alt

উপ-সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ : লোকসভা নির্বাচন

ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ

: বৃহস্পতিবার, ০৯ মে ২০২৪

ভারতের নির্বাচনী রাজনীতির একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয় ১৯৫২ সালের প্রথম লোকসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এবং ২০১৯ পর্যন্ত ১৭টি জাতীয় এবং ৩৭৬টি রাজ্যসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাছাড়া প্রতি পাঁচ বছর পরপর ২ লাখ ৮০ হাজার গ্রাম পঞ্চায়েত, ৬ হাজার ৬৭২টি মধ্যবর্তী স্তরের ব্লক বা ম-ল পঞ্চায়েত, ৫০০ জেলা পরিষদ ও হাজার হাজার পৌরসভা/ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিন স্তরের গ্রামীণ ও এক স্তরের নগরসভার নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ, যার মধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার নারী। প্রথম সময়কাল ১৯৫২ থেকে ১৯৭৭-এর ২৫ বছর- ‘ক্ষমতাসীনদের কাল’, দ্বিতীয় ‘বিরোধী’দের সময়কাল ১৯৭৭-২০০২ এবং শেষ সময়কাল ধরা হয়েছে ২০০২ ২০১৯, তা হয়তো বর্তমানে ২০২৪ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এ তৃতীয় কালপর্বকে বলা হয়েছে ‘সমভাগী’কাল।

প্রথম কালপর্ব ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামী দল (কংগ্রেস) ও স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাদের শাসনকাল। এ সময়কাল নেহরু ও শাস্ত্রী হয়ে ইন্দিরাতে সমাপ্ত হয়। দ্বিতীয় কালপর্ব একধরনের ‘রাগান্বিত’ ভোটারের উত্থানকাল। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে প্রচ- ক্ষোভ-বিক্ষোভ ভোটবাক্সে প্রভাব ফেলে। তৃতীয় কালপর্ব হয় ‘স্থিতিশীলতা’র এবং বিশেষত রেকর্ডভিত্তিক ভোটাচরণের কাল। এ কালপর্বে কাজের রেকর্ড দেখে মানুষ ভোট দিয়েছেন। এ সময়ে ক্ষমতাসীন থেকে নির্বাচন করে জয়-পরাজয় দুটিই হয়েছে। তাছাড়া ভোট ব্যবস্থাপনা ও ভোটাচরণে লক্ষযোগ্য গুণগত পরিবর্তন হয়েছে। রাজনীতিতে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বেড়েছে। ভোটে উত্তরাধিকার ও পরিবারের প্রভাব ইত্যাদির চেয়ে জীবন জীবিকাভিত্তিক ইস্যু প্রাধান্য পাচ্ছে। সন্ত্রাস ও বুথ দখল হ্রাস পেয়েছে। ১৯৮২-১৯৮৩ সালের পর থেকে ইভিএমের ব্যবহার, নির্বাচনী ব্যয়, ব্যবস্থাপনা ও আস্থা-বিশ্বাসে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ভোটারদের আচরণ ও নেতৃত্বকেও তুলনামূলকভাবে অনেক পরিপক্ব করেছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিকে একটি মর্যাদাশীল অবস্থানে উন্নীত করেছে।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে আগামী পাঁচ বছর কোন দল বা জোট শাসন করবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রবল জল্পনা কল্পনা শুরু হয়ে গেছে। ৯৬ কোটি ৯০ লাখ ভারতীয় নাগরিকের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এবারের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ তথা লোকসভা নির্বাচনের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে। ভারতের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবারের নির্বাচন সাত ধাপে হবে, যেখানে ভারতীয়রা ১৯ এপ্রিল থেকে ১ জুনের মধ্যে ভোটে অংশ নেবেন এবং ৪ জুন ফলাফল ঘোষণার মধ্যে দিয়ে শেষ হবে প্রায় তিন মাস ধরে চলা ভোটের সবচেয়ে বিশাল কর্মযজ্ঞের। ভারতের এই ১৮তম লোকসভা নির্বাচন ইতিহাস গড়তে চলেছে। উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, পূর্বের পাহাড় থেকে পশ্চিমে মরুভূমি, কংক্রিটের জঞ্জাল থেকে ক্ষুদ্রতম গ্রাম পর্যন্ত প্রায় ৯৭ কোটি ভোটার তাদের রায়ে নির্বাচিত করবেন সংসদের নিম্নকক্ষ অর্থাৎ লোকসভার ৫৪৩ জন প্রতিনিধিকে। আর রাষ্ট্রপতির দেয়া দুজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান প্রতিনিধি মিলিয়ে মোট আসন সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৪৫টি। যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন, তাদের হাতেই গঠিত হবে কেন্দ্রীয় সরকার।

ভারতের নির্বাচন বিশাল ও জটিল। এই নির্বাচন অন্য যে কোনো নির্বাচন থেকে আকারে ও আয়োজনে অন্য কোন দেশের নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। ১৬ মার্চ তফসিল ঘোষণার মধ্যে দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করেন দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাজীব কুমার। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন এই বিস্তৃত নির্বাচন কাঠামোগুলো ঠিক করেছে। প্রায় ১৪০ কোটির জনসংখ্যার একটি দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় এবং সর্বোপরি তার সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশন এক তাৎপর্যপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে।

নরেন্দ্র মোদি ভারতের মতো এক বিশাল দেশে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে গত এক দশক ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তবে মোদি সরকার একটি উচ্চবিত্তের বলয় তৈরি করেন যা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অনুরূপ। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রভাবশালী বিত্তবানরাই অতীত বর্তমান ও ভবিষতের কা-ারি হিসেবেই রাষ্ট্র পরিচালনার ভূমিকা পালন করে থাকে। ভারতও প্রায় একই নীতির অনুসারী হয়ে বিভিন্ন শক্তিশালী ও সিন্ডিকেটেড গোষ্ঠীর অনসৃত ধারাকে অনুসরণ করে রাষ্ট্রীয় প্রভাব প্রতিপত্তির বিস্তার লাভে সচেষ্ট থাকেন। এতে যেমন ওই প্রভাবশালী গোষ্ঠী রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃত্ববাদ গ্রুপে পরিণত হয়ে সবসময় সুবিধাভোগী শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত থাকেনÑ প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ গতিপথ ও তাদের হাতের মুঠোয় থাকে। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বর্তমান জোট অনেকটাই নড়বড়ে।

ভারতের এই লোকসভা নির্বাচন বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচন হতে চলেছে। ভারতীয় নির্বাচনের ব্যয় নিয়ে কাজ করা একটি প্রতিষ্ঠানের কর্তা ভাস্করা রাও জানান, ভোটারদের আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে ব্যয় করতে পারেন এক লাখ ২০ হাজার কোটি রুপি বা ১৪ দশমিক চার বিলিয়ন ডলার, যা অনেক দেশের বাজেটের থেকেও বেশি। এবারের নির্বাচনী বাজেট ভারতের ২০১৯ সালের নির্বাচনে ব্যয় থেকে দ্বিগুণ হবে। ২০২৪ সালকে কাকতালীয়ভাবে বলা হচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। কারণ, এই ২০২৪ সালে বিশ্বের প্রায় ৭৪টি দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এসব নির্বাচনে বিশ্বের প্রায় ৪৬ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এসব দেশ আবার বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৫০ শতাংশ জিডিপির জোগান দিয়ে থাকে। কাজেই শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এ বছর বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরত্ব বহন করে। এসব নির্বাচনের ফলে ক্ষমতার পালাবদল হবে ব্যাপকভাবে এবং কোন কোন দেশে ক্ষমতাসীন শক্তির ক্ষমতা আরও সুসংহত হতে পারে। অন্যদিকে ভূরাজনীতি ও বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন এক পরিবর্তনের ঢেউ আসবে যার ধাক্কায় অনেক দেশকেই বেসামাল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। ফলশ্রুতিতে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় এক নবযুগের সূচনা হবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।

লোকসভা নির্বাচন-২০২৪ উপলক্ষে ভারতীয় জনগণসহ বিশ্ববাসীকে নি¤œবর্ণিত প্রশ্নের সম্মুখীন করছে তাৎপর্য ও গুরুত্বের বিবেচনায় ভারতীয় নির্বাচনকে জনগণ কীভাবে দেখছে? লোকসভা নির্বাচনে ভারতের জনগণের ইচ্ছা বা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে কি? ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন ও ভারতীয় রাজনীতি কি কোনো নতুন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে? জাতীয় অখ-তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভারতের জাতীয় পার্টির ভূমিকা কতটা স্বচ্ছ? লোকসভা নির্বাচন-২০২৪ এর ফলাফলে উদারতাবাদ বা রক্ষণশীলতার প্রভাব কতটা প্রতিফলিত হবে? ভারতের জাতীয় নির্বাচনে মোদি কতটা অপরিহার্য বা অপ্রতিরোধ্য? ভারতে মোদিবিরোধী মোর্চা কতটা শক্তিশালী?

স্বেচ্ছাচারিতা, কর্তৃত্ববাদ, সহিংসতা আর স্বার্থপরতামুক্ত সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ আগামী দিনে ভারতের অখ-তারভিতকে আরও শক্ত ও মজবুত করবে। এর অন্যথ ঘটলে দেশের অভ্যন্তরে জাতি জাতিতে, গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে দ্বন্দ্ব, হিংসা ও হানাহানি বাড়বে। কাজেই দেশটির আগামীর নেতৃত্বকে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, সাম্প্রদায়িকতা ও অগণতান্ত্রিকতার বাতাবরণে নিমজ্জিত না হয়ে গণতন্ত্র ও মানবতার ঝা-াকে সমুন্নত রাখতে হবে। তাহলেই সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকা সম্ভব হবে।

[লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

দূর হোক মনের পশুত্ব

মনের পশুত্বের প্রতীকী ত্যাগের আরেক নাম কোরবানি

ঈদে সুস্থ খাদ্যাভ্যাস

এমআইটি : প্রযুক্তির সৃষ্টি রহস্যের খোঁজ

কবিগুরুর বাণী ‘প্রমাণিত মিথ্যা’

কিশোর গ্যাং কালচার বন্ধ হবে কিভাবে

কানিহাটি সিরিজ এবং পঞ্চব্রীহি নিয়ে আরও কিছু কথা

কলকাতায় হিজাব বিতর্ক

বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিয়ে বিতর্ক

হাতের শক্তি ও মহিমা

বাজেট বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ

ছবি

কেন মেঘ আসে হৃদয় আকাশে

সংখ্যালঘুদের সম্পদ লুটেরাদের বিচার কি হবে

বাজেট ভাবনায় শঙ্কিত যারা

মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও বৈষম্যে

জ্ঞানই শক্তি

পরিবেশ নিয়ে কিছু কথা

অগ্নিমূল্যের বাজার : সাধারণ মানুষের স্বস্তি মিলবে কি?

বেসরকারি স্কুল-কলেজ পরিচালনা পর্ষদের নৈরাজ্য

যৌতুক মামলার অপব্যবহার

শহীদের রক্তে লেখা ঐতিহাসিক ছয় দফা

রসে ভরা বাংলাদেশ

সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই

দুর্নীতির উৎসমুখ

কানিহাটি সিরিজের বোরো ধান নিয়ে কিছু কথা

নজিরবিহীন বেনজীর

টেকসই উন্নয়ন করতে হবে প্রকৃতির সঙ্গে সখ্য রেখে আহমদ

কী বার্তা দিল ভারতের সংসদ নির্বাচন

গরমে প্রয়োজন স্বাস্থ্য সচেতনতা

ক্লাইমেট জাস্টিস ফর বাংলাদেশ : শুধু ঋণ বা অনুদান নয়, প্রয়োজন ক্ষতিপূরণ

এখন ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ কী

দুর্নীতি নিয়ে মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া দরকার

গোল্ডেন রাইস কেন বারবার থমকে দাঁড়ায়

প্রাকৃতিক রসগোল্লা

বেড়েই চলেছে জীবনযাত্রার ব্যয়

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস

tab

উপ-সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ : লোকসভা নির্বাচন

ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ

বৃহস্পতিবার, ০৯ মে ২০২৪

ভারতের নির্বাচনী রাজনীতির একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয় ১৯৫২ সালের প্রথম লোকসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এবং ২০১৯ পর্যন্ত ১৭টি জাতীয় এবং ৩৭৬টি রাজ্যসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাছাড়া প্রতি পাঁচ বছর পরপর ২ লাখ ৮০ হাজার গ্রাম পঞ্চায়েত, ৬ হাজার ৬৭২টি মধ্যবর্তী স্তরের ব্লক বা ম-ল পঞ্চায়েত, ৫০০ জেলা পরিষদ ও হাজার হাজার পৌরসভা/ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিন স্তরের গ্রামীণ ও এক স্তরের নগরসভার নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ, যার মধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার নারী। প্রথম সময়কাল ১৯৫২ থেকে ১৯৭৭-এর ২৫ বছর- ‘ক্ষমতাসীনদের কাল’, দ্বিতীয় ‘বিরোধী’দের সময়কাল ১৯৭৭-২০০২ এবং শেষ সময়কাল ধরা হয়েছে ২০০২ ২০১৯, তা হয়তো বর্তমানে ২০২৪ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এ তৃতীয় কালপর্বকে বলা হয়েছে ‘সমভাগী’কাল।

প্রথম কালপর্ব ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামী দল (কংগ্রেস) ও স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাদের শাসনকাল। এ সময়কাল নেহরু ও শাস্ত্রী হয়ে ইন্দিরাতে সমাপ্ত হয়। দ্বিতীয় কালপর্ব একধরনের ‘রাগান্বিত’ ভোটারের উত্থানকাল। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে প্রচ- ক্ষোভ-বিক্ষোভ ভোটবাক্সে প্রভাব ফেলে। তৃতীয় কালপর্ব হয় ‘স্থিতিশীলতা’র এবং বিশেষত রেকর্ডভিত্তিক ভোটাচরণের কাল। এ কালপর্বে কাজের রেকর্ড দেখে মানুষ ভোট দিয়েছেন। এ সময়ে ক্ষমতাসীন থেকে নির্বাচন করে জয়-পরাজয় দুটিই হয়েছে। তাছাড়া ভোট ব্যবস্থাপনা ও ভোটাচরণে লক্ষযোগ্য গুণগত পরিবর্তন হয়েছে। রাজনীতিতে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বেড়েছে। ভোটে উত্তরাধিকার ও পরিবারের প্রভাব ইত্যাদির চেয়ে জীবন জীবিকাভিত্তিক ইস্যু প্রাধান্য পাচ্ছে। সন্ত্রাস ও বুথ দখল হ্রাস পেয়েছে। ১৯৮২-১৯৮৩ সালের পর থেকে ইভিএমের ব্যবহার, নির্বাচনী ব্যয়, ব্যবস্থাপনা ও আস্থা-বিশ্বাসে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ভোটারদের আচরণ ও নেতৃত্বকেও তুলনামূলকভাবে অনেক পরিপক্ব করেছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিকে একটি মর্যাদাশীল অবস্থানে উন্নীত করেছে।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে আগামী পাঁচ বছর কোন দল বা জোট শাসন করবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রবল জল্পনা কল্পনা শুরু হয়ে গেছে। ৯৬ কোটি ৯০ লাখ ভারতীয় নাগরিকের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এবারের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ তথা লোকসভা নির্বাচনের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে। ভারতের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবারের নির্বাচন সাত ধাপে হবে, যেখানে ভারতীয়রা ১৯ এপ্রিল থেকে ১ জুনের মধ্যে ভোটে অংশ নেবেন এবং ৪ জুন ফলাফল ঘোষণার মধ্যে দিয়ে শেষ হবে প্রায় তিন মাস ধরে চলা ভোটের সবচেয়ে বিশাল কর্মযজ্ঞের। ভারতের এই ১৮তম লোকসভা নির্বাচন ইতিহাস গড়তে চলেছে। উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, পূর্বের পাহাড় থেকে পশ্চিমে মরুভূমি, কংক্রিটের জঞ্জাল থেকে ক্ষুদ্রতম গ্রাম পর্যন্ত প্রায় ৯৭ কোটি ভোটার তাদের রায়ে নির্বাচিত করবেন সংসদের নিম্নকক্ষ অর্থাৎ লোকসভার ৫৪৩ জন প্রতিনিধিকে। আর রাষ্ট্রপতির দেয়া দুজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান প্রতিনিধি মিলিয়ে মোট আসন সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৪৫টি। যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন, তাদের হাতেই গঠিত হবে কেন্দ্রীয় সরকার।

ভারতের নির্বাচন বিশাল ও জটিল। এই নির্বাচন অন্য যে কোনো নির্বাচন থেকে আকারে ও আয়োজনে অন্য কোন দেশের নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। ১৬ মার্চ তফসিল ঘোষণার মধ্যে দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করেন দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাজীব কুমার। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন এই বিস্তৃত নির্বাচন কাঠামোগুলো ঠিক করেছে। প্রায় ১৪০ কোটির জনসংখ্যার একটি দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় এবং সর্বোপরি তার সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশন এক তাৎপর্যপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে।

নরেন্দ্র মোদি ভারতের মতো এক বিশাল দেশে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে গত এক দশক ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তবে মোদি সরকার একটি উচ্চবিত্তের বলয় তৈরি করেন যা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অনুরূপ। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রভাবশালী বিত্তবানরাই অতীত বর্তমান ও ভবিষতের কা-ারি হিসেবেই রাষ্ট্র পরিচালনার ভূমিকা পালন করে থাকে। ভারতও প্রায় একই নীতির অনুসারী হয়ে বিভিন্ন শক্তিশালী ও সিন্ডিকেটেড গোষ্ঠীর অনসৃত ধারাকে অনুসরণ করে রাষ্ট্রীয় প্রভাব প্রতিপত্তির বিস্তার লাভে সচেষ্ট থাকেন। এতে যেমন ওই প্রভাবশালী গোষ্ঠী রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃত্ববাদ গ্রুপে পরিণত হয়ে সবসময় সুবিধাভোগী শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত থাকেনÑ প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ গতিপথ ও তাদের হাতের মুঠোয় থাকে। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বর্তমান জোট অনেকটাই নড়বড়ে।

ভারতের এই লোকসভা নির্বাচন বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচন হতে চলেছে। ভারতীয় নির্বাচনের ব্যয় নিয়ে কাজ করা একটি প্রতিষ্ঠানের কর্তা ভাস্করা রাও জানান, ভোটারদের আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে ব্যয় করতে পারেন এক লাখ ২০ হাজার কোটি রুপি বা ১৪ দশমিক চার বিলিয়ন ডলার, যা অনেক দেশের বাজেটের থেকেও বেশি। এবারের নির্বাচনী বাজেট ভারতের ২০১৯ সালের নির্বাচনে ব্যয় থেকে দ্বিগুণ হবে। ২০২৪ সালকে কাকতালীয়ভাবে বলা হচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। কারণ, এই ২০২৪ সালে বিশ্বের প্রায় ৭৪টি দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এসব নির্বাচনে বিশ্বের প্রায় ৪৬ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এসব দেশ আবার বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৫০ শতাংশ জিডিপির জোগান দিয়ে থাকে। কাজেই শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এ বছর বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরত্ব বহন করে। এসব নির্বাচনের ফলে ক্ষমতার পালাবদল হবে ব্যাপকভাবে এবং কোন কোন দেশে ক্ষমতাসীন শক্তির ক্ষমতা আরও সুসংহত হতে পারে। অন্যদিকে ভূরাজনীতি ও বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন এক পরিবর্তনের ঢেউ আসবে যার ধাক্কায় অনেক দেশকেই বেসামাল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। ফলশ্রুতিতে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় এক নবযুগের সূচনা হবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।

লোকসভা নির্বাচন-২০২৪ উপলক্ষে ভারতীয় জনগণসহ বিশ্ববাসীকে নি¤œবর্ণিত প্রশ্নের সম্মুখীন করছে তাৎপর্য ও গুরুত্বের বিবেচনায় ভারতীয় নির্বাচনকে জনগণ কীভাবে দেখছে? লোকসভা নির্বাচনে ভারতের জনগণের ইচ্ছা বা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে কি? ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন ও ভারতীয় রাজনীতি কি কোনো নতুন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে? জাতীয় অখ-তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভারতের জাতীয় পার্টির ভূমিকা কতটা স্বচ্ছ? লোকসভা নির্বাচন-২০২৪ এর ফলাফলে উদারতাবাদ বা রক্ষণশীলতার প্রভাব কতটা প্রতিফলিত হবে? ভারতের জাতীয় নির্বাচনে মোদি কতটা অপরিহার্য বা অপ্রতিরোধ্য? ভারতে মোদিবিরোধী মোর্চা কতটা শক্তিশালী?

স্বেচ্ছাচারিতা, কর্তৃত্ববাদ, সহিংসতা আর স্বার্থপরতামুক্ত সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ আগামী দিনে ভারতের অখ-তারভিতকে আরও শক্ত ও মজবুত করবে। এর অন্যথ ঘটলে দেশের অভ্যন্তরে জাতি জাতিতে, গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে দ্বন্দ্ব, হিংসা ও হানাহানি বাড়বে। কাজেই দেশটির আগামীর নেতৃত্বকে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, সাম্প্রদায়িকতা ও অগণতান্ত্রিকতার বাতাবরণে নিমজ্জিত না হয়ে গণতন্ত্র ও মানবতার ঝা-াকে সমুন্নত রাখতে হবে। তাহলেই সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকা সম্ভব হবে।

[লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

back to top