alt

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী

শত্রুমুক্ত হয় দেবীদ্বার, ফুলবাড়ী, ফুলছড়ি, লক্ষ্মীপুর, কামালপুর

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট : শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২১

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস ছিল তুমুল উত্তেজনাপূর্ণ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের শোষণ-শাসন ধরে রাখতে, মুক্তিকামী বাংলার মানুষকে দমিয়ে রাখতে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, নারী-শিশু নির্যাতন চালিয়েছে। অন্যদিকে, মুক্তিকামী বাংলার তরুণ, বৃদ্ধ, নারী এমন কী শিশুরাও তাদের বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে সবুজের বুকে লাল সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছে। দিন যতই পার হতে থাকলো ততই পাকি সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাজয় স্বীকার করে পিছু হটতে থাকল। এরপর শেষ যখন ডিসেম্বর শুরু হলো, তখনই পাকসেনা, রাজাকার-আলবদরদের শেষঘণ্টা বাজতে শুরু করল। প্রতিদিন করে বাড়তে থাকে মুক্ত-স্বাধীন স্বদেশের মাটি। ৪ ডিসেম্বর তেমনই একটি দিন।

এদিন লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লার দেবীদ্বার, গাইবান্ধার ফুলছড়ি, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, জামালপুরের ধানুয়াকামালপুর মুক্ত হয়। এ এলাকার মানুষেরা এদিন প্রথম মুক্ত-স্বাধীন স্বদেশের বাতাস বুক ভরে টেনে নেন।

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ফুলবাড়ীকে পাকি হানাদার বাহিনী মুক্ত করার জন্য ৪ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী যৌথভাবে ফুলবাড়ী থানার জলপাইতলী, পানিকাটা, দেশমা, রুদ্রানী, জলেশ্বরী, আমড়া, রানীনগরসহ বিভিন্ন সীমান্ত পথে ফুলবাড়ীতে প্রবেশ করে এবং পাক সেনাদের বিরুদ্ধে চতুর্মুখী আক্রমণ চালায়। এ সময় মিত্র বাহিনীর হাতে নিশ্চিত পরাজয় বুঝে পাকসেনারা মিত্র বাহিনীর ফুলবাড়ী শহরে আগমন রোধ করতে ওই দিন বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৩টায় ফুলবাড়ীর ছোট যমুনার ওপর লোহার ব্রিজের পূর্বাংশ ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয়। সেই ব্রিজটি কালের সাক্ষী হয়ে আজো আছে ফুলবাড়ীর যমুনা নদীর বুকে।

এ সময় পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে ফুলবাড়ী সরকারি কলেজের দক্ষিণ দিকে যমুনা নদীর ওপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অফিসার নিহত হন। এরপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মেঠোপথে ফুলবাড়ী ছেড়ে সৈয়দপুরের দিকে পালিয়ে যায়। মুক্তিবাহিনী ফুলবাড়ীকে পাকি দখলদার মুক্ত করে ফুলবাড়ীর পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয়।

এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ফুলবাড়ী থেকে পিছু হটেই না শুধু এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। শত্রুমুক্ত করে ফুলবাড়ী উপজেলার সিঅ্যান্ডবি ডাকবাংলায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

পাকিস্তানি সেনা ও এ দেশীয় দোসর রাজাকার-আল বদরদের সহায়তায় লক্ষ্মীপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় ব্যাপক অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্ষণ শেষে শত শত নিরীহ জনসাধারণকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এ দিন প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল হায়দার চৌধুরী এবং সুবেদার আবদুল মতিনের নেতৃত্বে দেড় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা একত্রিত হয়ে দালাল বাজার, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ হামছাদি, শাঁখারীপাড়ার মিঠানীয়া খাল পাড়সহ বাগবাড়ির রাজাকার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে লক্ষ্মীপুরকে হানাদারমুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে শতাধিক রাজাকারকে আটক করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করে। এরপর প্রকাশ্যে লক্ষ্মীপুর শহরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১১নং সেক্টরের কোম্পানি কমান্ডার রুস্তম আলী খন্দকারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বিশাল দল ফুলছড়ি উপজেলার ব্রহ্মপুত্র বেষ্টিত গলনার চরে অবস্থান নেন। তারা ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গেরিলা আক্রমণে পাকসেনাদের পরাস্ত করেন। দুঃসাহসী গেরিলা কমান্ডার সামছুল আলম ও অন্যান্য সহযোগী কমান্ডাররা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে পরিকল্পনা মাফিক অতর্কিতে ফুলছড়ি পুলিশ স্টেশন আক্রমণ করলে মুক্তিযোদ্ধাদের সাঁড়াশি আক্রমণে পাক হানাদার বাহিনী ফুলছড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এই যুদ্ধে পাকহানাদার বাহিনীদের হাতে শহীদ হন পাঁচ বীর মুক্তিযোদ্ধা। এরা হলেন বগুড়ার জাহেদুল ইসলাম বাদল, সাঘাটার আফজাল হোসেন, আবদুস সোবহান, ওসমান গণি ও কাবেজ আলী। পরদিন ৪ ডিসেম্বর সকালে ফুলছড়ি হানাদারমুক্ত হয়। এই পাঁচ বীর শহীদকে সাঘাটার মুক্তিনগর ইউনিয়নের খামার ধনারুহা প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সমাহিত করা হয়।

ওই সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন আহসান মালিক খানের নেতৃত্বে হানাদার বাহিনী ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল। একদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবরোধ অন্যদিকে হানাদারদের ঘাঁটি রক্ষায় মরণপণ চেষ্টায় শুরু হয় প্রচন্ড লড়াই। ১০ দিনের প্রচন্ড যুদ্ধের পর ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় দুর্গে অবরুদ্ধ ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের গ্যারিসন কমান্ডার ক্যাপ্টেন আহসান মালিক খানসহ ১৬২ পাকিস্তানি সৈন্য মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। মুক্ত হয় কামালপুর। আর কামালপুর মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়েই সূচিত হয় শেরপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ ঢাকা বিজয়ের পথ। কামালপুরের এ যুদ্ধে ক্যাপ্টেন সালাহ উদ্দিন মমতাজ, মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান তসলিমসহ শহীদ হন ১৯৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। অন্যদিকে, একজন ক্যাপ্টেনসহ পাকিস্তানি বাহিনীর ২২০ জন সৈন্য নিহত হন এই যুদ্ধে ।

এইদিনে কমলগঞ্জের ভানুগাছ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের মুখে সদর থেকে পাকিবাহিনী পিছু হটে এবং স্বাধীনতার পতাকা ওড়ানো হয়। ভানুগাছ বাজারের কাছে ধলাই সেতুতে সম্মুখযুদ্ধে তিনজন ও কমলগঞ্জ থানার সামনে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর সময় অন্য একজন অস্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সদস্য পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। শহীদরা হলেন কুমিল্লার মুরাদনগরের কালাপাইনা গ্রামের সিপাহী মো. মিজানুর রহমান, দেবীদ্বারের বড় শালঘর গ্রামের সিপাহী আবদুর রশিদ, পাবনা শাহাদাৎপুরের দারগাপাড়া গ্রামের ল্যান্স নায়েক জিল্লুর রহমান, চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের মগাদিয়া গ্রামের সিপাহী মো. শাহাজান মিয়া।

সম্মুখযুদ্ধে নিজের জীবন উৎসর্গকারী এই চার বীর যোদ্ধাকে ৫ ডিসেম্বর পাশের আলীনগর ইউনিয়নের পশ্চিম কামুদপুরে দাফন করা হয়। সেই থেকে ৪ ডিসেম্বর কমলগঞ্জ মুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

ছবি

তফসিল ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে, ভোটের প্রস্তুতি মোটামুটি শেষ: সিইসি

ছবি

তারেকের দেশে ফেরা ‘নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই’, সরকারের কোনো নিষেধ নেই, বললেন প্রেস সচিব

ছবি

খালেদা জিয়ার অবস্থা ‘সংকটাপন্ন’, বিদেশে নেয়ার পরিস্থিতি নেই

ছবি

তারেক রহমানের দেশে ফেরায় সরকারের কোনো বাধা নেই: প্রেস সচিব

ছবি

আরব আমিরাতে আরও ২৪ বন্দীকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে: আসিফ নজরুল

ছবি

ত্বকী হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দ্রুত দাখিলে তদন্ত কর্মকর্তাকে তাগিদ আদালতের

ছবি

‘চাপের মুখে’ প্রশাসন, স্বাধীন ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস কমিশন’ চায় বিএএসএ

পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে ৭০ হাজারের বেশি প্রবাসীর নিবন্ধন

ছবি

আরও ৩৯ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠালো যুক্তরাষ্ট্র

এমপিওভুক্তির দাবিতে ৩৩তম দিনে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবস্থান

নবম গ্রেডে বেতন নির্ধারণসহ চার দাবিতে ‘শিক্ষা ভবন’ চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি মাধ্যমিক শিক্ষকদের

৪৫তম বিসিএসের নন-ক্যাডারের ফল প্রকাশ: সুপারিশ পেলেন ৫৬৫ জন

ছবি

বিমানবাহিনী একাডেমিতে রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত

‘ঘুষ-দুর্নীতি’: ঢাকা উত্তরের প্রশাসক এজাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদক

সাগরে গভীর নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে, সমুদ্রবন্দরে সতর্কতা

বাউলদের ওপর হামলা: সাঁড়াশি অভিযান চলছে, বললেন প্রেস সচিব

প্রবাসী ভোটার: পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা না দিলে ব্যালট যাবে না

ভবন ও নির্মাণ কাজ অনুমোদনে আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠনের নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার

আরাকান আর্মির হাতে আটক ১২ জেলে

ট্রাইব্যুনালে হাসিনার পক্ষে লড়বেন না জেড আই খান পান্না

ছবি

ডেঙ্গু: আরও ৭ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে আরও ৫৬৭ জন

আতঙ্ক না কাটতেই আবারও ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে কাঁপলো দেশ

ত্রয়োদশ নির্বাচন: নিরাপত্তা পরিকল্পনা চূড়ান্ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন হবে তিন স্তরে

ছবি

প্লট দুর্নীতি: হাসিনা ও দুই সন্তানের সাজা

ছবি

সুপ্রিমকোর্টের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার হলেন ড. মো. আতিকুস সামাদ

ছবি

দুই দিনে চার দফা ভূমিকম্প—আতঙ্কের মধ্যেই ফের কেঁপে উঠল বাংলাদেশ

ছবি

পূর্বাচলে প্লট দুর্নীতি মামলায় সর্বোচ্চ সাজা না পেয়ে হতাশ দুদক

ছবি

প্লট দুর্নীতির ৩ মামলায় শেখ হাসিনার ২১ বছরের কারাদণ্ড

ছবি

ডেঙ্গুতে আরও ৬১৫ জন হাসপাতালে, মৃত্যু ৩

ছবি

৩৩ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি

ছবি

‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’: বিএনপির প্রার্থী তুলির বিরুদ্ধে মামলা, তদন্তে পিবিআই

ছবি

ক্রিকেটার সাকিবের মামলায় প্রতিবেদন জমা ৩ মার্চে

ছবি

সাবেক আইজিপি বেনজীরের স্ত্রী-কন্যা ও সাবেক ডিবি প্রধান হারুনের আয়কর নথি জব্দের আদেশ

ছবি

শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে লেখা চিঠির জবাব এখনও দেয়নি ভারত: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

ছবি

হাসিনার লকার থেকে ৮৩২ ভরি স্বর্ণালঙ্কার জব্দ

ছবি

শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ; ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ

tab

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী

শত্রুমুক্ত হয় দেবীদ্বার, ফুলবাড়ী, ফুলছড়ি, লক্ষ্মীপুর, কামালপুর

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২১

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস ছিল তুমুল উত্তেজনাপূর্ণ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের শোষণ-শাসন ধরে রাখতে, মুক্তিকামী বাংলার মানুষকে দমিয়ে রাখতে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, নারী-শিশু নির্যাতন চালিয়েছে। অন্যদিকে, মুক্তিকামী বাংলার তরুণ, বৃদ্ধ, নারী এমন কী শিশুরাও তাদের বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে সবুজের বুকে লাল সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছে। দিন যতই পার হতে থাকলো ততই পাকি সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাজয় স্বীকার করে পিছু হটতে থাকল। এরপর শেষ যখন ডিসেম্বর শুরু হলো, তখনই পাকসেনা, রাজাকার-আলবদরদের শেষঘণ্টা বাজতে শুরু করল। প্রতিদিন করে বাড়তে থাকে মুক্ত-স্বাধীন স্বদেশের মাটি। ৪ ডিসেম্বর তেমনই একটি দিন।

এদিন লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লার দেবীদ্বার, গাইবান্ধার ফুলছড়ি, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, জামালপুরের ধানুয়াকামালপুর মুক্ত হয়। এ এলাকার মানুষেরা এদিন প্রথম মুক্ত-স্বাধীন স্বদেশের বাতাস বুক ভরে টেনে নেন।

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ফুলবাড়ীকে পাকি হানাদার বাহিনী মুক্ত করার জন্য ৪ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী যৌথভাবে ফুলবাড়ী থানার জলপাইতলী, পানিকাটা, দেশমা, রুদ্রানী, জলেশ্বরী, আমড়া, রানীনগরসহ বিভিন্ন সীমান্ত পথে ফুলবাড়ীতে প্রবেশ করে এবং পাক সেনাদের বিরুদ্ধে চতুর্মুখী আক্রমণ চালায়। এ সময় মিত্র বাহিনীর হাতে নিশ্চিত পরাজয় বুঝে পাকসেনারা মিত্র বাহিনীর ফুলবাড়ী শহরে আগমন রোধ করতে ওই দিন বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৩টায় ফুলবাড়ীর ছোট যমুনার ওপর লোহার ব্রিজের পূর্বাংশ ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয়। সেই ব্রিজটি কালের সাক্ষী হয়ে আজো আছে ফুলবাড়ীর যমুনা নদীর বুকে।

এ সময় পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে ফুলবাড়ী সরকারি কলেজের দক্ষিণ দিকে যমুনা নদীর ওপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অফিসার নিহত হন। এরপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মেঠোপথে ফুলবাড়ী ছেড়ে সৈয়দপুরের দিকে পালিয়ে যায়। মুক্তিবাহিনী ফুলবাড়ীকে পাকি দখলদার মুক্ত করে ফুলবাড়ীর পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয়।

এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ফুলবাড়ী থেকে পিছু হটেই না শুধু এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। শত্রুমুক্ত করে ফুলবাড়ী উপজেলার সিঅ্যান্ডবি ডাকবাংলায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

পাকিস্তানি সেনা ও এ দেশীয় দোসর রাজাকার-আল বদরদের সহায়তায় লক্ষ্মীপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় ব্যাপক অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্ষণ শেষে শত শত নিরীহ জনসাধারণকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এ দিন প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল হায়দার চৌধুরী এবং সুবেদার আবদুল মতিনের নেতৃত্বে দেড় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা একত্রিত হয়ে দালাল বাজার, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ হামছাদি, শাঁখারীপাড়ার মিঠানীয়া খাল পাড়সহ বাগবাড়ির রাজাকার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে লক্ষ্মীপুরকে হানাদারমুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে শতাধিক রাজাকারকে আটক করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করে। এরপর প্রকাশ্যে লক্ষ্মীপুর শহরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১১নং সেক্টরের কোম্পানি কমান্ডার রুস্তম আলী খন্দকারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বিশাল দল ফুলছড়ি উপজেলার ব্রহ্মপুত্র বেষ্টিত গলনার চরে অবস্থান নেন। তারা ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গেরিলা আক্রমণে পাকসেনাদের পরাস্ত করেন। দুঃসাহসী গেরিলা কমান্ডার সামছুল আলম ও অন্যান্য সহযোগী কমান্ডাররা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে পরিকল্পনা মাফিক অতর্কিতে ফুলছড়ি পুলিশ স্টেশন আক্রমণ করলে মুক্তিযোদ্ধাদের সাঁড়াশি আক্রমণে পাক হানাদার বাহিনী ফুলছড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এই যুদ্ধে পাকহানাদার বাহিনীদের হাতে শহীদ হন পাঁচ বীর মুক্তিযোদ্ধা। এরা হলেন বগুড়ার জাহেদুল ইসলাম বাদল, সাঘাটার আফজাল হোসেন, আবদুস সোবহান, ওসমান গণি ও কাবেজ আলী। পরদিন ৪ ডিসেম্বর সকালে ফুলছড়ি হানাদারমুক্ত হয়। এই পাঁচ বীর শহীদকে সাঘাটার মুক্তিনগর ইউনিয়নের খামার ধনারুহা প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সমাহিত করা হয়।

ওই সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন আহসান মালিক খানের নেতৃত্বে হানাদার বাহিনী ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল। একদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবরোধ অন্যদিকে হানাদারদের ঘাঁটি রক্ষায় মরণপণ চেষ্টায় শুরু হয় প্রচন্ড লড়াই। ১০ দিনের প্রচন্ড যুদ্ধের পর ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় দুর্গে অবরুদ্ধ ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের গ্যারিসন কমান্ডার ক্যাপ্টেন আহসান মালিক খানসহ ১৬২ পাকিস্তানি সৈন্য মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। মুক্ত হয় কামালপুর। আর কামালপুর মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়েই সূচিত হয় শেরপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ ঢাকা বিজয়ের পথ। কামালপুরের এ যুদ্ধে ক্যাপ্টেন সালাহ উদ্দিন মমতাজ, মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান তসলিমসহ শহীদ হন ১৯৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। অন্যদিকে, একজন ক্যাপ্টেনসহ পাকিস্তানি বাহিনীর ২২০ জন সৈন্য নিহত হন এই যুদ্ধে ।

এইদিনে কমলগঞ্জের ভানুগাছ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের মুখে সদর থেকে পাকিবাহিনী পিছু হটে এবং স্বাধীনতার পতাকা ওড়ানো হয়। ভানুগাছ বাজারের কাছে ধলাই সেতুতে সম্মুখযুদ্ধে তিনজন ও কমলগঞ্জ থানার সামনে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর সময় অন্য একজন অস্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সদস্য পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। শহীদরা হলেন কুমিল্লার মুরাদনগরের কালাপাইনা গ্রামের সিপাহী মো. মিজানুর রহমান, দেবীদ্বারের বড় শালঘর গ্রামের সিপাহী আবদুর রশিদ, পাবনা শাহাদাৎপুরের দারগাপাড়া গ্রামের ল্যান্স নায়েক জিল্লুর রহমান, চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের মগাদিয়া গ্রামের সিপাহী মো. শাহাজান মিয়া।

সম্মুখযুদ্ধে নিজের জীবন উৎসর্গকারী এই চার বীর যোদ্ধাকে ৫ ডিসেম্বর পাশের আলীনগর ইউনিয়নের পশ্চিম কামুদপুরে দাফন করা হয়। সেই থেকে ৪ ডিসেম্বর কমলগঞ্জ মুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

back to top