alt

উপ-সম্পাদকীয়

আদালতের ভেতরে ভিডিও ধারণের আইনি দিক

গাজী তারেক আজিজ

: রোববার, ০৯ মার্চ ২০২৫

অনেক সময় দেখা যায় আদালতের অধিবেশন চলাকালীন অনেক বিচারপ্রার্থী কিংবা সঙ্গে থাকা দর্শনার্থীদের কেউ কেউ অধিবেশন কার্যক্রমের ভিডিও গোপনে ধারণ করে পরে প্রতিপক্ষকে হেনস্তা করে থাকেন। প্রশ্ন হচ্ছে, আদালতের কার্যক্রম কি ছবি তোলা কিংবা ভিডিও ধারণ, কিংবা প্রচারযোগ্য?

এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন বিধিবিধান কোথাও উল্লেখ নেই। তথাপিও কৌতূহলবশত এই কাজটি যে কেউ না কেউ করেন না বা করতে উৎসাহী নয়, তেমনটা নয়। তাহলে কি ছবি তোলা বা ভিডিও ধারণ করা যাবে? তবে তা-ও নয়।

যদি তা-ই হতো তাহলে অতীতে অহরহ তেমনটা দেখতে পাওয়া যেত। তাই বলে আদালতের বিচার-প্রক্রিয়া বা বিচারকাজ কি সংরক্ষিত কিছু? যদিও তা নয়। কিন্তু অতীতে আমাদের দেখা হয়েছে কখনো কেউ ভিডিও করলে তা আদালতের নজরে এলে, মোবাইল বা যে কোন ডিভাইস থেকে ডিলিট করে দেয়ার বিষয়টি। কিন্তু কার্যত আদালত এজলাস পাবলিক প্লেস হওয়ায় ভিডিও কিংবা ছবি তোলা যাবে না, তা একবাক্যে বলে দেয়া যায় না।

কিন্তু এ বিষয়ে একটি মামলার রেফারেন্স হিসেবে দেয়া যেতে পারে। তা হলো- দেশের বহুল প্রচারিত দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকায় গত ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর তারিখে একটি সংবাদ প্রচার হয়। যাতে শিরোনাম করা হয়, আদালতের বিচার কার্যক্রমের ভিডিও ধারণ করায় একজনের দ- উক্ত প্রতিবেদনের বিবরণ থেকে জানা যায়, মৌলভীবাজারে বিচারকাজ চলাকালে মোবাইলে আদালতের কার্যক্রম ভিডিও করার সময় একজনকে আটক করা হয়।

বিনা অনুমতিতে আদালতের কার্যক্রম ভিডিও করার দায়ে দুইশ টাকা অর্থদ-, অনাদায়ে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদ-ে দ-িত করেন বিচারক। মৌলভীবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, ২য় আদালতে ৩ ডিসেম্বর এ ঘটনা ঘটে। দ-িত ব্যক্তির নাম মামুন আহমেদ, পিতা- দিলুমিয়া, মাতা-পারুল বেগম, সাং- উত্তরখলগাঁও, দক্ষিণভাগ, ডাক-করিমপুর, থানা-রাজনগর, জেলা- মৌলভীবাজার। আদালত সূত্রে জানা গেছে, দুপুর ২টার দিকে মৌলভীবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, ২য় আদালতে একটি মামলায় মেহেদী হাসান নামীয় একজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ চলছিল। এ সময় তার ভাগিনা মামুন আহমেদ মোবাইলে

আদালতের কার্যক্রম ভিডিও করতে দেখা যায়। বিষয়টি আদালতের সহায়ক কর্মচারী বিচারক এম মিজবাহ-উর-রহমানের নজরে বিচারক নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত পুলিশ সদস্যকে ওই ব্যক্তিকে আটক করার নির্দেশ প্রদান করেন। আটক ব্যক্তির হাতে থাকা রেডমি ব্রান্ডের মোবাইলে আদালতের কার্যক্রম ভিডিও করার সত্যতা প্রাপ্ত হন। পরে আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদে সে তার নাম-ঠিকানা প্রকাশ করে। আটককৃত ব্যক্তি মামুন আহমেদের ওই কর্মকা-ের কারণে বিচারিক কার্যক্রমের বাধা সৃষ্টি হওয়ায় এবং বিনা অনুমতিতে আদালতের কার্যক্রম মোবাইল ফোনে ভিডিও করায় আদালতের প্রতি ইচ্ছাকৃতভাবে অশ্রদ্ধা প্রদর্শিত হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাকে তার অপরাধ পেনাল কোড-১৮৬০ এর ২২৮ ধারায় গণ্য করে ফৌজদারি কার্যবিধির-১৮৯৮ এর ৪৮০ ধারানুযায়ী ২০০/- টাকা অর্থদ- অনাদায়ে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদ-ে দ-িত করেন।

উপরিউক্ত প্রতিবেদন এবং আইন বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট হয় যে, যদি বিচারক মনে করেন, তবেই তেমন আদেশ দিতে পারেন। এক্ষেত্রে ভিডিও ধারণ ব্যতিরেকে অন্য যেকোন বিষয়েও দেয়ার সুযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট আইনটিতে। তাহলে একটা বিষয় পরিষ্কার হয় যে, ভিডিও ধারণ কিংবা ছবি তোলাই মুখ্য বিষয় না-ও থাকতে পারে।

এবার আসা যাক সংশ্লিষ্ট আইনটিতে কি ব্যাখ্যা দেয়া রয়েছে, দ-বিধির ২২৮ ধারা অনুযায়ী বিচার বিভাগীয় কাজ পরিচালনায় আসীন সরকারি কর্মচারীকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান বা বাধা প্রদান করা কোন সরকারি কর্মচারী কোন বিচার বিভাগীয় কার্যক্রমের যেকোন পর্যায়ে নিয়ত থাকাকালে কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে অপমান করে বা তার কাজে বাধা প্রদান করে, তবে সে ব্যক্তি ছয় মাস পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের বিনাশ্রম কারাদ-ে অথবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত যেকোন পরিমাণ অর্থদ-ে, অথবা উভয়বিধ দ-েই দ-িত হবে।

মৌলভীবাজার জেলার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অধীনস্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ২য় আদালতের বিজ্ঞ বিচারক ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮০ ধারা অনুযায়ী অভিযুক্তকে ২০০ টাকা অর্থদ- অনাদায়ে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদ- দিয়ে আদেশ প্রদান করেন। তাহলে এবার আসা যাক, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮০ ধারায় কী বলা রয়েছে, বলা হয়েছে অবমাননার কতিপয় ক্ষেত্রে পদ্ধতি:

(১) কোন দেওয়ানি, ফৌজদারি বা রাজস্ব আদালতের দৃষ্টি গোচরে বা উপস্থিতিতে দ-বিধির ১৭৫, ১৭৮, ১৭৯, ১৮০ বা ২২৮ ধারায় বর্ণিত কোন অপরাধ করা হলে উক্ত আদালত অপরাধীকে হাজতে আটক রাখার ব্যবস্থা করতে পারবেন এবং ওইদিন আদালতের অধিবেশন শেষ হওয়ার পূর্বে যেকোন সময় উপযুক্ত মনে করলে অপরাধটি আমলে নিতে পারবেন এবং অপরাধীকে অনধিক দুইশ টাকা অর্থদ-ে এবং যথাশীঘ্র জরিমানার টাকা প্রদান করা না হলে এক মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদ-ে দ-িত করতে পারবেন।

এই প্রসঙ্গে অল ইন্ডিয়া রিপোর্টে রুলিং থেকে জানা যায় যে, (১) এই ধারার অধীনে মামলার কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে না ৪৭৬ ধারার অধীনে মামলার কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে তা বেছে নেয়া আদালতের ক্ষমতা রয়েছে। [অওজ ১৯৫৯ অষষ ৬৯৩] (২) লক্ষ্য করার বিষয় এ যে কেবল সেসব অবমাননারই এই ধারায় বিচারের বিধান আছে যা আদালতের সামনে বা উপস্থিতিতেই সংঘটিত হয়। যদিও অন্য রকম অবমাননার অপরাধ, আদালত অবমাননা আইন (১৯২৬ সনের ১২নং আইন) অনুসারে বিচার্য।

যদিও ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫২ধারার বিধান মতে স্পষ্ট করা হয়েছে, আদালত উন্মুক্ত থাকবে:

কোন অপরাধের তদন্ত বা বিচারের উদ্দেশ্যে যে স্থানে কোন ফৌজদারি আদালতের অধিবেশন সেই স্থানকে উন্মুক্ত আদালত বলে গণ্য করতে হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সেখানে সুবিধাজনক স্থান সংকুলান হয় ততক্ষণ পর্যন্ত সেখানে প্রবেশাধিকার থাকতে পারে সর্বসাধারণের তবে শর্ত এই যে, প্রিসাইডিং জজ বা ম্যাজিস্ট্রেট উপযুক্ত মনে করলে কোন বিশেষ মামলার অনুসন্ধান বা বিচারের যেকোন পর্যায়ে আদেশ দিতে পারবেন যে, সর্ব সাধারণ বা কোন বিশেষ ব্যক্তি আদালত কর্তৃক ব্যবহৃত কক্ষ বা ভবনে প্রবেশ করতে বা তথায় অবস্থান করতে পারবে না। এ থেকে বোঝা যায় আদালত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা বলা হয়ে। কিছু বিষয়ে আদালতের বিচারক মনে করলে কোন ব্যক্তিবিশেষের প্রতি আদেশ দিতে পারেন, যিনি আদালত কক্ষে থাকা না থাকা বিষয়ে, তবে তা সার্বজনীন নয়। এর ব্যতিক্রম হিসেবেও উচ্চ আদালতের কিছু রুলিং রয়েছে; যা নিম্নরূপ-

(১) আদালত কর্তৃক জনসাধারণ এবং আইনজীবীদের (যারা মামলার সাথে জড়িত নয়) আদালত কক্ষে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে এই ধারার উদ্দেশ্য পূরণকল্পে ইহা কোন বাধা নয় [১৮ উখজ ১৫৪ ডচ]

(২) ম্যাজিস্ট্রেট আদালত কক্ষ ছাড়া অন্যত্র বিচার কাজ সম্পন্ন করতে পারেন; তবে সেক্ষেত্রে বিচারের স্থানটিকে ঘোষণা দ্বারা একটি আনুষ্ঠানিক বিচারের স্থান বলে পূর্বাহ্নে চিহ্নিত করতে হবে। [২১ উখজ ৩১০] আমরা মিডিয়ার বরাতে জানতে পেরেছি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যার অভিযোগে আনীত মামলায় বিচারকাজ চলাকালীন সময়ে টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। যা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন। যদি সেদিক থেকেও ধরে নেই, তাহলে এটা স্পষ্ট হয় যে, আদালতের কার্যক্রম ভিডিও করা বে-আইনি তো নয়ই, কোথাও কোন আইন দ্বারা বারিত থাকারও কারণ নেই। আরও একটা বিষয় লক্ষণীয় হচ্ছে, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের আপিলেট ডিভিশনের এজলাসের অভ্যন্তরেও সিসি ক্যামেরা বসানো রয়েছে। এদিক থেকে ধরে নিলে বলা যায়, ভিডিও ধারণে বাধা নেই। তবে, সেই সিসিটিভি ক্যামেরা সম্প্রচারের জন্য নয়। উক্ত ক্যামেরা শুধু ভিডিও রেকর্ড করে ধারণ করে না। এই রেকর্ড একটা স্টোরেজে (ডিভিআর) এ সুনির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকে। এই ক্যামেরা সরাসরি কেউ অপারেট করে না। যদিও সারাদেশে আদালত অঙ্গনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপিত রয়েছে। দেশের অনেক নিম্ন আদালতেও সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। তবে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলিকাতা হাইকোর্ট এজলাসের অভ্যন্তরীণ ক্যামেরা থেকে অধিবেশন চলাকালীন ধারণ

ও সম্প্রচার বিভিন্ন মাধ্যমে দেখতে পাওয়া যায়। তাহলে একটা বিষয় স্পষ্ট হয় যে, প্রকাশ্য কিংবা গোপনে ভিডিও ধারণে বাধানিষেধ যেমন নেই, তেমনি ধারণ করার কথাও বলা হয়নি কোথাও।

পরিশেষে, একটা বিষয় হচ্ছে, বর্তমান এআইয়ের যুগে বিশ্ব যেমন এগিয়ে চলেছে, তেমনি বাংলাদেশও সমানতালে এগিয়ে যাবে প্রত্যাশা করি। যেমন, করোনা মহামারীর সময়কালে আইনে না থাকলেও দেখেছি প্রযুক্তির উৎকর্ষ কাজে লাগিয়ে ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। যাতে জামিনসহ গুরুত্বপূর্ণ শুনানি যেমন হয়েছে, তেমনি রিমান্ড শুনানির মতো শুনানিও খাস কামরায় বসে বিচারক শুনেছেন, আইনজীবী চেম্বারে বসে শুনানি করেছেন আর আসামি জেলখানায় থেকে অংশ নিয়েছেন। সেটা যেমন করে সম্ভয় হয়েছে তেমনি করে, বিশেষ চাঞ্চল্যকর মামলার শুনানি ডিসপ্লেতে দেখানোর ব্যবস্থা করা গেলে এর ক্ষতি নেই বরং মানুষ দেখে শিক্ষা নিতে পারে।

[লেখক : অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ফেনী]

শুভ-অশুভ বলে কিছু কি আছে

পহেলা বৈশাখের সঙ্গে মিশে আছে কৃষি ও কৃষক

বাংলাদেশে ঘটনা অঘটন: প্রায় সবক্ষেত্রেই ইস্যু নির্বাচন

ছবি

নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও বহুত্ববাদ

বৈসাবি : সম্মিলনের জাতীয় উৎসব

সংকট ও সংক্রান্তির শক্তি

ছবি

গাজার অশ্রু : ইসরায়েলের বর্বরতা ও বিশ্বের নীরবতা

দেশের কৃষি অর্থনীতির নীরব নায়িকারা

বহুমাত্রিক দ্বন্দ্বের ফেরে বিএনপি ও এনসিপি

ফৌজদারি মামলায় অপরাধের আলামত উদ্ধারে আইন মানতে বাধা কোথায়?

জলবায়ুর নতুন ছকে বদলে যাচ্ছে কৃষির ভবিষ্যৎ

ভারতে ওয়াকফ সংশোধনী আইন নিয়ে বিতর্ক

কীটনাশকের বিষচক্র : উন্নয়নের নামে শোষণ ও বিপর্যয়

বোরো ধান উৎপাদনে প্রধান অন্তরায় বিদ্যুৎ-বিভ্রাট

ঢাকার বাসিন্দাদের নিঃশ্বাসে এক বিপন্নতা

‘রিফাইন্ড’ আওয়ামী লীগ হলে ‘ওয়াশিং মেশিন পার্টি’ বেকার হয়ে পড়বে না তো!

গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে সংক্ষুব্ধ ‘আমরা’ কারা?

বাসন্তী পূজা

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস : বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার চিত্র

মার্কিন নীতির পরিবর্তনে ইউক্রেনের পরিণতি

গাজা : ক্রমবর্ধমান মানবিক ও রাজনৈতিক সংকট

নিষিদ্ধ পলিথিনে বিপন্ন প্রকৃতি

রাজনৈতিক রূপান্তরের এক সতর্কবার্তা

ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াই : আইনের শক্তি ও সমাজের দুর্বলতা

বৈষম্যমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে গণমুখী শিক্ষা

ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে ভারতকে বাঁচাতে বাম উদ্যোগ

ছবি

পিরোজপুরের ডিসিকে হারিয়ে দিলেন লালমনিরহাটের ডিসি!

জমি-জমার রেকর্ড সংশোধনে নতুন পরিপত্র ও প্রাসঙ্গিক আইন

র্অথনতৈকি উন্নয়নে জাকাতরে ভূমকিা

কবে মিলবে নতুন নোট

আইনস্টাইনের দেশে

আওয়ামী লীগ থেকে অন্য দলগুলো কি শিক্ষা গ্রহণ করবে?

আজি নূতন রতনে ভূষণে যতনে...

ঈদে বাড়ি ফেরা নিরাপদ হোক

পেঁয়াজের আদ্যোপান্ত

রঙ্গব্যঙ্গ : ‘প্রতিধ্বনি শুনি আমি, প্রতিধ্বনি শুনি...’

tab

উপ-সম্পাদকীয়

আদালতের ভেতরে ভিডিও ধারণের আইনি দিক

গাজী তারেক আজিজ

রোববার, ০৯ মার্চ ২০২৫

অনেক সময় দেখা যায় আদালতের অধিবেশন চলাকালীন অনেক বিচারপ্রার্থী কিংবা সঙ্গে থাকা দর্শনার্থীদের কেউ কেউ অধিবেশন কার্যক্রমের ভিডিও গোপনে ধারণ করে পরে প্রতিপক্ষকে হেনস্তা করে থাকেন। প্রশ্ন হচ্ছে, আদালতের কার্যক্রম কি ছবি তোলা কিংবা ভিডিও ধারণ, কিংবা প্রচারযোগ্য?

এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন বিধিবিধান কোথাও উল্লেখ নেই। তথাপিও কৌতূহলবশত এই কাজটি যে কেউ না কেউ করেন না বা করতে উৎসাহী নয়, তেমনটা নয়। তাহলে কি ছবি তোলা বা ভিডিও ধারণ করা যাবে? তবে তা-ও নয়।

যদি তা-ই হতো তাহলে অতীতে অহরহ তেমনটা দেখতে পাওয়া যেত। তাই বলে আদালতের বিচার-প্রক্রিয়া বা বিচারকাজ কি সংরক্ষিত কিছু? যদিও তা নয়। কিন্তু অতীতে আমাদের দেখা হয়েছে কখনো কেউ ভিডিও করলে তা আদালতের নজরে এলে, মোবাইল বা যে কোন ডিভাইস থেকে ডিলিট করে দেয়ার বিষয়টি। কিন্তু কার্যত আদালত এজলাস পাবলিক প্লেস হওয়ায় ভিডিও কিংবা ছবি তোলা যাবে না, তা একবাক্যে বলে দেয়া যায় না।

কিন্তু এ বিষয়ে একটি মামলার রেফারেন্স হিসেবে দেয়া যেতে পারে। তা হলো- দেশের বহুল প্রচারিত দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকায় গত ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর তারিখে একটি সংবাদ প্রচার হয়। যাতে শিরোনাম করা হয়, আদালতের বিচার কার্যক্রমের ভিডিও ধারণ করায় একজনের দ- উক্ত প্রতিবেদনের বিবরণ থেকে জানা যায়, মৌলভীবাজারে বিচারকাজ চলাকালে মোবাইলে আদালতের কার্যক্রম ভিডিও করার সময় একজনকে আটক করা হয়।

বিনা অনুমতিতে আদালতের কার্যক্রম ভিডিও করার দায়ে দুইশ টাকা অর্থদ-, অনাদায়ে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদ-ে দ-িত করেন বিচারক। মৌলভীবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, ২য় আদালতে ৩ ডিসেম্বর এ ঘটনা ঘটে। দ-িত ব্যক্তির নাম মামুন আহমেদ, পিতা- দিলুমিয়া, মাতা-পারুল বেগম, সাং- উত্তরখলগাঁও, দক্ষিণভাগ, ডাক-করিমপুর, থানা-রাজনগর, জেলা- মৌলভীবাজার। আদালত সূত্রে জানা গেছে, দুপুর ২টার দিকে মৌলভীবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, ২য় আদালতে একটি মামলায় মেহেদী হাসান নামীয় একজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ চলছিল। এ সময় তার ভাগিনা মামুন আহমেদ মোবাইলে

আদালতের কার্যক্রম ভিডিও করতে দেখা যায়। বিষয়টি আদালতের সহায়ক কর্মচারী বিচারক এম মিজবাহ-উর-রহমানের নজরে বিচারক নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত পুলিশ সদস্যকে ওই ব্যক্তিকে আটক করার নির্দেশ প্রদান করেন। আটক ব্যক্তির হাতে থাকা রেডমি ব্রান্ডের মোবাইলে আদালতের কার্যক্রম ভিডিও করার সত্যতা প্রাপ্ত হন। পরে আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদে সে তার নাম-ঠিকানা প্রকাশ করে। আটককৃত ব্যক্তি মামুন আহমেদের ওই কর্মকা-ের কারণে বিচারিক কার্যক্রমের বাধা সৃষ্টি হওয়ায় এবং বিনা অনুমতিতে আদালতের কার্যক্রম মোবাইল ফোনে ভিডিও করায় আদালতের প্রতি ইচ্ছাকৃতভাবে অশ্রদ্ধা প্রদর্শিত হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাকে তার অপরাধ পেনাল কোড-১৮৬০ এর ২২৮ ধারায় গণ্য করে ফৌজদারি কার্যবিধির-১৮৯৮ এর ৪৮০ ধারানুযায়ী ২০০/- টাকা অর্থদ- অনাদায়ে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদ-ে দ-িত করেন।

উপরিউক্ত প্রতিবেদন এবং আইন বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট হয় যে, যদি বিচারক মনে করেন, তবেই তেমন আদেশ দিতে পারেন। এক্ষেত্রে ভিডিও ধারণ ব্যতিরেকে অন্য যেকোন বিষয়েও দেয়ার সুযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট আইনটিতে। তাহলে একটা বিষয় পরিষ্কার হয় যে, ভিডিও ধারণ কিংবা ছবি তোলাই মুখ্য বিষয় না-ও থাকতে পারে।

এবার আসা যাক সংশ্লিষ্ট আইনটিতে কি ব্যাখ্যা দেয়া রয়েছে, দ-বিধির ২২৮ ধারা অনুযায়ী বিচার বিভাগীয় কাজ পরিচালনায় আসীন সরকারি কর্মচারীকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান বা বাধা প্রদান করা কোন সরকারি কর্মচারী কোন বিচার বিভাগীয় কার্যক্রমের যেকোন পর্যায়ে নিয়ত থাকাকালে কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে অপমান করে বা তার কাজে বাধা প্রদান করে, তবে সে ব্যক্তি ছয় মাস পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের বিনাশ্রম কারাদ-ে অথবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত যেকোন পরিমাণ অর্থদ-ে, অথবা উভয়বিধ দ-েই দ-িত হবে।

মৌলভীবাজার জেলার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অধীনস্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ২য় আদালতের বিজ্ঞ বিচারক ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮০ ধারা অনুযায়ী অভিযুক্তকে ২০০ টাকা অর্থদ- অনাদায়ে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদ- দিয়ে আদেশ প্রদান করেন। তাহলে এবার আসা যাক, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮০ ধারায় কী বলা রয়েছে, বলা হয়েছে অবমাননার কতিপয় ক্ষেত্রে পদ্ধতি:

(১) কোন দেওয়ানি, ফৌজদারি বা রাজস্ব আদালতের দৃষ্টি গোচরে বা উপস্থিতিতে দ-বিধির ১৭৫, ১৭৮, ১৭৯, ১৮০ বা ২২৮ ধারায় বর্ণিত কোন অপরাধ করা হলে উক্ত আদালত অপরাধীকে হাজতে আটক রাখার ব্যবস্থা করতে পারবেন এবং ওইদিন আদালতের অধিবেশন শেষ হওয়ার পূর্বে যেকোন সময় উপযুক্ত মনে করলে অপরাধটি আমলে নিতে পারবেন এবং অপরাধীকে অনধিক দুইশ টাকা অর্থদ-ে এবং যথাশীঘ্র জরিমানার টাকা প্রদান করা না হলে এক মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদ-ে দ-িত করতে পারবেন।

এই প্রসঙ্গে অল ইন্ডিয়া রিপোর্টে রুলিং থেকে জানা যায় যে, (১) এই ধারার অধীনে মামলার কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে না ৪৭৬ ধারার অধীনে মামলার কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে তা বেছে নেয়া আদালতের ক্ষমতা রয়েছে। [অওজ ১৯৫৯ অষষ ৬৯৩] (২) লক্ষ্য করার বিষয় এ যে কেবল সেসব অবমাননারই এই ধারায় বিচারের বিধান আছে যা আদালতের সামনে বা উপস্থিতিতেই সংঘটিত হয়। যদিও অন্য রকম অবমাননার অপরাধ, আদালত অবমাননা আইন (১৯২৬ সনের ১২নং আইন) অনুসারে বিচার্য।

যদিও ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫২ধারার বিধান মতে স্পষ্ট করা হয়েছে, আদালত উন্মুক্ত থাকবে:

কোন অপরাধের তদন্ত বা বিচারের উদ্দেশ্যে যে স্থানে কোন ফৌজদারি আদালতের অধিবেশন সেই স্থানকে উন্মুক্ত আদালত বলে গণ্য করতে হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সেখানে সুবিধাজনক স্থান সংকুলান হয় ততক্ষণ পর্যন্ত সেখানে প্রবেশাধিকার থাকতে পারে সর্বসাধারণের তবে শর্ত এই যে, প্রিসাইডিং জজ বা ম্যাজিস্ট্রেট উপযুক্ত মনে করলে কোন বিশেষ মামলার অনুসন্ধান বা বিচারের যেকোন পর্যায়ে আদেশ দিতে পারবেন যে, সর্ব সাধারণ বা কোন বিশেষ ব্যক্তি আদালত কর্তৃক ব্যবহৃত কক্ষ বা ভবনে প্রবেশ করতে বা তথায় অবস্থান করতে পারবে না। এ থেকে বোঝা যায় আদালত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা বলা হয়ে। কিছু বিষয়ে আদালতের বিচারক মনে করলে কোন ব্যক্তিবিশেষের প্রতি আদেশ দিতে পারেন, যিনি আদালত কক্ষে থাকা না থাকা বিষয়ে, তবে তা সার্বজনীন নয়। এর ব্যতিক্রম হিসেবেও উচ্চ আদালতের কিছু রুলিং রয়েছে; যা নিম্নরূপ-

(১) আদালত কর্তৃক জনসাধারণ এবং আইনজীবীদের (যারা মামলার সাথে জড়িত নয়) আদালত কক্ষে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে এই ধারার উদ্দেশ্য পূরণকল্পে ইহা কোন বাধা নয় [১৮ উখজ ১৫৪ ডচ]

(২) ম্যাজিস্ট্রেট আদালত কক্ষ ছাড়া অন্যত্র বিচার কাজ সম্পন্ন করতে পারেন; তবে সেক্ষেত্রে বিচারের স্থানটিকে ঘোষণা দ্বারা একটি আনুষ্ঠানিক বিচারের স্থান বলে পূর্বাহ্নে চিহ্নিত করতে হবে। [২১ উখজ ৩১০] আমরা মিডিয়ার বরাতে জানতে পেরেছি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যার অভিযোগে আনীত মামলায় বিচারকাজ চলাকালীন সময়ে টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। যা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন। যদি সেদিক থেকেও ধরে নেই, তাহলে এটা স্পষ্ট হয় যে, আদালতের কার্যক্রম ভিডিও করা বে-আইনি তো নয়ই, কোথাও কোন আইন দ্বারা বারিত থাকারও কারণ নেই। আরও একটা বিষয় লক্ষণীয় হচ্ছে, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের আপিলেট ডিভিশনের এজলাসের অভ্যন্তরেও সিসি ক্যামেরা বসানো রয়েছে। এদিক থেকে ধরে নিলে বলা যায়, ভিডিও ধারণে বাধা নেই। তবে, সেই সিসিটিভি ক্যামেরা সম্প্রচারের জন্য নয়। উক্ত ক্যামেরা শুধু ভিডিও রেকর্ড করে ধারণ করে না। এই রেকর্ড একটা স্টোরেজে (ডিভিআর) এ সুনির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকে। এই ক্যামেরা সরাসরি কেউ অপারেট করে না। যদিও সারাদেশে আদালত অঙ্গনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপিত রয়েছে। দেশের অনেক নিম্ন আদালতেও সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। তবে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলিকাতা হাইকোর্ট এজলাসের অভ্যন্তরীণ ক্যামেরা থেকে অধিবেশন চলাকালীন ধারণ

ও সম্প্রচার বিভিন্ন মাধ্যমে দেখতে পাওয়া যায়। তাহলে একটা বিষয় স্পষ্ট হয় যে, প্রকাশ্য কিংবা গোপনে ভিডিও ধারণে বাধানিষেধ যেমন নেই, তেমনি ধারণ করার কথাও বলা হয়নি কোথাও।

পরিশেষে, একটা বিষয় হচ্ছে, বর্তমান এআইয়ের যুগে বিশ্ব যেমন এগিয়ে চলেছে, তেমনি বাংলাদেশও সমানতালে এগিয়ে যাবে প্রত্যাশা করি। যেমন, করোনা মহামারীর সময়কালে আইনে না থাকলেও দেখেছি প্রযুক্তির উৎকর্ষ কাজে লাগিয়ে ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। যাতে জামিনসহ গুরুত্বপূর্ণ শুনানি যেমন হয়েছে, তেমনি রিমান্ড শুনানির মতো শুনানিও খাস কামরায় বসে বিচারক শুনেছেন, আইনজীবী চেম্বারে বসে শুনানি করেছেন আর আসামি জেলখানায় থেকে অংশ নিয়েছেন। সেটা যেমন করে সম্ভয় হয়েছে তেমনি করে, বিশেষ চাঞ্চল্যকর মামলার শুনানি ডিসপ্লেতে দেখানোর ব্যবস্থা করা গেলে এর ক্ষতি নেই বরং মানুষ দেখে শিক্ষা নিতে পারে।

[লেখক : অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ফেনী]

back to top