দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম গণমাধ্যমে প্রকাশ না করার বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের নেয়া সিদ্ধান্তকে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পর তা গণমাধ্যম বা ওয়েবসাইটে প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বুধবার, (০৪ মার্চ ২০২৬) বিচারপতি ফরিদ আহমেদ ও বিচারপতি মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। ২০২২ সালে জারি করা এ সংক্রান্ত রুল যথাযথ ঘোষণা করে এ রায় আসে।
আদালতে রিটকারী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ, তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী সঞ্জয় মন্ডল। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মুনতাসির উদ্দিন আহমেদ।
২০২২ সালের এপ্রিলে গণমাধ্যমে খবর আসে, পরিবেশ অধিদপ্তর দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও তাদের ‘সম্মান রক্ষার্থে’ নাম প্রকাশ করবে না। বড় ব্যবসায়ীদের চাপে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। এই প্রতিবেদন যুক্ত করে জনস্বার্থে ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করে এইচআরপিবি। সংগঠনটির পক্ষে রিটটি দায়ের করেন আইনজীবী মোহাম্মদ সারোয়ার আহাদ চৌধুরী। এতে পরিবেশ সচিব, তথ্য সচিব ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ পাঁচজনকে বিবাদী করা হয়।
প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০২২ সালের ১৩ জুন হাইকোর্ট রুল জারি করে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ওই সিদ্ধান্ত কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় রুলে। পরবর্তীতে রুল শুনানির জন্য আবেদন করা হলে গত বছরের ১৭ নভেম্বর তারিখ নির্ধারণ করে আদালত। এরপর গত ১৯, ২৩ ও ২৪ নভেম্বর এবং ২, ১০ ও ১৫ ডিসেম্বর এ রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে বুধবার রায় দিল হাইকোর্ট।
শুনানিতে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ৪ (২) ধারা এবং তথ্য অধিকার আইন ২০০৯-এর ৬ (১) ধারায় তথ্য প্রকাশের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব দূষণ নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেয়া এবং তা প্রকাশ করা। কিন্তু তা না করে ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দিতে এই অবৈধ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, যা পরিবেশ আইনের পরিপন্থী।
অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের আইনজীবী মুনতাসির উদ্দিন আদালতে দাবি করেন, বর্তমানে দূষণকারীদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে আদালত সেই নির্দিষ্ট সময়কালের দূষণকারীদের নাম প্রকাশের কোনো তথ্য চাইলে ওই আইনজীবী তা উপস্থাপন করতে পারেননি।
রায়ে আদালত বলেছে, তথ্য অধিকার আইনে জনগণের তথ্য জানার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। দূষণকারীরা দেশের ক্ষতি করছে, তাদের তথ্য গণমাধ্যমে এলে অন্য দূষণকারীরাও সতর্ক হতে পারে। তাই তথ্য গোপনের ওই সিদ্ধান্ত অবৈধ ও বেআইনি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে পরিবেশ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে নেয়া প্রতিটি ব্যবস্থার তথ্য প্রেস বিজ্ঞপ্তি বা ওয়েবসাইটসহ গণমাধ্যমে প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়।
রায় ঘোষণার পর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘এর ফলে কারও বিরুদ্ধে জরিমানা বা অন্য ব্যবস্থা নেয়া হলে তা প্রকাশ্যে আসবে। এতে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক হবে। বিষয়টি জনসমক্ষে এলে মান-সম্মানের প্রশ্ন জড়িত থাকে, তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যেও সচেতনতা তৈরি হবে।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত যে অর্জন হয়েছিল, পরে তা ভেস্তে গেছে। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে প্রশাসন নানা চাপে পড়ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ইটভাটা উচ্ছেদে গেলে ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।’
বর্তমানে ‘মব’ কালচারের কারণে প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে ‘ভীত থাকে’ বলে মন্তব্য করেন এই আইনজীবী। ঢাকার আশপাশের ইটভাটা প্রসঙ্গে মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘২০১৯ সালে রিট করার পর ২০২১ সালে প্রায় ২০০টি ইটভাটা ভেঙে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন সেগুলোর অনেকটিই আবার চালু হয়েছে, যার ফলে ঢাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।’ পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন থাকলেও সরকার সে বিষয়ে যথেষ্ট উদ্যোগ নেয়নি বলে দাবি করেন তিনি।