লবণ শুধুমাত্র একটি ভোগ্য পণ্য নয়; সমুদ্র উপকূলীয় মানুষের নিকট জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উৎস। লবণ এমন একটি পণ্য যা চাইলেও মানুষ উপেক্ষা করে চলতে পারে না। যেকোনো খাবার তৈরিতে, শিল্পখাতে এবং কোনোকিছুর প্রিজারভেটিভ হিসেবে লবণ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে বিস্তীর্ণ লবণখেতে সূর্যের তাপে সমুদ্রের পানি শুকিয়ে তৈরি হয় সাদা সোনার মতো লবণ। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত হাজারো শ্রমিক ও ক্ষুদ্র চাষি। তবুও আজ দেশীয় লবণ শিল্প নানা সংকটে জর্জরিত।
বাংলাদেশে লবণ প্রধানত দুইভাবে আসে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ লবণ উৎপাদন হয় সমুদ্রের লোনা পানি শুকিয়ে। এ কাজটি বেশি হয় বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম। শুকনো মৌসুমে (নভেম্বর-এপ্রিল) লোনা পানি মাঠে ধরে রোদে শুকিয়ে লবণ তৈরি করা হয়। এই পদ্ধতিকে বলে ‘সোলার সল্ট প্রোডাকশন’। আবার শিল্প কারখানায় পরিশোধনের মাধ্যমেও লবণ এসে থাকে। সমুদ্র থেকে পাওয়া কাঁচা লবণ কারখানায় এনে ধুয়ে, পরিশোধন করে আয়োডিন মিশিয়ে বাজারজাত করা হয়। বাংলাদেশে লবণ উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছে Bangladesh Small and Cottage Industries Corporation (বিসিক)। কখনও দেশে উৎপাদন কম হলে কিছু লবণ বিদেশ থেকেও আমদানি করা হয়।
লবণ উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত কিছু এলাকা রয়েছে। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও পটুয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চল। ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত সৌর বাষ্পীভবন (solar evaporation) ও লিকুইডেশন পদ্ধতিতে সমুদ্রের লোনা পানি থেকে লবণ উৎপাদন করা হয় । এটি দেশের সবচেয়ে বড় শ্রম-নিবিড় কুটির শিল্প। লবণের সিংহভাগ (প্রায় ৯৫% বা তার বেশি) দেশের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল, প্রধানত কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে আসে। এর ওপর নির্ভর করে হাজার হাজার চাষির পরিবার চলে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশীয় লবণশিল্প নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যার আড়ালে বাড়ছে আমদানি নির্ভরতা। যথেষ্ট পরিমাণ লবণ উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও ন্যায্যমূল্যের অভাবে টন টন লবণ মাঠে পড়ে থাকে। যা আমরা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেখিছি। এর মধ্যে আবার লবণ আমদানির ও চেষ্টা করা হয়ে থাকে। এরফলে চাষিদের মাঝে নেমে আসে চরম হতাশা। অন্যদিকে, প্রকৃত ঘাটতির সময় পরিকল্পিত আমদানি অবশ্যই দরকার কিন্তু তা হতে হবে সঠিক তথ্যভিত্তিক ও সময়োপযোগী।
সমস্যা যেহেতু রয়েছে এর সমাধান ও রয়েছে। দেশীয় লবণ শিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন উৎপাদন ও মজুতের নির্ভুল তথ্যভিত্তিক ডাটাবেস তৈরি, চাষিদের জন্য সহজ ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা, আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর বাজার তদারকি, আমদানির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়ন। সরকার, সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই সম্ভাবনাময় খাতকে নতুন প্রাণ দিতে। অন্যথায় আমদানি নির্ভরতার আড়ালে স্থানীয় উৎপাদন সংকট আরও গভীর হবে।
তানিয়া আক্তার
অর্থ-বাণিজ্য: ভরিতে ৩ হাজার ২৩৬ টাকা বাড়লো সোনার দাম
অর্থ-বাণিজ্য: ঈদের ছুটিতে কাস্টম হাউসগুলো খোলা থাকবে