গাজী তারেক আজিজ
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনকেন্দ্রিক সমঝোতা নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির ভেতরে যে মানসিক চাপ, অস্বস্তি ও দ্বিধা তৈরি হয়েছে, সেটি এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। পত্রিকার খবর, দলীয় নেতাদের বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে স্পষ্ট যে এই সমঝোতা শুধু কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এনসিপির রাজনৈতিক আত্মপরিচয় ও নেতৃত্বের মানসিক সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্নটা তাই কেবল জোট রাজনীতির নয়, প্রশ্নটা নেতৃত্ব কতটা মনস্তাপ সামাল দিতে পারে, সেই সক্ষমতার। জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অনেক দল আত্মপ্রকাশ করে। তার একটি হচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি।
এই এনসিপির জন্ম হয়েছিল বিকল্প রাজনীতির প্রতিশ্রুতি নিয়ে। প্রচলিত ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও নাগরিক আকাক্সক্ষাকে প্রতিনিধিত্ব করার যে দাবি দলটি করেছিল, জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার খবরে সেটিই প্রথম বড় ধাক্কা খেয়েছে। পত্রিকার রিপোর্ট বলছে, এই সিদ্ধান্তের আগে দলের ভেতরে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা হয়নি, তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাই বিষয়টি জেনেছেন সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে। রাজনীতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এমন ধরন যে কোনো দলের জন্যই মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা তৈরি করে, এনসিপিও তার ব্যতিক্রম নয়। শুধু নির্বাচন কিংবা জোট নিয়েই নয়, নেতৃত্বের একেক সময়ে একেক অবস্থান। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন বয়ান দিয়ে দলটির নেতারা যখন ঐক্য ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন দলটির বিভিন্নস্তরের নেতাদের বিতর্কিত মন্তব্য-বক্তব্য দেশব্যাপী আলোচনা-সমালোচনার খোরাক জুগিয়েছে। আবার কখনো দলটির কয়েকজন নেতাকর্মীর নারী কেলেঙ্কারীও উঠে আসে আলোচনায়। হয়তো তেমন পরিস্থিতি সামাল দিতেই দলটির নেতা নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারীর উদ্ভট মনস্তত্ত্ব, দলটি নিয়ে লাগাতার সমালোচনার গতিপ্রবাহ ভিন্ন দিকে সরাতেই হয়তো কখনো সেনাবাহিনীকে নিয়ে, কখনো বিভিন্ন দলের প্রধানদের নিয়ে অতিশয় সাধারণ স্তরের আক্রমণাত্মক ভাষার ব্যবহার। ভাষা কিংবা ব্যবহার যা-ই হোক তার কথা তেমন গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে হয় না। তবে একেকজন শীর্ষ নেতা একেক দল নিয়ে কটাক্ষ করলেও বিশ্লেষক-সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, দলটি মূলত জামায়াতের হয়েই মাঠে অবস্থান নিয়েছে। এই জোটের কারণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা সে অভিযোগ তুলে বলতে শুরু করেছে, এরা জামায়াতের বি-টিম হয়েই রাজনীতি করছে। তবে জোট করলেই যে, এই দাবি অকাট্য হবে তা-ও নয়। তবে কিছু বিশ্লেষককে বলতে শোনা গেছে, যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধে অভিযুক্ত দল জামায়াত মূলত বিভিন্ন ছোট-বড় প্লাটফর্ম নিয়ে বহুমাত্রিক লেখা রয়েছে, যা তাদের রাজনৈতিক কৌশল বলেও প্রতিপক্ষ দলগুলোর অভিযোগ। তবে আওয়ামী লীগবিহীন ফাঁকা মাঠে এতদিন অনেক ক্যারিশমা দেখিয়েছে, তারেক রহমানের আগমনে তাদের কোন কৌশলই কাজে আসছে না। তাহলে এখন জামায়াত কিংবা তাদের মিত্র দলগুলোর জোট কোন পথ অনুসরণ করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চাইবে? সেটাও দেখার বিষয়! এই অস্থিরতার মূল জায়গাটা আদর্শিক। এনসিপি নিজেকে যে রাজনৈতিক বয়ানের মধ্যে দাঁড় করাতে চেয়েছে, সেখানে জামায়াত একটি সংবেদনশীল নাম। একাত্তরের ইতিহাস, যুদ্ধাপরাধের বিচার, রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র এসব প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান নিয়ে সমাজে সুস্পষ্ট বিতর্ক রয়েছে। এনসিপির অনেক সমর্থক ও কর্মী বিশ্বাস করতেন, দলটি এই বিতর্কিত জায়গা থেকে সচেতন দূরত্ব বজায় রাখবে। হঠাৎ করে নির্বাচনী সমঝোতার খবরে সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরেছে, যা মানসিক চাপের বড় উৎস। পত্রিকার খবরে দেখা যাচ্ছে, এনসিপির ভেতরে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্য দ্বিমতও সামনে এসেছে। কেউ কেউ বলেছেন, এটি সময়ের দাবি, আবার কেউ বলছেন, এতে দলের নৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। ভিন্নমত থাকা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু সেই ভিন্নমতকে সামাল দেয়ার ক্ষমতা না থাকলে দল ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়ে। এনসিপি নেতৃত্ব এখন সেই সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। মনস্তাপের আরেকটি দিক হলো নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা। সংবাদপত্রে প্রকাশিত বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে, এনসিপির শীর্ষ নেতারা বারবার বলছেন এটি আদর্শিক জোট নয়, এটি কেবল নির্বাচনী সমঝোতা। কিন্তু রাজনীতিতে ভাষা যতই সতর্ক হোক, বাস্তবতার অভিঘাত আলাদা। সাধারণ কর্মী ও ভোটারের চোখে সমঝোতা মানেই রাজনৈতিক দায় ভাগাভাগি। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে নেতৃত্ব যদি শুধু শব্দের কৌশলে ভর করে এগোতে চায়, তাহলে মানসিক চাপ আরও বাড়বে, কমবে না। এখানে নেতৃত্বের মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানে শুধু সিদ্ধান্ত নেয়া নয়, সিদ্ধান্তের পর সৃষ্ট উদ্বেগ, ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি সামাল দেয়া। পত্রিকার রিপোর্টে যেসব নেতার বক্তব্য এসেছে, তাতে অনেক সময় আত্মপক্ষ সমর্থনের তাড়াহুড়া দেখা যায়। এই তাড়াহুড়া ইঙ্গিত দেয়, নেতৃত্ব নিজেও চাপের মধ্যে আছে। চাপ থাকাই স্বাভাবিক, কিন্তু সেই চাপকে আত্মবিশ্বাসে রূপান্তর করতে না পারলে নেতৃত্ব দুর্বল দেখায়। এনসিপির ক্ষেত্রে আরেকটি জটিলতা হলো দলটির বয়স। এটি এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিণত কোনো রাজনৈতিক দল নয়। সাংগঠনিক কাঠামো, আদর্শিক প্রশিক্ষণ ও সংকট মোকাবিলার অভিজ্ঞতা সীমিত। এমন একটি দলে বড় ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত মনস্তাত্ত্বিকভাবে আরও বেশি অভিঘাত সৃষ্টি করে। পুরনো দলগুলোতে এই চাপ শোষণ করার মতো অভ্যন্তরীণ বলয় থাকে, এনসিপির ক্ষেত্রে সেই বলয় এখনো শক্ত হয়নি।
গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এই সমঝোতা এনসিপিকে স্বল্পমেয়াদে কিছু আসনগত সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ব্র্যান্ড সংকট তৈরি করার ঝুঁকি রয়েছে। নেতৃত্ব যদি কেবল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক হিসাব দেখে সিদ্ধান্ত নেয়, তবে কর্মী ও সমর্থকদের মনে যে হতাশা জন্ম নিচ্ছে, তা সামাল দেয়া কঠিন হবে। হতাশা জমতে জমতে একসময় নীরব ভাঙনে রূপ নেয়, যা অনেক সময় প্রকাশ্য বিদ্রোহের চেয়েও ভয়ংকর। মনস্তাপ সামাল দেয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো স্বচ্ছতা। কিন্তু এনসিপির ক্ষেত্রে সেই স্বচ্ছতা এখনো স্পষ্ট নয়। সিদ্ধান্ত কীভাবে হলো, কারা এতে একমত ছিলেন, আপত্তিগুলো কীভাবে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে এসব প্রশ্নের উত্তর সংবাদমাধ্যমে আসেনি। ফলে গুজব, সন্দেহ ও আশঙ্কা জায়গা করে নিচ্ছে। মনস্তাত্ত্বিক চাপের জন্য এর চেয়ে উর্বর জমি আর হয় না। এখানে নেতৃত্বের ভাষার ভূমিকাও বড়। পত্রিকার উদ্ধৃত বক্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোথাও কোথাও আত্মবিরোধী সুর আছে। একদিকে বলা হচ্ছে আদর্শিক ঐক্য হয়নি, অন্যদিকে নির্বাচনী লড়াইকে ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ বলা হচ্ছে। এই দ্বৈত ভাষা কর্মীদের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করে। স্পষ্টতা যেখানে দরকার, সেখানে অস্পষ্টতা থাকলে মনস্তাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। এদিকে তাসনিম জারাসহ অনেকেই এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন। কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় বিবৃতি দিয়ে নিজেকে নির্বাচনে এনসিপির সকল কার্যক্রম থেকে নিজেকে প্রত্যাহারের কথাও জানিয়ে দিয়েছেন। তবে বড় অংশের বক্তব্যেই পরিষ্কার জামায়াত জোটে যেতে গৃহীত সিদ্ধান্তটি গুটিকয়েক নেতার, যা সামষ্টিক হলে এহেন বিব্রতকর পরিস্থিতি হয়তো এড়ানো যেত। তবে হতাশার খবর হচ্ছে, যারাই দল ছেড়েছেন, তারা যতো ভালোই হোক না কেন দলটির কয়েকজন নেতা কর্তৃক আক্রান্ত হচ্ছেন, যা অপ্রত্যাশিত। কারণ পক্ষে না থাকলে ইঙ্গিতপূর্ণ বয়ানে আক্রমণ শোভনীয় তো নয়ই, দলটির আদর্শ নিয়েও প্রশ্নের উদ্রেক করে বৈকি! এমনিতেই তাসনিম জারা একজন পরিচিত মুখ। তার ওপর মেধাবী হিসেবে পরিচিত।
সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আমরা সকলে তা জানিও। তাকেও কথিত বট বাহিনীর আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে। তদুপরি দলটি থেকে কেউ পদত্যাগ করলে তাকেও অস্বীকারের যে রীতি গড়ে উঠেছে তা-ও আদর্শিক রাজনীতির ক্ষেত্রে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা ইতোমধ্যে দলটি ভুক্তভোগীও বটে। নীলা ইস্রাফিলকে অস্বীকার করা থেকে প্রতীয়মান হয়, যখন তখন যাকে তাকে অস্বীকারের রেওয়াজ গড়ে ফেলেছে। রাজনীতিতে কৌশল, কূটকৌশল হরহামেশাই হয়ে থাকে, কিন্তু নিজের চালে নিজে কুপোকাত হলে মানুষও আস্থা হারায়। এনসিপি নেতৃত্ব যদি সত্যিই এই মনস্তাপ সামাল দিতে চায়, তবে প্রথম কাজ হওয়া উচিত দলের ভেতরে খোলামেলা আলোচনা। পত্রিকার পাতায় বিবৃতি দেয়ার আগে দলীয় ফোরামে প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া দরকার। নেতৃত্বের ওপর আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন নেতারা কঠিন প্রশ্ন এড়িয়ে যান না। আস্থা ফিরলে মনস্তাপ অনেকটাই প্রশমিত হয়। আরেকটি বিষয় হলো রাজনৈতিক দায় স্বীকার। সিদ্ধান্ত সঠিক বা ভুল যা-ই হোক, নেতৃত্ব যদি বলে আমরা এই পথ বেছে নিয়েছি এবং এর দায় আমাদের, তাহলে সেটি মানসিকভাবে শক্ত অবস্থান তৈরি করে। কিন্তু যদি দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, তাহলে কর্মীরা নিজেকে অনাথ মনে করে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, এখনো এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব সেই দায়বদ্ধতার জায়গায় পুরোপুরি দাঁড়াতে পারেনি। সব মিলিয়ে বলা যায়, এনসিপি নেতৃত্ব এখন একটি কঠিন মানসিক পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই পরীক্ষা শুধু জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা টিকবে কিনা, সেটির নয়। এই পরীক্ষা হলো দলটি আদর্শ ও বাস্তবতার টানাপড়েনে কতটা স্থির থাকতে পারে, নেতৃত্ব কতটা সাহস নিয়ে ভিন্নমতকে গ্রহণ করতে পারে এবং মানসিক চাপকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় রূপ দিতে পারে। এখনো পর্যন্ত সংবাদপত্রের তথ্য ও প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া বলছে, সেই সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এনসিপি এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে কিনা, সেটিই নির্ধারণ করবে দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
[লেখক : অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ফেনী]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
গাজী তারেক আজিজ
শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনকেন্দ্রিক সমঝোতা নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির ভেতরে যে মানসিক চাপ, অস্বস্তি ও দ্বিধা তৈরি হয়েছে, সেটি এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। পত্রিকার খবর, দলীয় নেতাদের বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে স্পষ্ট যে এই সমঝোতা শুধু কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এনসিপির রাজনৈতিক আত্মপরিচয় ও নেতৃত্বের মানসিক সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্নটা তাই কেবল জোট রাজনীতির নয়, প্রশ্নটা নেতৃত্ব কতটা মনস্তাপ সামাল দিতে পারে, সেই সক্ষমতার। জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অনেক দল আত্মপ্রকাশ করে। তার একটি হচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি।
এই এনসিপির জন্ম হয়েছিল বিকল্প রাজনীতির প্রতিশ্রুতি নিয়ে। প্রচলিত ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও নাগরিক আকাক্সক্ষাকে প্রতিনিধিত্ব করার যে দাবি দলটি করেছিল, জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার খবরে সেটিই প্রথম বড় ধাক্কা খেয়েছে। পত্রিকার রিপোর্ট বলছে, এই সিদ্ধান্তের আগে দলের ভেতরে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা হয়নি, তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাই বিষয়টি জেনেছেন সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে। রাজনীতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এমন ধরন যে কোনো দলের জন্যই মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা তৈরি করে, এনসিপিও তার ব্যতিক্রম নয়। শুধু নির্বাচন কিংবা জোট নিয়েই নয়, নেতৃত্বের একেক সময়ে একেক অবস্থান। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন বয়ান দিয়ে দলটির নেতারা যখন ঐক্য ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন দলটির বিভিন্নস্তরের নেতাদের বিতর্কিত মন্তব্য-বক্তব্য দেশব্যাপী আলোচনা-সমালোচনার খোরাক জুগিয়েছে। আবার কখনো দলটির কয়েকজন নেতাকর্মীর নারী কেলেঙ্কারীও উঠে আসে আলোচনায়। হয়তো তেমন পরিস্থিতি সামাল দিতেই দলটির নেতা নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারীর উদ্ভট মনস্তত্ত্ব, দলটি নিয়ে লাগাতার সমালোচনার গতিপ্রবাহ ভিন্ন দিকে সরাতেই হয়তো কখনো সেনাবাহিনীকে নিয়ে, কখনো বিভিন্ন দলের প্রধানদের নিয়ে অতিশয় সাধারণ স্তরের আক্রমণাত্মক ভাষার ব্যবহার। ভাষা কিংবা ব্যবহার যা-ই হোক তার কথা তেমন গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে হয় না। তবে একেকজন শীর্ষ নেতা একেক দল নিয়ে কটাক্ষ করলেও বিশ্লেষক-সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, দলটি মূলত জামায়াতের হয়েই মাঠে অবস্থান নিয়েছে। এই জোটের কারণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা সে অভিযোগ তুলে বলতে শুরু করেছে, এরা জামায়াতের বি-টিম হয়েই রাজনীতি করছে। তবে জোট করলেই যে, এই দাবি অকাট্য হবে তা-ও নয়। তবে কিছু বিশ্লেষককে বলতে শোনা গেছে, যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধে অভিযুক্ত দল জামায়াত মূলত বিভিন্ন ছোট-বড় প্লাটফর্ম নিয়ে বহুমাত্রিক লেখা রয়েছে, যা তাদের রাজনৈতিক কৌশল বলেও প্রতিপক্ষ দলগুলোর অভিযোগ। তবে আওয়ামী লীগবিহীন ফাঁকা মাঠে এতদিন অনেক ক্যারিশমা দেখিয়েছে, তারেক রহমানের আগমনে তাদের কোন কৌশলই কাজে আসছে না। তাহলে এখন জামায়াত কিংবা তাদের মিত্র দলগুলোর জোট কোন পথ অনুসরণ করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চাইবে? সেটাও দেখার বিষয়! এই অস্থিরতার মূল জায়গাটা আদর্শিক। এনসিপি নিজেকে যে রাজনৈতিক বয়ানের মধ্যে দাঁড় করাতে চেয়েছে, সেখানে জামায়াত একটি সংবেদনশীল নাম। একাত্তরের ইতিহাস, যুদ্ধাপরাধের বিচার, রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র এসব প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান নিয়ে সমাজে সুস্পষ্ট বিতর্ক রয়েছে। এনসিপির অনেক সমর্থক ও কর্মী বিশ্বাস করতেন, দলটি এই বিতর্কিত জায়গা থেকে সচেতন দূরত্ব বজায় রাখবে। হঠাৎ করে নির্বাচনী সমঝোতার খবরে সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরেছে, যা মানসিক চাপের বড় উৎস। পত্রিকার খবরে দেখা যাচ্ছে, এনসিপির ভেতরে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্য দ্বিমতও সামনে এসেছে। কেউ কেউ বলেছেন, এটি সময়ের দাবি, আবার কেউ বলছেন, এতে দলের নৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। ভিন্নমত থাকা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু সেই ভিন্নমতকে সামাল দেয়ার ক্ষমতা না থাকলে দল ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়ে। এনসিপি নেতৃত্ব এখন সেই সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। মনস্তাপের আরেকটি দিক হলো নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা। সংবাদপত্রে প্রকাশিত বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে, এনসিপির শীর্ষ নেতারা বারবার বলছেন এটি আদর্শিক জোট নয়, এটি কেবল নির্বাচনী সমঝোতা। কিন্তু রাজনীতিতে ভাষা যতই সতর্ক হোক, বাস্তবতার অভিঘাত আলাদা। সাধারণ কর্মী ও ভোটারের চোখে সমঝোতা মানেই রাজনৈতিক দায় ভাগাভাগি। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে নেতৃত্ব যদি শুধু শব্দের কৌশলে ভর করে এগোতে চায়, তাহলে মানসিক চাপ আরও বাড়বে, কমবে না। এখানে নেতৃত্বের মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানে শুধু সিদ্ধান্ত নেয়া নয়, সিদ্ধান্তের পর সৃষ্ট উদ্বেগ, ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি সামাল দেয়া। পত্রিকার রিপোর্টে যেসব নেতার বক্তব্য এসেছে, তাতে অনেক সময় আত্মপক্ষ সমর্থনের তাড়াহুড়া দেখা যায়। এই তাড়াহুড়া ইঙ্গিত দেয়, নেতৃত্ব নিজেও চাপের মধ্যে আছে। চাপ থাকাই স্বাভাবিক, কিন্তু সেই চাপকে আত্মবিশ্বাসে রূপান্তর করতে না পারলে নেতৃত্ব দুর্বল দেখায়। এনসিপির ক্ষেত্রে আরেকটি জটিলতা হলো দলটির বয়স। এটি এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিণত কোনো রাজনৈতিক দল নয়। সাংগঠনিক কাঠামো, আদর্শিক প্রশিক্ষণ ও সংকট মোকাবিলার অভিজ্ঞতা সীমিত। এমন একটি দলে বড় ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত মনস্তাত্ত্বিকভাবে আরও বেশি অভিঘাত সৃষ্টি করে। পুরনো দলগুলোতে এই চাপ শোষণ করার মতো অভ্যন্তরীণ বলয় থাকে, এনসিপির ক্ষেত্রে সেই বলয় এখনো শক্ত হয়নি।
গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এই সমঝোতা এনসিপিকে স্বল্পমেয়াদে কিছু আসনগত সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ব্র্যান্ড সংকট তৈরি করার ঝুঁকি রয়েছে। নেতৃত্ব যদি কেবল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক হিসাব দেখে সিদ্ধান্ত নেয়, তবে কর্মী ও সমর্থকদের মনে যে হতাশা জন্ম নিচ্ছে, তা সামাল দেয়া কঠিন হবে। হতাশা জমতে জমতে একসময় নীরব ভাঙনে রূপ নেয়, যা অনেক সময় প্রকাশ্য বিদ্রোহের চেয়েও ভয়ংকর। মনস্তাপ সামাল দেয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো স্বচ্ছতা। কিন্তু এনসিপির ক্ষেত্রে সেই স্বচ্ছতা এখনো স্পষ্ট নয়। সিদ্ধান্ত কীভাবে হলো, কারা এতে একমত ছিলেন, আপত্তিগুলো কীভাবে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে এসব প্রশ্নের উত্তর সংবাদমাধ্যমে আসেনি। ফলে গুজব, সন্দেহ ও আশঙ্কা জায়গা করে নিচ্ছে। মনস্তাত্ত্বিক চাপের জন্য এর চেয়ে উর্বর জমি আর হয় না। এখানে নেতৃত্বের ভাষার ভূমিকাও বড়। পত্রিকার উদ্ধৃত বক্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোথাও কোথাও আত্মবিরোধী সুর আছে। একদিকে বলা হচ্ছে আদর্শিক ঐক্য হয়নি, অন্যদিকে নির্বাচনী লড়াইকে ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ বলা হচ্ছে। এই দ্বৈত ভাষা কর্মীদের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করে। স্পষ্টতা যেখানে দরকার, সেখানে অস্পষ্টতা থাকলে মনস্তাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। এদিকে তাসনিম জারাসহ অনেকেই এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন। কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় বিবৃতি দিয়ে নিজেকে নির্বাচনে এনসিপির সকল কার্যক্রম থেকে নিজেকে প্রত্যাহারের কথাও জানিয়ে দিয়েছেন। তবে বড় অংশের বক্তব্যেই পরিষ্কার জামায়াত জোটে যেতে গৃহীত সিদ্ধান্তটি গুটিকয়েক নেতার, যা সামষ্টিক হলে এহেন বিব্রতকর পরিস্থিতি হয়তো এড়ানো যেত। তবে হতাশার খবর হচ্ছে, যারাই দল ছেড়েছেন, তারা যতো ভালোই হোক না কেন দলটির কয়েকজন নেতা কর্তৃক আক্রান্ত হচ্ছেন, যা অপ্রত্যাশিত। কারণ পক্ষে না থাকলে ইঙ্গিতপূর্ণ বয়ানে আক্রমণ শোভনীয় তো নয়ই, দলটির আদর্শ নিয়েও প্রশ্নের উদ্রেক করে বৈকি! এমনিতেই তাসনিম জারা একজন পরিচিত মুখ। তার ওপর মেধাবী হিসেবে পরিচিত।
সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আমরা সকলে তা জানিও। তাকেও কথিত বট বাহিনীর আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে। তদুপরি দলটি থেকে কেউ পদত্যাগ করলে তাকেও অস্বীকারের যে রীতি গড়ে উঠেছে তা-ও আদর্শিক রাজনীতির ক্ষেত্রে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা ইতোমধ্যে দলটি ভুক্তভোগীও বটে। নীলা ইস্রাফিলকে অস্বীকার করা থেকে প্রতীয়মান হয়, যখন তখন যাকে তাকে অস্বীকারের রেওয়াজ গড়ে ফেলেছে। রাজনীতিতে কৌশল, কূটকৌশল হরহামেশাই হয়ে থাকে, কিন্তু নিজের চালে নিজে কুপোকাত হলে মানুষও আস্থা হারায়। এনসিপি নেতৃত্ব যদি সত্যিই এই মনস্তাপ সামাল দিতে চায়, তবে প্রথম কাজ হওয়া উচিত দলের ভেতরে খোলামেলা আলোচনা। পত্রিকার পাতায় বিবৃতি দেয়ার আগে দলীয় ফোরামে প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া দরকার। নেতৃত্বের ওপর আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন নেতারা কঠিন প্রশ্ন এড়িয়ে যান না। আস্থা ফিরলে মনস্তাপ অনেকটাই প্রশমিত হয়। আরেকটি বিষয় হলো রাজনৈতিক দায় স্বীকার। সিদ্ধান্ত সঠিক বা ভুল যা-ই হোক, নেতৃত্ব যদি বলে আমরা এই পথ বেছে নিয়েছি এবং এর দায় আমাদের, তাহলে সেটি মানসিকভাবে শক্ত অবস্থান তৈরি করে। কিন্তু যদি দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, তাহলে কর্মীরা নিজেকে অনাথ মনে করে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, এখনো এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব সেই দায়বদ্ধতার জায়গায় পুরোপুরি দাঁড়াতে পারেনি। সব মিলিয়ে বলা যায়, এনসিপি নেতৃত্ব এখন একটি কঠিন মানসিক পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই পরীক্ষা শুধু জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা টিকবে কিনা, সেটির নয়। এই পরীক্ষা হলো দলটি আদর্শ ও বাস্তবতার টানাপড়েনে কতটা স্থির থাকতে পারে, নেতৃত্ব কতটা সাহস নিয়ে ভিন্নমতকে গ্রহণ করতে পারে এবং মানসিক চাপকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় রূপ দিতে পারে। এখনো পর্যন্ত সংবাদপত্রের তথ্য ও প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া বলছে, সেই সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এনসিপি এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে কিনা, সেটিই নির্ধারণ করবে দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
[লেখক : অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ফেনী]