্র এই অঞ্চল। তাই রপ্তানিও সমস্যায় পড়েছে। তাই এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দেশের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।

মঙ্গলবার, (০৩ মার্চ ২০২৬) কথা হয় বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের (বাবু) সঙ্গে। তিনি আমদানি-রপ্তানি ও ক্রয়াদেশের ক্ষেত্রে এখনও সংকট সৃষ্টি না হলেও জ্বালানী সংকট এখনই শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি সংবাদকে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার খবরে ইতোমধ্যেই জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে। যে জাহাজগুলো এখন আটকে আছে সেগুলো আসতে না পারলে জ্বালানির দাম হু হু করে বেড়ে যাবে। আবার এমনও হতে পারে জ্বালানির অভাবে কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। সে জন্য বিকল্প জ্বালানির জন্য আজ থেকেই ব্যবস্থা করতে হবে।’

তবে আমদানি-রপ্তানিতে এখনই কোনো সমস্যা দেখছেন না তিনি। তিনি বলেন, ‘আমাদের আমদানি-রপ্তানির রুটের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালী নেই। তাই আমদানি-রপ্তানিতে সমস্যা এখনও সৃষ্টি হবে না। ক্রয়াদেশেও সমস্যা হবে না কারণ আমাদের রপ্তানিগুলো ইউরোপ-আমেরিকায় বেশি। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তখন সব ক্ষেত্রেই সমস্যা সৃষ্টি হবে।’

একই আশঙ্কা করেন অর্থনীতিবিদরা। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন গত রোববার সংবাদকে বলেন, ‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশেও।’

তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধ যদি সপ্তাহখানেকের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় তাহলে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। তবে যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে প্রভাব পড়বে। কিছু প্রভাব তো ইতোমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে। যেমন- যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরই মধ্যপ্রাচ্যের অনেকগুলো ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এসব ফ্লাইটের যাত্রীরা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছিলেন। এখন তারা যদি সময় মতো যেতে না পারেন তাহলে তাদের ভিসা বাতিল হয়ে যেতে পারে। এগুলো পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব না ফেললেও ব্যক্তিগতভাবে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।’

ইরান ইতোমধ্যেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। এতে তেলসহ অন্য পণ্যের জাহাজ আটকে গেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সমস্যাটা সারা বিশ্বেই পড়বে। এটাও নির্ভর করছে যুদ্ধ কতদিন দীর্ঘায়িত হয় সেটার ওপর।’

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল সংবাদকে বলেন, ‘আমরা আশা করছি, যুদ্ধ যেন দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধ যদি দ্রুত বন্ধ হয়ে যায় তাহলে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রভাব নেতিবাচক পড়বে। কারণ, আমরা যে জ্বালানি ব্যবহার করি সেটা মধ্যপ্রাচ্যের সেই রুট দিয়েই আসে। তাই আমাদের অঞ্চলের জন্য বিষয়টা চিন্তার।’

যদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কোন ধরনের প্রভাব পড়তে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর যেমন প্রভাব পড়েছিল ঠিক তেমন প্রভাব পড়তে পারে। যেমন, কিছু অর্ডার ক্যানসেল হবে, নতুন অর্ডারও কমতে পারে। কারণ একটা যুদ্ধের প্রভাব সারা বিশ্বের সাপ্লাই চেইনেই পড়ে।’

ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য খুব বেশি নয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশ-ইরানের বাণিজ্য এক কোটি ডলারের সামান্য বেশি। এর মধ্যে বড় অংশ বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি। তার বিপরীতে ইরান থেকে আমদানি হয় সামান্য। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১ কোটি ৯ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে ১ কোটি ৮ লাখ ৩২ হাজার ৮৯৮ ডলারের পাটের সুতা, ৯৫ হাজার ৩১০ ডলারের নিট পোশাক এবং ৯ হাজার ৩৫১ ডলারের ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে।

এর আগে গত ২০২০-২১ অর্থবছরেও ইরানে পণ্য রপ্তানি ছিল ১ কোটি ৫৯ লাখ ডলারের। পরের বছর সেই রপ্তানি কমে ১ কোটি ১৯ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি বেড়ে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। পরের বছর রপ্তানি কমে হয় ১ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দুই দেশের বাণিজ্য বন্ধের কারণে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থার জন্য সারা বিশ্বে যেসব প্রভাব পড়ে, সেটা পড়বে।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি