alt

সম্পাদকীয়

মার্কেজের নিঃসঙ্গতা ও সংহতি

অনন্ত মাহফুজ

: সোমবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৩
image

‘নিঃসঙ্গতা’ এই শব্দটি নিঃসঙ্গতার কতটুকু উপস্থাপন করতে পারে? প্রথাগত অর্থে যেভাবে আমরা সাধারণে নিঃসঙ্গতাকে দেখি নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এ তা যেন আমাদের ধারণার বাইরে অন্য কোনো মাত্রা বহন করে। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এ ভয়াবহ এক নিঃসঙ্গতার কথা বলেন। এই নিঃসঙ্গতা আবেগের এবং একই সঙ্গে শারীরিক। বহুল আলোচিত এবং পঠিত এই উপন্যাসের বহুমাত্রিকতার ভিতর নিংসঙ্গতা, সংহতি এবং যৌনতা নানাভাবে নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। নিঃসঙ্গতার বিপরীতে সংহতি বা পারিবারিক এবং সামাজিক বন্ধন সৃষ্টির জন্য নিরন্তর যুদ্ধ করতে দেখা যায় অনেক চরিত্রকে। যৌনতা এখানে কখনো দুটোকে মেলায়, কখনো আলাদা করে; যৌনতা কখনো বন্ধন আবার কখনো নিঃসঙ্গতা। আবার মানুষ একা বা নিঃসঙ্গ থাকতে পারে না- এরকম কথার অনুরণন উপন্যাসের পরতে পরতে। তবু বোয়েন্দিয়া পরিবারের এক শ বছরের জীবন নিঃসঙ্গতায় মোড়ানো।

মাকোন্দো গ্রামের প্রতিষ্ঠাতা জোসে আরকেডিও বোয়েনন্দিয়া সমস্ত নিঃসঙ্গতার প্রতীক হয়ে ওঠে। এবং আমরা দেখে বিস্মিত হই যে, উপন্যাসের শুরুটি হয় এক ধরনের নিঃসঙ্গতা বা বিচ্ছিন্নতা দিয়ে। জোসে আরকেডিও বোয়েনন্দিয়া চিৎকার করে বলে, “এড়ফ ফধসহ রঃ! গধপড়হফড় রং ংঁৎৎড়ঁহফবফ নু ধিঃবৎ ড়হ ধষষ ংরফবং!” পাঠকও নিঃসন্দেহে উপন্যাসের ভিতরে প্রবেশ করে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন পাঠককে বিমোহিত এবং বিমর্ষ করে ফেলা এই উপন্যাসটির শেষে এসে আমাদেরও দাঁড়াবার আর কোনো জায়গা থাকে না। ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড়িয়ে বহু বছর আগের কোনো একদিনের কথা স্মরণ করতে গিয়ে কর্নেল অরেলিয়ানো বোয়েনন্দিয়া মাকোন্দো গ্রামের কথা মনে করে যখন সেই গ্রামে মাত্র বিশটি ঘর ছিল। জোসে আরকেডিও বোয়েনন্দিয়া নির্জনতা খুঁজছিল কারণ তাকে পালাতে হয়েছে। আরকেডিও বোয়েনন্দিয়া পালিয়েছিল কারণ সে প্রুডেন্সিও আগুইলারকে হত্যা করেছিল। আগুইলারের প্রেতাত্মা তাকে তাড়া করে ফিরছিল। সুতরাং তাকে পালাতে হয়। স্ত্রী উরসুলাকে নিয়ে নদীপাড়ের নির্জন মাকোন্দো নামের জায়গায় গড়ে তোলে গ্রাম যা একসময় সমৃদ্ধ জনপেদে পরিণতও হয়।

জোসে আরকেডিও বোয়েন্দিয়া এই উপন্যাসে নিঃসঙ্গতার অপর নাম। প্রতিনিয়ত কিছু একটা আবিষ্কারের নেশায় মত্ত জোসে আরকেডিও বোয়েনন্দিয়া তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, স্ত্রী-পুত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রতি বছর মাকোন্দো গ্রামে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতে আসা জিপসি বা যাযাবরদের বিভিন্ন আবিষ্কার দেখে বিমোহিত হয় সে। জিপসি প্রধান ম্যালকুইদেস এবং সঙ্গে করে নিয়ে আসা বিজ্ঞানের অজানা আবিষ্কার আর জিপসি সর্দার ম্যালকুইদেসের কথা জোসে আরকেডিও বোয়েনন্দিয়াকে সবচেয়ে বেশি আন্দোলিত করে। এটি আরকেডিও বোয়েনন্দিয়ার ভিতর ইমোশনাল আইসোলেশন তৈরি করে। ম্যালকুইদেসের “ঞযরহমং যধাব ধ ষরভব ড়ভ ঃযবরৎ ড়হি” এই কথার নানা মাত্রিকতা জোসে আরকেডিও বোয়েনন্দিয়াকে বিমোহিত করে। নিজের প্রতিষ্ঠিত মাকোন্দো গ্রামে এইভাবে তার নিঃসঙ্গতার শুরু। জিপসিদের নতুন নতুন আবিষ্কার এবং তাতে নিজে এবং সন্তানদের যুক্ত করার ঘোর বিরোধী উরসুলা। এ নিয়ে স্বামীর সাথে তার বিরোধ চলে বটে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে পারে না। জোসে আরকেডিও বোয়েনন্দিয়া আর উরসুলার কন্যা আমারান্তা কিছুটা রোমান্টিকভাবে নিজেকে একা করে রাখে। আমারান্তা বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান অথবা প্রস্তাবে রাজি না হয়ে একাই থেকে যায়। আমৃত্যু সে একা, নিঃসঙ্গ।

একসময় বোয়েন্দিয়া পরিবার নিঃসঙ্গতার আধার হয়ে পড়ে। এই পরিবারের সংস্পর্শে আসা মানুষগুলোও যেন একই পথে হাঁটে। প্রথমে ধরা যাক গণক বা জ্যোতিষী পিলার তারনেরার কথা। বোয়েন্দিয়া পরিবারের কিশোর দুই ছেলের যৌনসঙ্গী তারনেরাও শেষ পর্যন্ত একাই থেকে যায়। বোয়েন্দিয়া পরিবারে অনেকে আশ্রয় পায়। রেমেডিওস মাসকট আরেকজন আউটসাইডার। অরেলিয়ানো বোয়েন্দিয়ার সঙ্গে বিয়ের কিছুদিন পর রেমেডিওসের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে। অরেলিয়ানো বোয়েন্দিয়া জন্মের পর থেকে কোনো এক বিস্ময় নিয়ে বড়ো হয়। অথচ যুদ্ধেও সে নিজেকে গুটিয়ে রাখে নিজের ভিতর। জোসে আরকেডিও বোয়েনন্দিয়ার আরেক ছেলে জোসে আরকেডিও বিয়ে করে রেবেকাকে।

জোসে আরকেডিও বোয়েন্দিয়া এই উপন্যাসে নিঃসঙ্গতার অপর নাম। প্রতিনিয়ত কিছু একটা আবিষ্কারের নেশায় মত্ত জোসে আরকেডিও বোয়েন্দিয়া তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, স্ত্রী-পুত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন

বিয়ের পর কিছু দিন তাদের সুখেও কাটে। জোসে আরকেডিওর হঠাৎ মৃত্যুর পর রেবেকা নিজেকে আলাদা করে স্বেচ্ছা গৃহবন্দী হয় যেন। ঘর থেকে বাইরে আসে না সে। একদিন তার মতো এই বাড়িটিও পচে এবং মানুষের স্মৃতি থেকে মুছেও যায়। রিটা গুইবার্টের সাথে এক সাক্ষাৎকারে মার্কেজ বলেছিলেন, তার প্রথম বই থেকে শেষ বই-এ নিঃসঙ্গতাই একমাত্র বিষয় অর্থাৎ সারাজীবন তিনি নিঃসঙ্গতা নিয়ে লিখেছেন। কোনো কোনো সাহিত্যসমালোচকের মতে, কর্নেল অরেলিয়ানো বোয়েন্দিয়া নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এ সবচেয়ে বড়ো নিঃসঙ্গ চরিত্র।

তার উপন্যাসের চরিত্রগুলো নিঃসঙ্গ। একই বিছানায় ঘুমানো লোকগুলোর মধ্যে একতাবদ্ধতার অভাব। চরিত্রগুলো আত্মমগ্ন। মার্কেজ নিজেও মনে করেন মাকোন্দোর পতন হয়েছে সলিডারিটি বা সংহতির অভাব থেকে। এইসব নিঃসঙ্গতা আর নির্জনতার বিপরীতে পারিবারিক বন্ধন আর সৌহার্দ্যরে প্রতীক হয়ে থাকে উরসুলা। স্বামীর ক্রমবর্ধমান সংসারের বাইরের কাজে মগ্ন থাকা হয়ত তাকে উল্টো গৃহমুখী করেছে। নিজের দুই সন্তানের যৌনসঙ্গী তারনেরার পেটের দুই সন্তান, হঠাৎ তার গৃহে চলে আসা রেবেকা, অরেলিয়ানো বোয়েন্দিয়ার সতেরো সন্তান সবাইকে একসঙ্গে রেখে সংহতির দৃষ্টান্ত হয় উরসুলা। হতে পারে নিঃসঙ্গতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ কোনো না কোনোভাবে নিঃসঙ্গারই জন্ম দেয়।

যৌনতা কি এই উপন্যাসে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া অনুষঙ্গ? এরকম প্রশ্ন অনেকে করে থাকতে পারেন। সেক্সুয়ালিটি বা যৌনতা জীবনের খুব স্বাভাবিক জৈবিকতা। মার্কেজ এই উপন্যাসে, হয়ত এখানে কোনো সন্দেহ নেই, যৌনতাকে নিঃসঙ্গতার বিপরীতে ব্যবহার করেছেন। তবে কি যৌনতা নির্জনতা বা বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তিদাতা? হতে পারে কারণ মানুষের সাথে মানুষের শরীরগত সম্পর্কের মধ্য দিয়ে পারস্পরিক হৃদ্যতা, অনুভূতির ভাগাভাগি এবং সাধারণ চেতনার প্লাটফর্মে দাঁড়ানো সম্ভব। নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এ আছে দুটো ধর্ষণও। ধর্ষণের পক্ষে সামাজিক কিংবা ধর্মীয় কোনো ব্যাখ্যা নেই কোনো সমাজেই। কিন্তু মার্কেজের এই উপন্যাসে দুটো ধর্ষণের মাধ্যমে দুটো সামাজিক বন্ধন তৈরি হয়। জোসে আর্কেডিও বোয়েন্দিয়া, মাকোন্দো জনপদের প্রতিষ্ঠাতা, বংশ পরম্পরার জন্য তার স্ত্রী উরসুলাকে ধর্ষণটি করে। দি¦তীয়, শেষ অরেলিয়ানো ধর্ষণ করে তার খালা আমারান্তা উরসুলাকে। এই দুইজনের মিলনের ফলে শুকরের লেজ নিয়ে ভয়ঙ্কর এক ছেলেশিশুর জন্ম হয়। ফলে স্বাভাবিক যৌনতার পাশাপাশি অজাচার উপন্যাসের আরেকটি শক্ত বিষয় হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। চরিত্র নির্মাণে অজাচার একটি বিশাল ভূমিকা রাখে নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এ। অরেলিয়ানো যদি একাকিত্বে না থাকত, অন্য যে কোনো নারীর সঙ্গে তার স্বাভাবিক সম্পর্ক হতে পারত। অথবা যদি সে জানত আমারান্তা তার খালা, হয়ত সে এই যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকত। নিঃসঙ্গতা বা একাকিত্ব স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনের পথগুলো রুদ্ধ করে দিয়ে অজাচারের রাস্তা বানায়। স্বাভাবিক যোগাযোগের সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করে। জোসে আর্কেডিওর মায়ের প্রতি যৌনানুভূতির বাস্তবিক প্রতিফলন হয় ভবিষ্যৎ-বক্তা পিলার তারনেরার সঙ্গে অসম সম্পর্কের মাধ্যমে। এই দুইজনের বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে আরকেডিওর জন্ম। বড়োভাই কর্নেল অরেলিয়ানো বোয়েন্দিয়ার সাথে পিলার তারনেরার শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে জন্ম নেয় অরেলিয়ানো জোসে। প্রথাগত অর্থে অবৈধ এই দুই সন্তানের দায়িত্ব এসে পড়ে উরসুলার উপর। হয়ত উরসুলাই এই উপন্যাসের একমাত্র এন্টিসলিটারি চরিত্র।

উপন্যাসে অজাচারের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎবাণী প্রচার হয়। চরিত্রগুলোর মধ্যে এ নিয়ে ভীতি বিরাজিত হলেও অগম্যগমনের ঘটনা ঘটে এবং ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। অজাচার বা ইনসেশ্চুয়াল সম্পর্ক পাঠককে ইদিপাস রেক্সের কথাও মনে করিয়ে দেয়। এখানে স্বাভাবিক যৌন সম্পর্ক গতি লাভ করে না। স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্কও নয় কারণ বোয়েন্দিয়াগণ অতিমাত্রিক অন্তর্মুখী এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন।

নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এর জোসে আরকেডিও বোয়েন্দিয়া কিংবা তার প্রতিষ্ঠিত গ্রাম মাকোন্দোর সাথে মহাকাব্যিক এই উপন্যাসের জনক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের যোগসূত্র আবিষ্কার করা বেশ প্রাসঙ্গিক। ১৯৬৭ সালে প্রথম প্রকাশের পর মার্কেজের এই উপন্যাস ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যজগতে ভূমিকম্প ঘটিয়ে দেয়। তৎকালের কলম্বিয়া, মার্কেজের গ্রাম, শৈশব-কৈশোর এবং যৌবন, আর্থ-সামাজিক অবস্থা এসবের কিছু কথা লেখকের এই কর্মটি বুঝতে সহায়তা করে। মার্কেজের জন্ম ১৯২৭ সালের ৬ মার্চ, কলম্বিয়ার আরাকাটাকা গ্রামে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সেই সময়ে বিশ্ব রাজনীতি এক ক্রান্তিকাল পার করছে। সোভিয়েত রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক ধারার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কারণে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সমাজতন্ত্র গোটা ল্যাটিন আমারেকিাকে আলোড়িত করে। মার্কেজের জন্মের এক যুগের মাথায় আবার বিশ্বযুদ্ধ।

মার্কেজের জন্মের পর পিতা গাব্রিয়েল এলিজিও গার্সিয়া ফার্মাসিস্ট হিসাবে চাকরি পান। চাকরি পাবার পর তিনি লুইসা সান্টিয়াগা মার্কেজকে নিয়ে চলে যান বারানকুইলা শহরে। খুব শৈশব থেকে মার্কেজ বড়ো হতে থাকে আরাকাটাকা গ্রামে নানা-নানির কাছে। প্রায় নয় বছর পর অর্থাৎ ১৯৩৬ সালে শিশু মার্কেজ গ্রাম ছেড়ে চলে যায় বারানকুইলা শহরে। বারানকুইলা এখন বিশ্বের অন্যতম আধুনিক শহর। মার্কেজের প্রিয় আরাকাটাকা গ্রামও পরিবর্তিত হতে হতে প্রায় শহরের মতো, আধুনিক জীবনের সব ছোঁয়ালাগা সেই গ্রাম এখন মার্কেজের মতোই পরিচিত। মানুষ বিখ্যাত হলে জায়গাটিও হয়। সম্ভবত খ্যাতির সাথে চলে যায় স্বাভাবিক প্রাকৃতিক স্পর্শটুকু। এই পরিবর্তন ভালো না মন্দ তা অবশ্য বিবেচ্য নয়। নিঃসঙ্গতার এক শ বছর উপন্যাসের মাকোন্দো গ্রামকে কল্পনায় রেখে বর্তমান কলম্বিয়ার আরাকাটাকা গ্রামের তুলনা এখন আর চলবে না। এই গ্রামে বিংশ শতকের গোড়ার দিকে প্রেমে পড়ে গাব্রিয়েল এলিজিও গার্সিয়া নামের এক যুবক আর লুইসা সান্টিয়াগা মার্কেজ নামের এক যুবতী। মার্কেজের নানা এই প্রেম মানতে পারেননি কারণ এলিসিও গার্সিয়া তার দৃষ্টিতে রক্ষণশীল এবং প্রেমিক পুরুষ ধরনের। লুইসাকে দূরে পাঠিয়ে দেওয়ার পর তরুণ এলিসিও অসংখ্য চিঠি, কবিতা এমনকি টেলিগ্রামের মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। অবশেষে তারা জয়ী হন। বাবা-মার প্রেমের এই ট্রাজি-কমিক ঘটনা উঠে এসেছে তার আরেক বিখ্যাত গ্রন্থ লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা উপন্যাসে। এরকম গ্রাম, গ্রামের মানুষ আর শৈশবের হাজারো স্মৃতি নিয়ে মার্কেজ শহরে যান বটে, তবে ফেলে যাওয়া গ্রাম পরম জাদুবাস্তবতায় বিরাজ করে তার বহুল পঠিত এবং ব্যাপক আলোচিত নিঃসঙ্গতার এক শ বছর উপন্যাসে। তবে মাকোন্দো শুধুই কাল্পনিক গ্রাম, নিঃসঙ্গতার এক শ বছর উপন্যাসের কারণে যা এখন বিশ্বময় পরিচিত।

লেখার সব উপাদান পারিপার্শ্বিকতা থেকে আসবে এমনটি ভাবা সমীচীন নয়। তবু হয়ত অনুমান করা যেতে পারে যে শৈশবের নয় বছরের নিঃসঙ্গতার কষ্টবোধ নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এ থাকতে পারে কারণ পিতা এবং মাতার কাছ থেকে প্রায় নয় বছর দূরে ছিলেন মার্কেজ। খুব কাছ থেকে দেখেছেন বাবা এবং মায়ের প্রেমের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া নানা, তার প্রিয় ‘পাপালেলো’। শৈশবের নয় বছর খুব ভালোভাবে প্রভাবিত হয় নানার দ্বারা। নানা বিখ্যাত ‘এক হাজার দিনের যুদ্ধ’-এ অংশ নিয়ে গ্রামের মানুষের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত। ইতিহাস আর বাস্তবতার এক অপরূপ সন্ধি নাতির সামনে উপস্থাপন করেন নানা। ফলে গ্রামের মানুষের হিরো মার্কেজেরও হিরো হয়ে যান। নানাই তাকে শব্দকোষ থেকে শব্দ শেখাতেন, নিয়ে যেতেন সার্কাসে। নানাই তাকে পৃথিবীতে প্রথম ‘মিরাকল’ দেখিয়েছিলেন যা আসলে ছিল এক খ- বরফ। নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এ ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে কর্নেল অরেলিয়ানো বোয়েন্দিয়ার দূর অতীতের এক বিকেলের কথা মনে পড়ে যে বিকেলে তার পিতা তাকে বরফ আবিষ্কার করতে নিয়ে গিয়েছিল। নানার নানান গল্প শৈশবের মার্কেজকে ভাবিয়ে তুলত। নানা প্রায়ই শিশু মার্কেজকে বলতেন, “মৃত মানুষ কতটুকু ভারি হয় তা কী আমরা কেউ কল্পনা করতে পারি।” মানুষ হয়ে মানুষের জীবনহরণের বিরুদ্ধে এর চেয়ে শক্তিশালী কথা আর কী হতে পারে।

মার্কেজের নানার প্রতিচ্ছবি আবিষ্কার করা যেতে পারে কর্নেল অরেলিয়ানো বোয়েন্দিয়ার মাঝে। মার্কেজ তার বন্ধু মেন্ডোজাকে বলেছিলেন, তার নানা কর্নেল তাকে রূপকথার পরিবর্তে যুদ্ধের ভয়াবহ ঘটনা শুনাতেন। তিনি ছিলেন একজন লিবারেল। তার রাজনৈতিক দর্শন সেখান থেকেই গঠিত হতে শুরু করে। মজার বিষয় হচ্ছে মার্কেজের নানি বিশ্বাস করতেন ভূত-প্রেত আর নানা ধরনের অতিপ্রাকৃত বিষয়ে। ধারণা করা হয় মার্কেজের ম্যাজিক রিয়ালিজমের উৎপত্তি ওখানেই। প্রসঙ্গত এখানে বলে রাখা যায় যে, ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ শব্দ দুটি প্রথম তৈরি করেন কিউবার ঔপন্যাসিক আলেজো কারপেন্তিয়ার। নিঃসঙ্গতার এক শ বছর উপন্যাসের বাস্তব স্থান ও কালের সাথে বিভিন্ন অতিপ্রাকৃত ঘটনার সন্নিবেশন করার ভিত্তি তৈরি হয় মার্কেজের নিজের বাড়িতে, নানা আর নানির বিপরীত সহাবস্থানের মাধ্যমে। নানির গল্প বলার অসাধারণ ধরন মার্কেজকে শৈশবে ব্যাপক আলোড়িত করেছিল।

কলম্বিয়ার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনার সময় সাংবাদিকতা দিয়ে মার্কেজের পেশাজীবন শুরু। ১৯৫০ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বারানকুইলা থেকে প্রকাশিত এল হেরাল্ডো পত্রিকায় “সেপ্টিমাস” ছদ্মনামে লিখতেন “হুইমসিক্যাল” নামক কলাম। এ সময় তিনি তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করেন বিভিন্ন দেশি এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্য সংগঠনের সাথে। এটি তাকে বিশ্বসাহিত্য এবং সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচিত করে। ভার্জিনিয়া উলফ এবং উইলিয়াম ফকনারের লেখা উপন্যাস এবং ন্যারিটিভ টেকনিক বা বর্ণনা কৌশল তাকে আলোড়িত করেছিল। বিশেষ করে ফকনারের ঐতিহাসিক থিম এবং গ্রামীণ জনপদ অন্যান্য ল্যাটিন আমেরিকান লেখকদের মতো তাকেও প্রভাবিত করেছিল। ফকনার সৃষ্ট ইয়োকনোপাথাউপা কাউন্টির আদলে মার্কেজ নিঃসঙ্গতার এক শ বছর উপন্যাসে তৈরি করেন মাকোন্দো গ্রাম যাতে তার জন্মস্থান আরাকাটাকা গ্রামের ছোঁয়াও পাওয়া যায়। যাদু আর বাস্তববতার অবিস্মরণীয় এই মাকোন্দো ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে পাঠকের ভিতর। স্বপ্নবাস্তবতার এই গ্রাম পাঠকের আরাধ্য না হলেও মাকোন্দো আমাদের ভিতর জায়গা করে থাকে। ১৯৫৭ সালে মার্কেজ ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে আসেন এল মোমেন্টো পত্রিকায় চাকরি নিয়ে। তার প্রথম উপন্যাস ইন ইভিল আওয়ার প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে।

অনেকে বলে থাকেন বাইবেলের পর সবচেয়ে পঠিত এবং সবচেয়ে বেশি ভাষায় অনূদিত বই আনিওস দে সোলেদাদ বা ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউট । ১৯৬৭ সালে প্রথম প্রকাশের পর তুমুল আলোড়ন তৈরি হয় সারাবিশ্বের সাহিত্যজগতে। সম্ভবত আর কোনো ঔপন্যাসিকের কোনো উপন্যাস নিয়ে এতটা আলোড়ন তৈরি হয়নি। দ্য অটাম অব দি প্যাট্টিয়ার্ক উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ এবং আরেক আলোড়ন তৈরি করা উপন্যাস লাভ ইন দি টাইম অব কলেরা প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। তার লেখা অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে আছে দি জেনারেল ইন হিজ ল্যাবিরিন্থ, অব লাভ এন্ড আদার ডেমনস। উপন্যাস এবং ছোটোগল্পের জন্য ১৯৮২ সালে তাকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয়।

উপন্যাসে অজাচারের বিরুদ্ধে ভবিষ্যদ্বাণী প্রচার হয়। চরিত্রগুলোর মধ্যে এ নিয়ে ভীতি বিরাজিত হলেও অগম্যগমনের ঘটনা ঘটে এবং ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। অজাচার বা ইনসেশ্চুয়াল সম্পর্ক পাঠককে ইদিপাস রেক্সের কথাও মনে করিয়ে দেয়

মাকোন্দো জনপদের এক শ বছরের নিঃসঙ্গতার জীবনগুলো সাধারণ জীবনের বাইরে জীবনের গূঢ় সত্যগুলো তুলে আনে। নিঃসঙ্গতা এখানে কেবল সাধারণ বিচ্ছিন্নতা নয়। নিয়তি এবং কোনো এক অব্যাখ্যায় কারণে তৈরি হওয়া অবসাদ থেকে মনোবিকলনের এক চূড়ান্ত পর্যায়। বিচ্ছিন্ন এই জনপদ নিজেও নিঃসঙ্গ। আর এই নিঃসঙ্গতা জোসে আর্কেডিও বোয়েন্দিয়া থেকে সর্বশেষ বংশধর অরেলিয়ানোর মধ্যে প্রবহমান। “তুমি যদি পাগল হতে চাও হও, দয়া করে সন্তানদের পাগল বানিও না।” From the beginning of the world and forever was branded by the pockmarks of solitude.” এটিই সম্ভবত এই উপন্যাসে নিঃসঙ্গতার অনুভূতির সবচেয়ে বড়ো প্রকাশ।

এখনো কেন চালু হলো না ট্রমা সেন্টার

এত উদ্যোগের পরও অর্থপাচার বাড়ল কীভাবে

চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ড : বিচারে ধীরগতি কেন

অমর একুশে

শিক্ষা ক্যাডারে পদোন্নতি নিয়ে অসন্তোষ কেন

কিশোর গ্যাং কালচারের অবসান ঘটাতে চাই সম্মিলিত প্রচেষ্টা

সরকারি খাল উদ্ধারে ব্যবস্থা নিন

ধীরগতির যানবাহন কেন মহাসড়কে

নদীর দখলদারদের কেন ‘পুরস্কৃত’ করা হবে

ফের ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি

প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় বরফকল কেন

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমে হরিলুট বন্ধ করুন

সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যের ওষুধ কেন মিলছে না

রেলক্রসিং হোক সুরক্ষিত

বিনামূল্যের পাঠ্যবই বিক্রির বিহিত করুন

জিকে সেচ প্রকল্পের খালে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করুন

পোরশার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিন

সাগর-রুনি হত্যার বিচারে আর কত অপেক্ষা

চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু হোক

দেশি পণ্যের জিআই স্বীকৃতির জন্য উদ্যোগী হয়ে কাজ করতে হবে

উখিয়ায় আবাদি ও বনের জমি রক্ষায় ব্যবস্থা নিন

সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারে অনিয়ম-দুর্নীতির অবসান ঘটাতে হবে

একটি পাকা সেতুর জন্য আর কত অপেক্ষা করতে হবে

নির্ভুল জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা কোথায়

পাখির খাদ্য সংকট ও আমাদের দায়

কাবিখা-কাবিটা প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আমলে নিন

কৃষিতে তামাক চাষের ক্ষতিকর প্রভাব

এলপিজি বিক্রি করতে হবে নির্ধারিত দরে

সাঘাটায় বিএমডিএর সেচ সংযোগে ঘুষ দাবি, তদন্ত করুন

সরকারি খাল দখলমুক্ত করুন

সাতক্ষীরার মরিচ্চাপ নদী খননে অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখুন

ব্যাংক খাত সংস্কারের ভালো উদ্যোগ, বাস্তবায়ন জরুরি

ট্রান্সফরমার ও সেচ পাম্প চুরির প্রতিকার চাই

ক্যান্সারের চিকিৎসায় বৈষম্য দূর হোক

মোরেলগঞ্জের ঢুলিগাতি খাল দখলমুক্ত করুন

কর্মসৃজন প্রকল্পে শ্রমিকের মজুরি পরিশোধে বিলম্ব কেন

tab

সম্পাদকীয়

মার্কেজের নিঃসঙ্গতা ও সংহতি

অনন্ত মাহফুজ

image

সোমবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৩

‘নিঃসঙ্গতা’ এই শব্দটি নিঃসঙ্গতার কতটুকু উপস্থাপন করতে পারে? প্রথাগত অর্থে যেভাবে আমরা সাধারণে নিঃসঙ্গতাকে দেখি নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এ তা যেন আমাদের ধারণার বাইরে অন্য কোনো মাত্রা বহন করে। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এ ভয়াবহ এক নিঃসঙ্গতার কথা বলেন। এই নিঃসঙ্গতা আবেগের এবং একই সঙ্গে শারীরিক। বহুল আলোচিত এবং পঠিত এই উপন্যাসের বহুমাত্রিকতার ভিতর নিংসঙ্গতা, সংহতি এবং যৌনতা নানাভাবে নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। নিঃসঙ্গতার বিপরীতে সংহতি বা পারিবারিক এবং সামাজিক বন্ধন সৃষ্টির জন্য নিরন্তর যুদ্ধ করতে দেখা যায় অনেক চরিত্রকে। যৌনতা এখানে কখনো দুটোকে মেলায়, কখনো আলাদা করে; যৌনতা কখনো বন্ধন আবার কখনো নিঃসঙ্গতা। আবার মানুষ একা বা নিঃসঙ্গ থাকতে পারে না- এরকম কথার অনুরণন উপন্যাসের পরতে পরতে। তবু বোয়েন্দিয়া পরিবারের এক শ বছরের জীবন নিঃসঙ্গতায় মোড়ানো।

মাকোন্দো গ্রামের প্রতিষ্ঠাতা জোসে আরকেডিও বোয়েনন্দিয়া সমস্ত নিঃসঙ্গতার প্রতীক হয়ে ওঠে। এবং আমরা দেখে বিস্মিত হই যে, উপন্যাসের শুরুটি হয় এক ধরনের নিঃসঙ্গতা বা বিচ্ছিন্নতা দিয়ে। জোসে আরকেডিও বোয়েনন্দিয়া চিৎকার করে বলে, “এড়ফ ফধসহ রঃ! গধপড়হফড় রং ংঁৎৎড়ঁহফবফ নু ধিঃবৎ ড়হ ধষষ ংরফবং!” পাঠকও নিঃসন্দেহে উপন্যাসের ভিতরে প্রবেশ করে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন পাঠককে বিমোহিত এবং বিমর্ষ করে ফেলা এই উপন্যাসটির শেষে এসে আমাদেরও দাঁড়াবার আর কোনো জায়গা থাকে না। ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড়িয়ে বহু বছর আগের কোনো একদিনের কথা স্মরণ করতে গিয়ে কর্নেল অরেলিয়ানো বোয়েনন্দিয়া মাকোন্দো গ্রামের কথা মনে করে যখন সেই গ্রামে মাত্র বিশটি ঘর ছিল। জোসে আরকেডিও বোয়েনন্দিয়া নির্জনতা খুঁজছিল কারণ তাকে পালাতে হয়েছে। আরকেডিও বোয়েনন্দিয়া পালিয়েছিল কারণ সে প্রুডেন্সিও আগুইলারকে হত্যা করেছিল। আগুইলারের প্রেতাত্মা তাকে তাড়া করে ফিরছিল। সুতরাং তাকে পালাতে হয়। স্ত্রী উরসুলাকে নিয়ে নদীপাড়ের নির্জন মাকোন্দো নামের জায়গায় গড়ে তোলে গ্রাম যা একসময় সমৃদ্ধ জনপেদে পরিণতও হয়।

জোসে আরকেডিও বোয়েন্দিয়া এই উপন্যাসে নিঃসঙ্গতার অপর নাম। প্রতিনিয়ত কিছু একটা আবিষ্কারের নেশায় মত্ত জোসে আরকেডিও বোয়েনন্দিয়া তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, স্ত্রী-পুত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রতি বছর মাকোন্দো গ্রামে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতে আসা জিপসি বা যাযাবরদের বিভিন্ন আবিষ্কার দেখে বিমোহিত হয় সে। জিপসি প্রধান ম্যালকুইদেস এবং সঙ্গে করে নিয়ে আসা বিজ্ঞানের অজানা আবিষ্কার আর জিপসি সর্দার ম্যালকুইদেসের কথা জোসে আরকেডিও বোয়েনন্দিয়াকে সবচেয়ে বেশি আন্দোলিত করে। এটি আরকেডিও বোয়েনন্দিয়ার ভিতর ইমোশনাল আইসোলেশন তৈরি করে। ম্যালকুইদেসের “ঞযরহমং যধাব ধ ষরভব ড়ভ ঃযবরৎ ড়হি” এই কথার নানা মাত্রিকতা জোসে আরকেডিও বোয়েনন্দিয়াকে বিমোহিত করে। নিজের প্রতিষ্ঠিত মাকোন্দো গ্রামে এইভাবে তার নিঃসঙ্গতার শুরু। জিপসিদের নতুন নতুন আবিষ্কার এবং তাতে নিজে এবং সন্তানদের যুক্ত করার ঘোর বিরোধী উরসুলা। এ নিয়ে স্বামীর সাথে তার বিরোধ চলে বটে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে পারে না। জোসে আরকেডিও বোয়েনন্দিয়া আর উরসুলার কন্যা আমারান্তা কিছুটা রোমান্টিকভাবে নিজেকে একা করে রাখে। আমারান্তা বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান অথবা প্রস্তাবে রাজি না হয়ে একাই থেকে যায়। আমৃত্যু সে একা, নিঃসঙ্গ।

একসময় বোয়েন্দিয়া পরিবার নিঃসঙ্গতার আধার হয়ে পড়ে। এই পরিবারের সংস্পর্শে আসা মানুষগুলোও যেন একই পথে হাঁটে। প্রথমে ধরা যাক গণক বা জ্যোতিষী পিলার তারনেরার কথা। বোয়েন্দিয়া পরিবারের কিশোর দুই ছেলের যৌনসঙ্গী তারনেরাও শেষ পর্যন্ত একাই থেকে যায়। বোয়েন্দিয়া পরিবারে অনেকে আশ্রয় পায়। রেমেডিওস মাসকট আরেকজন আউটসাইডার। অরেলিয়ানো বোয়েন্দিয়ার সঙ্গে বিয়ের কিছুদিন পর রেমেডিওসের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে। অরেলিয়ানো বোয়েন্দিয়া জন্মের পর থেকে কোনো এক বিস্ময় নিয়ে বড়ো হয়। অথচ যুদ্ধেও সে নিজেকে গুটিয়ে রাখে নিজের ভিতর। জোসে আরকেডিও বোয়েনন্দিয়ার আরেক ছেলে জোসে আরকেডিও বিয়ে করে রেবেকাকে।

জোসে আরকেডিও বোয়েন্দিয়া এই উপন্যাসে নিঃসঙ্গতার অপর নাম। প্রতিনিয়ত কিছু একটা আবিষ্কারের নেশায় মত্ত জোসে আরকেডিও বোয়েন্দিয়া তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, স্ত্রী-পুত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন

বিয়ের পর কিছু দিন তাদের সুখেও কাটে। জোসে আরকেডিওর হঠাৎ মৃত্যুর পর রেবেকা নিজেকে আলাদা করে স্বেচ্ছা গৃহবন্দী হয় যেন। ঘর থেকে বাইরে আসে না সে। একদিন তার মতো এই বাড়িটিও পচে এবং মানুষের স্মৃতি থেকে মুছেও যায়। রিটা গুইবার্টের সাথে এক সাক্ষাৎকারে মার্কেজ বলেছিলেন, তার প্রথম বই থেকে শেষ বই-এ নিঃসঙ্গতাই একমাত্র বিষয় অর্থাৎ সারাজীবন তিনি নিঃসঙ্গতা নিয়ে লিখেছেন। কোনো কোনো সাহিত্যসমালোচকের মতে, কর্নেল অরেলিয়ানো বোয়েন্দিয়া নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এ সবচেয়ে বড়ো নিঃসঙ্গ চরিত্র।

তার উপন্যাসের চরিত্রগুলো নিঃসঙ্গ। একই বিছানায় ঘুমানো লোকগুলোর মধ্যে একতাবদ্ধতার অভাব। চরিত্রগুলো আত্মমগ্ন। মার্কেজ নিজেও মনে করেন মাকোন্দোর পতন হয়েছে সলিডারিটি বা সংহতির অভাব থেকে। এইসব নিঃসঙ্গতা আর নির্জনতার বিপরীতে পারিবারিক বন্ধন আর সৌহার্দ্যরে প্রতীক হয়ে থাকে উরসুলা। স্বামীর ক্রমবর্ধমান সংসারের বাইরের কাজে মগ্ন থাকা হয়ত তাকে উল্টো গৃহমুখী করেছে। নিজের দুই সন্তানের যৌনসঙ্গী তারনেরার পেটের দুই সন্তান, হঠাৎ তার গৃহে চলে আসা রেবেকা, অরেলিয়ানো বোয়েন্দিয়ার সতেরো সন্তান সবাইকে একসঙ্গে রেখে সংহতির দৃষ্টান্ত হয় উরসুলা। হতে পারে নিঃসঙ্গতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ কোনো না কোনোভাবে নিঃসঙ্গারই জন্ম দেয়।

যৌনতা কি এই উপন্যাসে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া অনুষঙ্গ? এরকম প্রশ্ন অনেকে করে থাকতে পারেন। সেক্সুয়ালিটি বা যৌনতা জীবনের খুব স্বাভাবিক জৈবিকতা। মার্কেজ এই উপন্যাসে, হয়ত এখানে কোনো সন্দেহ নেই, যৌনতাকে নিঃসঙ্গতার বিপরীতে ব্যবহার করেছেন। তবে কি যৌনতা নির্জনতা বা বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তিদাতা? হতে পারে কারণ মানুষের সাথে মানুষের শরীরগত সম্পর্কের মধ্য দিয়ে পারস্পরিক হৃদ্যতা, অনুভূতির ভাগাভাগি এবং সাধারণ চেতনার প্লাটফর্মে দাঁড়ানো সম্ভব। নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এ আছে দুটো ধর্ষণও। ধর্ষণের পক্ষে সামাজিক কিংবা ধর্মীয় কোনো ব্যাখ্যা নেই কোনো সমাজেই। কিন্তু মার্কেজের এই উপন্যাসে দুটো ধর্ষণের মাধ্যমে দুটো সামাজিক বন্ধন তৈরি হয়। জোসে আর্কেডিও বোয়েন্দিয়া, মাকোন্দো জনপদের প্রতিষ্ঠাতা, বংশ পরম্পরার জন্য তার স্ত্রী উরসুলাকে ধর্ষণটি করে। দি¦তীয়, শেষ অরেলিয়ানো ধর্ষণ করে তার খালা আমারান্তা উরসুলাকে। এই দুইজনের মিলনের ফলে শুকরের লেজ নিয়ে ভয়ঙ্কর এক ছেলেশিশুর জন্ম হয়। ফলে স্বাভাবিক যৌনতার পাশাপাশি অজাচার উপন্যাসের আরেকটি শক্ত বিষয় হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। চরিত্র নির্মাণে অজাচার একটি বিশাল ভূমিকা রাখে নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এ। অরেলিয়ানো যদি একাকিত্বে না থাকত, অন্য যে কোনো নারীর সঙ্গে তার স্বাভাবিক সম্পর্ক হতে পারত। অথবা যদি সে জানত আমারান্তা তার খালা, হয়ত সে এই যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকত। নিঃসঙ্গতা বা একাকিত্ব স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনের পথগুলো রুদ্ধ করে দিয়ে অজাচারের রাস্তা বানায়। স্বাভাবিক যোগাযোগের সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করে। জোসে আর্কেডিওর মায়ের প্রতি যৌনানুভূতির বাস্তবিক প্রতিফলন হয় ভবিষ্যৎ-বক্তা পিলার তারনেরার সঙ্গে অসম সম্পর্কের মাধ্যমে। এই দুইজনের বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে আরকেডিওর জন্ম। বড়োভাই কর্নেল অরেলিয়ানো বোয়েন্দিয়ার সাথে পিলার তারনেরার শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে জন্ম নেয় অরেলিয়ানো জোসে। প্রথাগত অর্থে অবৈধ এই দুই সন্তানের দায়িত্ব এসে পড়ে উরসুলার উপর। হয়ত উরসুলাই এই উপন্যাসের একমাত্র এন্টিসলিটারি চরিত্র।

উপন্যাসে অজাচারের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎবাণী প্রচার হয়। চরিত্রগুলোর মধ্যে এ নিয়ে ভীতি বিরাজিত হলেও অগম্যগমনের ঘটনা ঘটে এবং ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। অজাচার বা ইনসেশ্চুয়াল সম্পর্ক পাঠককে ইদিপাস রেক্সের কথাও মনে করিয়ে দেয়। এখানে স্বাভাবিক যৌন সম্পর্ক গতি লাভ করে না। স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্কও নয় কারণ বোয়েন্দিয়াগণ অতিমাত্রিক অন্তর্মুখী এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন।

নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এর জোসে আরকেডিও বোয়েন্দিয়া কিংবা তার প্রতিষ্ঠিত গ্রাম মাকোন্দোর সাথে মহাকাব্যিক এই উপন্যাসের জনক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের যোগসূত্র আবিষ্কার করা বেশ প্রাসঙ্গিক। ১৯৬৭ সালে প্রথম প্রকাশের পর মার্কেজের এই উপন্যাস ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যজগতে ভূমিকম্প ঘটিয়ে দেয়। তৎকালের কলম্বিয়া, মার্কেজের গ্রাম, শৈশব-কৈশোর এবং যৌবন, আর্থ-সামাজিক অবস্থা এসবের কিছু কথা লেখকের এই কর্মটি বুঝতে সহায়তা করে। মার্কেজের জন্ম ১৯২৭ সালের ৬ মার্চ, কলম্বিয়ার আরাকাটাকা গ্রামে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সেই সময়ে বিশ্ব রাজনীতি এক ক্রান্তিকাল পার করছে। সোভিয়েত রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক ধারার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কারণে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সমাজতন্ত্র গোটা ল্যাটিন আমারেকিাকে আলোড়িত করে। মার্কেজের জন্মের এক যুগের মাথায় আবার বিশ্বযুদ্ধ।

মার্কেজের জন্মের পর পিতা গাব্রিয়েল এলিজিও গার্সিয়া ফার্মাসিস্ট হিসাবে চাকরি পান। চাকরি পাবার পর তিনি লুইসা সান্টিয়াগা মার্কেজকে নিয়ে চলে যান বারানকুইলা শহরে। খুব শৈশব থেকে মার্কেজ বড়ো হতে থাকে আরাকাটাকা গ্রামে নানা-নানির কাছে। প্রায় নয় বছর পর অর্থাৎ ১৯৩৬ সালে শিশু মার্কেজ গ্রাম ছেড়ে চলে যায় বারানকুইলা শহরে। বারানকুইলা এখন বিশ্বের অন্যতম আধুনিক শহর। মার্কেজের প্রিয় আরাকাটাকা গ্রামও পরিবর্তিত হতে হতে প্রায় শহরের মতো, আধুনিক জীবনের সব ছোঁয়ালাগা সেই গ্রাম এখন মার্কেজের মতোই পরিচিত। মানুষ বিখ্যাত হলে জায়গাটিও হয়। সম্ভবত খ্যাতির সাথে চলে যায় স্বাভাবিক প্রাকৃতিক স্পর্শটুকু। এই পরিবর্তন ভালো না মন্দ তা অবশ্য বিবেচ্য নয়। নিঃসঙ্গতার এক শ বছর উপন্যাসের মাকোন্দো গ্রামকে কল্পনায় রেখে বর্তমান কলম্বিয়ার আরাকাটাকা গ্রামের তুলনা এখন আর চলবে না। এই গ্রামে বিংশ শতকের গোড়ার দিকে প্রেমে পড়ে গাব্রিয়েল এলিজিও গার্সিয়া নামের এক যুবক আর লুইসা সান্টিয়াগা মার্কেজ নামের এক যুবতী। মার্কেজের নানা এই প্রেম মানতে পারেননি কারণ এলিসিও গার্সিয়া তার দৃষ্টিতে রক্ষণশীল এবং প্রেমিক পুরুষ ধরনের। লুইসাকে দূরে পাঠিয়ে দেওয়ার পর তরুণ এলিসিও অসংখ্য চিঠি, কবিতা এমনকি টেলিগ্রামের মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। অবশেষে তারা জয়ী হন। বাবা-মার প্রেমের এই ট্রাজি-কমিক ঘটনা উঠে এসেছে তার আরেক বিখ্যাত গ্রন্থ লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা উপন্যাসে। এরকম গ্রাম, গ্রামের মানুষ আর শৈশবের হাজারো স্মৃতি নিয়ে মার্কেজ শহরে যান বটে, তবে ফেলে যাওয়া গ্রাম পরম জাদুবাস্তবতায় বিরাজ করে তার বহুল পঠিত এবং ব্যাপক আলোচিত নিঃসঙ্গতার এক শ বছর উপন্যাসে। তবে মাকোন্দো শুধুই কাল্পনিক গ্রাম, নিঃসঙ্গতার এক শ বছর উপন্যাসের কারণে যা এখন বিশ্বময় পরিচিত।

লেখার সব উপাদান পারিপার্শ্বিকতা থেকে আসবে এমনটি ভাবা সমীচীন নয়। তবু হয়ত অনুমান করা যেতে পারে যে শৈশবের নয় বছরের নিঃসঙ্গতার কষ্টবোধ নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এ থাকতে পারে কারণ পিতা এবং মাতার কাছ থেকে প্রায় নয় বছর দূরে ছিলেন মার্কেজ। খুব কাছ থেকে দেখেছেন বাবা এবং মায়ের প্রেমের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া নানা, তার প্রিয় ‘পাপালেলো’। শৈশবের নয় বছর খুব ভালোভাবে প্রভাবিত হয় নানার দ্বারা। নানা বিখ্যাত ‘এক হাজার দিনের যুদ্ধ’-এ অংশ নিয়ে গ্রামের মানুষের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত। ইতিহাস আর বাস্তবতার এক অপরূপ সন্ধি নাতির সামনে উপস্থাপন করেন নানা। ফলে গ্রামের মানুষের হিরো মার্কেজেরও হিরো হয়ে যান। নানাই তাকে শব্দকোষ থেকে শব্দ শেখাতেন, নিয়ে যেতেন সার্কাসে। নানাই তাকে পৃথিবীতে প্রথম ‘মিরাকল’ দেখিয়েছিলেন যা আসলে ছিল এক খ- বরফ। নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এ ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে কর্নেল অরেলিয়ানো বোয়েন্দিয়ার দূর অতীতের এক বিকেলের কথা মনে পড়ে যে বিকেলে তার পিতা তাকে বরফ আবিষ্কার করতে নিয়ে গিয়েছিল। নানার নানান গল্প শৈশবের মার্কেজকে ভাবিয়ে তুলত। নানা প্রায়ই শিশু মার্কেজকে বলতেন, “মৃত মানুষ কতটুকু ভারি হয় তা কী আমরা কেউ কল্পনা করতে পারি।” মানুষ হয়ে মানুষের জীবনহরণের বিরুদ্ধে এর চেয়ে শক্তিশালী কথা আর কী হতে পারে।

মার্কেজের নানার প্রতিচ্ছবি আবিষ্কার করা যেতে পারে কর্নেল অরেলিয়ানো বোয়েন্দিয়ার মাঝে। মার্কেজ তার বন্ধু মেন্ডোজাকে বলেছিলেন, তার নানা কর্নেল তাকে রূপকথার পরিবর্তে যুদ্ধের ভয়াবহ ঘটনা শুনাতেন। তিনি ছিলেন একজন লিবারেল। তার রাজনৈতিক দর্শন সেখান থেকেই গঠিত হতে শুরু করে। মজার বিষয় হচ্ছে মার্কেজের নানি বিশ্বাস করতেন ভূত-প্রেত আর নানা ধরনের অতিপ্রাকৃত বিষয়ে। ধারণা করা হয় মার্কেজের ম্যাজিক রিয়ালিজমের উৎপত্তি ওখানেই। প্রসঙ্গত এখানে বলে রাখা যায় যে, ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ শব্দ দুটি প্রথম তৈরি করেন কিউবার ঔপন্যাসিক আলেজো কারপেন্তিয়ার। নিঃসঙ্গতার এক শ বছর উপন্যাসের বাস্তব স্থান ও কালের সাথে বিভিন্ন অতিপ্রাকৃত ঘটনার সন্নিবেশন করার ভিত্তি তৈরি হয় মার্কেজের নিজের বাড়িতে, নানা আর নানির বিপরীত সহাবস্থানের মাধ্যমে। নানির গল্প বলার অসাধারণ ধরন মার্কেজকে শৈশবে ব্যাপক আলোড়িত করেছিল।

কলম্বিয়ার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনার সময় সাংবাদিকতা দিয়ে মার্কেজের পেশাজীবন শুরু। ১৯৫০ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বারানকুইলা থেকে প্রকাশিত এল হেরাল্ডো পত্রিকায় “সেপ্টিমাস” ছদ্মনামে লিখতেন “হুইমসিক্যাল” নামক কলাম। এ সময় তিনি তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করেন বিভিন্ন দেশি এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্য সংগঠনের সাথে। এটি তাকে বিশ্বসাহিত্য এবং সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচিত করে। ভার্জিনিয়া উলফ এবং উইলিয়াম ফকনারের লেখা উপন্যাস এবং ন্যারিটিভ টেকনিক বা বর্ণনা কৌশল তাকে আলোড়িত করেছিল। বিশেষ করে ফকনারের ঐতিহাসিক থিম এবং গ্রামীণ জনপদ অন্যান্য ল্যাটিন আমেরিকান লেখকদের মতো তাকেও প্রভাবিত করেছিল। ফকনার সৃষ্ট ইয়োকনোপাথাউপা কাউন্টির আদলে মার্কেজ নিঃসঙ্গতার এক শ বছর উপন্যাসে তৈরি করেন মাকোন্দো গ্রাম যাতে তার জন্মস্থান আরাকাটাকা গ্রামের ছোঁয়াও পাওয়া যায়। যাদু আর বাস্তববতার অবিস্মরণীয় এই মাকোন্দো ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে পাঠকের ভিতর। স্বপ্নবাস্তবতার এই গ্রাম পাঠকের আরাধ্য না হলেও মাকোন্দো আমাদের ভিতর জায়গা করে থাকে। ১৯৫৭ সালে মার্কেজ ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে আসেন এল মোমেন্টো পত্রিকায় চাকরি নিয়ে। তার প্রথম উপন্যাস ইন ইভিল আওয়ার প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে।

অনেকে বলে থাকেন বাইবেলের পর সবচেয়ে পঠিত এবং সবচেয়ে বেশি ভাষায় অনূদিত বই আনিওস দে সোলেদাদ বা ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউট । ১৯৬৭ সালে প্রথম প্রকাশের পর তুমুল আলোড়ন তৈরি হয় সারাবিশ্বের সাহিত্যজগতে। সম্ভবত আর কোনো ঔপন্যাসিকের কোনো উপন্যাস নিয়ে এতটা আলোড়ন তৈরি হয়নি। দ্য অটাম অব দি প্যাট্টিয়ার্ক উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ এবং আরেক আলোড়ন তৈরি করা উপন্যাস লাভ ইন দি টাইম অব কলেরা প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। তার লেখা অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে আছে দি জেনারেল ইন হিজ ল্যাবিরিন্থ, অব লাভ এন্ড আদার ডেমনস। উপন্যাস এবং ছোটোগল্পের জন্য ১৯৮২ সালে তাকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয়।

উপন্যাসে অজাচারের বিরুদ্ধে ভবিষ্যদ্বাণী প্রচার হয়। চরিত্রগুলোর মধ্যে এ নিয়ে ভীতি বিরাজিত হলেও অগম্যগমনের ঘটনা ঘটে এবং ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। অজাচার বা ইনসেশ্চুয়াল সম্পর্ক পাঠককে ইদিপাস রেক্সের কথাও মনে করিয়ে দেয়

মাকোন্দো জনপদের এক শ বছরের নিঃসঙ্গতার জীবনগুলো সাধারণ জীবনের বাইরে জীবনের গূঢ় সত্যগুলো তুলে আনে। নিঃসঙ্গতা এখানে কেবল সাধারণ বিচ্ছিন্নতা নয়। নিয়তি এবং কোনো এক অব্যাখ্যায় কারণে তৈরি হওয়া অবসাদ থেকে মনোবিকলনের এক চূড়ান্ত পর্যায়। বিচ্ছিন্ন এই জনপদ নিজেও নিঃসঙ্গ। আর এই নিঃসঙ্গতা জোসে আর্কেডিও বোয়েন্দিয়া থেকে সর্বশেষ বংশধর অরেলিয়ানোর মধ্যে প্রবহমান। “তুমি যদি পাগল হতে চাও হও, দয়া করে সন্তানদের পাগল বানিও না।” From the beginning of the world and forever was branded by the pockmarks of solitude.” এটিই সম্ভবত এই উপন্যাসে নিঃসঙ্গতার অনুভূতির সবচেয়ে বড়ো প্রকাশ।

back to top