ক্রসফায়ার বন্ধ করার জন্যে মৌখিক আদেশ দিয়েছিলেন। তবে তা বন্ধ না হওয়ায় কোন কৈফিয়ত ব্যাখ্যা তলব করেন নাই বলে জানান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
‘সেনাপ্রধানের আদেশ অমান্য করলে সেনা আইন অনুযায়ী শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে আসামি জিয়াউল আহসান র্যাবে কর্মরত থাকায় তার আদেশ অমান্যের জন্য কোনো ‘ওয়ার্নিং’ বা ব্যাখ্যা চাওয়া হয়নি’ বলেও মন্তব্য করেছে সাবেক এই সেনাপ্রধান। ‘সেনাপ্রধান থাকাকালীন ইকবাল করিমের সব বৈধ আদেশই জিয়াউল আহসান মেনে চলেছেন’ আসামিপক্ষের আইনজীবী আবুল হাসানের এমন দাবির মুখে এই সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, ‘জিয়াউল আহসান আমার কোনো বৈধ আদেশ অমান্য করেননি এ তথ্যটি সত্য নয়।’
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক মানুষকে গুম ও খুনের ঘটনায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় চতুর্থ দিনের জেরায় মঙ্গলবার, (০৩ মার্চ ২০২৬) ইকবাল করিম ভূঁইয়া এসব কথা বলেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ২০১২ সালের ১৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জেরা সম্পন্ন হয়।
প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
গুম ও খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত জিয়াউল আহসানের মামলায় এটি ছিল সাবেক সেনাপ্রধানের চতুর্থ দিনের জেরা।
এদিন আসামিপক্ষের আইনজীবী আবুল হাসান তাকে জেরা করেন। এই মামলায় টানা চার দিনব্যাপী জেরা শেষ হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল আগামী ৯ মার্চ পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেছেন।
ট্রাইব্যুনালে ‘কর্র্নেল মুজিবকে আমি (ইকবাল করিম ভূঁইয়া) মৌখিক আদেশের মাধ্যমে ক্রসফায়ার বন্ধ করার কথা বলি’ বলে মন্তব্য করলে আসামিপক্ষের আইনজীবী মিথ্যা বলে দাবি করেন। জবাবে ইকবাল করিম ভূঁইয়া আসামি পক্ষের আইনজীবীর এই দাবি ‘সত্য নয়’ বলে মন্তব্য করেন।
‘জেনারেল জিয়াউল আহসানকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য জেনারেল মুজিবকে মৌখিক আদেশ প্রদান করেন নাই বলেও জেরায় ট্রাইব্যুনালে জানান এই সাক্ষী। তিনি বলেন, ‘তথাপি ক্রসফায়ার বন্ধ না হওয়ায় আমি লিখিতভাবে কোনো কৈফিয়ত তলব করি নাই।
সেনাপ্রধানের কোনো আদেশ অমান্য করলে অধীনস্থদের বিরুদ্ধে সেনা আইন অনুযায়ী শাস্তির বিধান আছে। আমার আদেশ অমান্য করার ব্যাপারে তাকে ওয়ার্নিং দেয়া বা এক্সপ্লেনেশন চাওয়া হয় নাই। কারণ তিনি র্যাবের অধীনে ছিলেন এবং এটি আমার এখতিয়ারধীন ছিল না।’
ক্যাপ্টেন সেলিমকে নামে এক সেনা সদস্যকে র্যাব চাকরি অবস্থায় সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তন করার আদেশ দিয়েছে কিনা আসামি পক্ষের এমন এক প্রশ্নের জবাবে ‘মনে নেই’ বলে মন্তব্য করেন। পরে তিনি বলেন, হ্যাঁ, ‘আমি অনেকেই বিভিন্ন সংস্থা থেকে সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তন করার আদেশ জারি করেছি।’ তবে ‘ইহা সত্য নয় যে, ক্যাপ্টেন সেলিম র্যাবে চাকরিরত অবস্থায় সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তন করার জন্য স্ট্যান্ড রিলিজ দিয়েছিলাম।’ যদিও পরে ‘সেনাবাহিনীতে স্ট্যান্ড রিলিজ করার বিধান নেই’ বলেও উল্লেখ করেন।
ডিজিএফআই এর যে সমস্ত সেলে বন্দীদের রাখা হতো তা তিনি দেখেননি বলে মন্তব্য করেন। তার দাবি, ‘আমি চাকরি জীবনে দুইবার ডিজিএফআই অফিসে গিয়েছি। আমি অফিসের বাইরে কোথাও যাইনি।’
আসামিপক্ষের জেরায় ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘ইহা সত্য নয় যে, কিলিং মিশনে যেতে বলা এবং কিলিং মিশনে না গিয়ে সেনানিবাসে এসে রিপোর্ট করা মর্মে অসত্য বলেছি।’ কিলিং মিশন নামে র্যাবে কোনো কিছুু ছিল না বলে আসামিপক্ষের দাবি সত্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউল আহসান গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। এসময় তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। জেরা চলাকালীন সময় ট্রাইব্যুনালে কাঠগড়ায় থেকেই নিজের আইনজীবীদের সহযোগিতা করতে দেখা যায় জিয়াউল আহসানকে।
গত ১৪ জানুয়ারি জিয়াউলের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। এ মামলায় সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ আনা হয়। প্রথমটি হলো- ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইলে সড়কের পাশে জিয়াউলের সরাসরি উপস্থিতিতে সজলসহ আরও তিনজনকে হত্যা। দ্বিতীয় অভিযোগে অপরাধের সময়কাল হলো ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত। এ সময়টায় বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের চরদুয়ানী খালঘেঁষা বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল, মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যা। তৃতীয় অভিযোগেও ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি ইকবাল করিমের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। এরপর তিনদিন যথাক্রমে ১৮ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি এবং ১ মার্চ জেরা করেন আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো। জেরায় জিয়াউলের আইনজীবীরা নানান প্রশ্নের মুখে ফেলেন সাবেক এই সেনাপ্রধানকে। এদিকে, আজ সকালে কারাগার থেকে জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তার উপস্থিতিতেই জেরার কার্যক্রম চলে। এমনকি জেরা চলাকালীন কাঠগড়ায় থেকেই নিজের আইনজীবীদের সহযোগিতা করেন তিনি।