জাতীয় সংসদের ৭৭, কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসন জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত আসন হিসেবে পরিচিত। জেলার প্রশাসনিক সদর এবং রাজনৈতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্র হওয়ায় এখানকার নির্বাচনী ফলাফল সবসময়ই জাতীয় রাজনীতিতেও প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র চার তিন বাকি। কুষ্টিয়া-৩ সদর আসনে এখন ভোটের সমীকরণ জমে উঠেছে ধানের শীষ (বিএনপি) ও দাঁড়িপাল্লার (জামায়াত) প্রার্থীর লড়াইকে ঘিরে।
১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ আসনে পর্যায়ক্রমে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। ১৯৯১ ও জুন ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির আবদুল খালেক চন্টু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে একই দলের অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন জয়ী হয়ে কুষ্টিয়া সদরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি ফিরিয়ে আনেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের খন্দকার রশিদুজ্জামান দুদু জয়ী হন। এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে টানা তিনবার আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ফলে টানা এক যুগের বেশি সময় ধরে এ আসনে আওয়ামী লীগের আধিপত্য বজায় ছিল, যা এবার বিরোধী শিবিরের জন্য বড় সুযোগ ও পরীক্ষা দুটিই একসঙ্গে এনেছে।
এই আসনে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ পরপর তিনবার জয় পেয়েছিল বিএনপি। সেই স্মৃতি থেকে সাহস পেয়ে এবারো জয় ছিনিয়ে আনতে মরিয়া তারা। অন্যদিকে অতীতে তৃতীয় অবস্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামী এবার মুফতি আমির হামজাকে সামনে এনে এককভাবে আসন দখলের স্বপ্ন দেখছে। নতুন মুখ হলেও মাঠে নেমে কড়া প্রতিদ্বন্ধীতা গড়ে তুলেছেন তিনি, যা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপির প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার আগে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় রাজনীতিতে তিনি পরিচিত, সংগঠনেও অভিজ্ঞ। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী মুফতি আমির হামজা মূলত ওয়াজের মঞ্চের পরিচিত বক্তা, রাজনীতির মাঠে এবারই প্রথম বড় পরিসরে পরীক্ষা দিচ্ছেন।
এ আসনে নারী ভোটারদের বড় একটি অংশকে টার্গেট করে বিশেষ কৌশলে মাঠে নেমেছে জামায়াত। দলীয় নারীরা গ্রুপ ধরে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে নারী ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। বিএনপির নারী নেত্রী-কর্মীরাও ঠিক একইভাবে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ধানের শীষের পক্ষে সমর্থন বাড়াতে চেষ্টা করছেন।
অনেক ভোটার মনে করছেন, আমির হামজার প্রতি বিশেষ করে নারী, ভ্যান-রিকশাচালক, কৃষকসহ সাধারণ মানুষের একটি অংশ আকৃষ্ট হয়েছে। ওয়াজের মাধ্যমে তার পরিচিতি মাঠে ভোটে কিছুটা প্রভাব ফেলছে। তবে তার কিছু বক্তব্য ও বয়সজনিত অভিজ্ঞতার ঘাটতি নিয়ে আবার অনেকে প্রশ্নও তুলছেন।
রাজনীতি নিয়ে সচেতনরা বলছেন, স্বাধীনতার পর এই আসনে সব নির্বাচনে বিএনপিই জয়ী হয়েছে, জামায়াত এককভাবে কখনো জয় পায়নি। তাদের স্থায়ী ভোট ব্যাংক থাকলেও তা সাধারণত ৩০ হাজারের আশেপাশে। এবার সেই ভোট কিছুটা বাড়লেও আসন দখল করতে হলে লক্ষাধিক ভোট পেতে হবে বলেই মত রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় নাগরিকদের।
জাকির হোসেন সরকারের পক্ষে যুক্তি তিনি আগে জনপ্রতিনিধি ছিলেন, ইউনিয়নভিত্তিক সংগঠন ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক আছে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগও গভীর। তবে তার ঘনিষ্ঠ কিছু নেতার আচরণ ও নেতিবাচক প্রচারণা তাকে কিছুটা বিব্রত করছে বলে অনেকেই মনে করেন।
এখন মাঠের চিত্র হলো বিএনপি ও জামায়াত কেউই প্রচারণায় পিছিয়ে থাকতে চাইছে না। জামায়াতের কর্মীরা ফজর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রচার চালাচ্ছেন। বিএনপিও প্রথম দিকে কিছুটা ধীর থাকলেও এখন গতি বাড়িয়েছে, সব এলাকায় সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নেমেছে ধানের শীষ। শহরের অলিগলি ব্যানার-ফেস্টুনে ভরে গেছে, আচরণবিধিতে নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুতের খুঁটিতেও ঝুলছে পোস্টার-ব্যানার, কিন্তু তা ঠেকাতে প্রশাসনের তেমন তৎপরতা চোখে পড়ছে না।
এদিকে জামায়াতের প্রার্থী আমির হামজার ফেসবুক পেজ সরিয়ে নেয়া হয়েছে, যা দলটি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে। আমির হামজা দাবি করছেন, কোনো ষড়যন্ত্র করে এবার দাঁড়িপাল্লার জয় ঠেকানো যাবে না, মানুষ পরিবর্তন চাইছে, জামায়াতের প্রতি সমর্থন বেড়েছে, এর প্রতিফলন ভোটের দিন দেখা যাবে।
অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার বলছেন, বিএনপি উন্নয়নের রূপরেখা পরিষ্কার করেছে, মানুষ সাড়া দিচ্ছে, অতীতের মতো এবারও ধানের শীষকে বিজয়ী করবে। তার দাবি, প্রতিটি এলাকায় ধানের শীষের পক্ষে জোয়ার তৈরি হয়েছে, কোনো ষড়যন্ত্র করে ভোটারদের ধানের শীষে ভোট দেয়া ঠেকানো যাবে না।
স্থানীয়দের মতে, এই আসনে শেষ মুহূর্তে বড় ভূমিকা রাখবে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ট ভোটারদের আচরণ। দুই পক্ষই নানাভাবে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের কাছে টানার কৌশল নিচ্ছে। পলাতক ও প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে এমন ধারণা জনমনে আছে। আওয়ামী লীগপন্থী ভোট যে দল বেশি টানতে পারবে, তাদের পাল্লাই শেষ পর্যন্ত ভারি হতে পারে। সব মিলিয়ে কুষ্টিয়া-৩ সদর আসনে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার লড়াই এখন সমানে-সমানে বলেই মনে করছেন অধিকাংশ ভোটার।