ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের উত্তর জেলার ৭টি আসনে রাজনৈতিক তৎপরতা এখন তুঙ্গে। চট্টগ্রামে ১ থেকে ৭ এই ৭টি আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জোট এবং স্বতন্ত্র মিলে ৮৪ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। তবে জমা দিয়েছেন ৫৮ জন। বিভিন্ন কারণে সাবেক এমপিসহ হেভিওয়েট অনেক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের অনেকেই মনোনয়ন ফিরে পেতে আইনি প্রক্রিয়ায় আগাচ্ছেন।
মনোনয়ন দাখিল করা প্রার্থীদের মধ্যে দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি দলের মনোনয়ন বঞ্চিত স্বতন্ত্র প্রার্থী, সাধারণ স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং ছোট বা নতুন দলগুলোর জোটের প্রার্থীরা রয়েছেন।
নির্ধারিত সময়ে প্রত্যাহার, প্রতিক বরাদ্দসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় শেষে আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে ভোট গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা পূর্ব পর্যন্ত প্রচার-প্রচারণা চালাবেন প্রার্থীরা। এর আগে আচরণবিধি মোতাবেক কোনো সভা-সমাবেশ করে প্রচার চালাতে পারবেন না তারা। প্রচারণায় না থাকলেও উল্লেখিত আসনের বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীর মত দলগুলোর জোটের প্রার্থীসহ ছোট জোটের প্রার্থীরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক তৎপরতা এবং বিজয়ী হলে কী করবেন তার কথা বলছেন।
চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই উপজেলা)
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে এই আসনে ১৩ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও জমা দেন ১০ জন। এর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা ৭ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন।
তারা হলেন- বিএনপি মনোনীত নুরুল আমিন, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ ছাইফুর রহমান, জাতীয় পার্টির সৈয়দ শাহাদাৎ হোসেন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-এর শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের এ.কে.কে আবু ইউসুফ, ইনসানিয়াত বিপ্লবের রেজাউল করিম ও ইসলামী আন্দোলনের ফেরদৌস আহমদ চৌধুরী। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮২হাজার ১২১ জন। আসনটিতে বিএনপি এবং জামায়াতের তৎপরতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি উপজেলা)
এই আসনে ১৪ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে জমা দেন ৯ জন। এর মধ্যে ৫ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। বৈধ প্রার্থীরা হলেন- বিএনপির সরোয়ার আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ নুরুল আমিন, জনতার দলের মোহাম্মদ গোলাম নওশের আলী, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির শাহজাদা সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ ও মো.ওসমান আলী। এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯০ জন। এই আসনেও বিএনপি এবং জামায়াতের প্রার্থীর তৎপরতাই বেশি।
চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ)
এই আসনে ১০ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে জমা দেন ৫ জন। এর মধ্যে মাত্র ২ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তারা হলেন বিএনপির মোস্তফা কামাল পাশা এবং জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ আলাউদ্দিন সিকদার।
এখানে মোট ভোটার ২ লাখ ৫৭ হাজার ৪৮৫ জন। বিএনপির মোস্তফা কামাল পাশা বললেন, জয়ের ব্যাপারে তিনি ‘শতভাগ আশাবাদী’। আর জামায়াতের আলাউদ্দিন বলছেন ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের’ কথা।
চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকু- ও নগরীর ১১ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ড)
এই আসনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন ১১ জন। জমা দিয়েছেন ১০ জন। এর মধ্যে ৯ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। বৈধ প্রার্থীরা হলেন- বিএনপির আসলাম চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর মো. আনোয়ার ছিদ্দিক, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) মো. শহীদুল ইসলাম চৌধুরী, গণসংহতি আন্দোলনের জাহিদুল আলম, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মো. জাকারিয়া খালেদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. দিদারুল মাওলা, গণঅধিকার পরিষদের এটিএম পারভেজ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মো. সিরাজদৌল্লাহ ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মো. মছিউদ্দৌলা। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৫ জন।
এখানে শেষ পর্যন্ত গণসংহতি ও গণঅধিকারের প্রার্থী থাকবেন কিনা তা এখনও নিশ্চিত নয়। কারণ বিএনপির সঙ্গে এই দুই দলের নির্বাচনী সমঝোতা হয়েছে। এখানেও বিএনপি ও জামায়াতের তৎপরতাই বেশি।
বিএনপির মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী বলছেন, ‘জনগণই আন্দোলন করে আমাকে ধানের শীষ এনে দিয়েছে।‘ আর জামায়াতের আনোয়ার ছিদ্দিক ‘ধর্ম-বর্ণ, মতাদর্শ, আক্বিদাগত পার্থক্যের ঊর্ধ্বে’ ওঠার কথা বলছেন।
চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী উপজেলা এবং নগরীর ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ড)
এই আসনে ১৬ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও জমা দেন ১০ জন। এর মধ্যে ৬ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। বৈধ প্রার্থীরা হলেন- বিএনপির মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের (জামায়াত জোট) মো. নাসির উদ্দিন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতি উল্লাহ নূরী, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মো.আলা উদ্দিন ও ইসলামী ফ্রন্টের সৈয়দ মোখতার আহমেদ।
যাচাই-বাছাইয়ে আসনটিতে সাবেক এমপি জাপা প্রার্থী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়। কারণ হিসেবে তার রাজনৈতিক দলের মনোনয়নপত্র সঠিক নয় বলে উল্লেখ করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
আর বিএনপির মনোয়নবঞ্চিত ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানার স্বতন্ত্র মনোনয়নপত্রটি ১% ভোটারসংখ্যা দৈবচয়নেরভিত্তিতে যাচাই-বাছাই সঠিক প্রমাণিত না হওয়ায় অবৈধ ঘোষণা করা হয়। তবে তাদের আপিলের সুযোগ আছে। আসনটিতে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯১ হাজার ৮৭৩ জন।
বিএনপির প্রার্থী মীর হেলাল উদ্দিন বললেন, ‘আমার উদ্দেশ্য মানুষের উন্নতি, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দৈনন্দিন জীবনে শান্তি নিয়ে আসা।‘ জামায়াত জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘সব ধর্মের মানুষ যাতে শান্তিতে বসবাস করতে পারে তেমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করবো।‘
##চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান উপজেলা)
এই আসনে ৯ জন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করে জমা দেন ৫ জন। তাদের সবার মনোয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। তবে বিএনপি থেকে ২ জন মনোনয়ন জমা দেয়ায় কে চূড়ান্ত তার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বৈধ প্রার্থীরা হলেনÑ বিএনপির দুই প্রার্থী গোলাম আকবর খোন্দকার ও গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শাহজাহান মঞ্জু, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোহাম্মদ ইলিয়াছ নূরী, গণসংহতি আন্দোলনের নাছির উদ্দীন তালুকদার। এখানে বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকতে পারেন সুন্নি ঐক্য জোটের ইলিয়াস নূরী।
##চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া উপজেলা)
এই আসনে ১১ জন মনোনয়পত্র সংগ্রহ করে জমা দেন ৯ জন। এর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা ৬ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন।
বৈধ প্রার্থীরা হলেন- বিএনপির হুম্মাম কাদের চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর এটিএম রেজাউল করিম, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মুহাম্মদ ইকবাল হাছান, জাতীয় পার্টির মো. মেহেদী রাশেদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবদুল্লাহ আল হারুন এবং খেলাফত মজলিসের মো. আবুল কালাম। জামায়াত আর খেলাফত মজলিসের নির্বাচনী সমঝোতায় এখানে শেষপর্যন্ত কোন দলের প্রার্থী থাকবে তা এখনও চূড়ান্ত নয়। এখানে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৫ হাজার ২২১ জন। বিএনপির হুম্মাম কাদের চৌধুরী ‘নিরাপদ জনপদ’ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আর জামায়াতের রেজাউল করিম ‘মানুষের মূল্যায়ন’ আশা করছেন।