বাবুল রবিদাস
দেশে নানা কারণে বিভিন্ন সমস্যা, সংঘাত ও যুদ্ধ-বিগ্রহ সৃষ্টি হলে তার ক্ষতি সবচেয়ে বেশি ভোগ করে সাধারণ মানুষ। এই ক্ষতির শিকার হয় নারী-পুরুষ, আবাল-বৃদ্ধ সবাই। তবে বাস্তবতা হলো, সব সময়ই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারীরা। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুগে যুগে যত বড় বড় ঘটনা ঘটেছে প্রায় প্রতিটি ঘটনাতেই নারীরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আবার বহু অপরাধ ও সহিংসতার কেন্দ্রবিন্দুতেও নারীদের উপস্থিতি দেখা যায়।
নারীর জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় যুদ্ধকালে। তখন কোনো আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধ কার্যকর থাকে না। ফলে অপরাধের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। অনেক সাহিত্যিক যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিকে তুলনা করেছেন এমন এক বাগানের সঙ্গে, যেখানে হঠাৎ গরু-ছাগল ঢুকে পড়ে সবকিছু তছনছ করে দেয়। ঠিক তেমনই, কোনো দেশে যুদ্ধ শুরু হলে সেনাবাহিনী বা সশস্ত্র গোষ্ঠী ঢুকে পড়লে মানুষের জীবন, সম্পদ, সম্মান সবকিছু ল-ভ- হয়ে যায়।
১৯৭১ সালে আমাদের দেশেও এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের হাতে অসংখ্য নারী নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র তাদের ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধিতে ভূষিত করে স্বীকৃতি দেয়।
এমনই একজন বীরাঙ্গনা হলেন গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলার বাসিন্দা রাজকুমারী রবিদাস, যিনি ফুলমতি রবিদাস নামেই বেশি পরিচিত। ১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের হাতে নির্যাতনের শিকার হন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৮ বছর। বর্তমানে তার বয়স ৮২।
স্বাধীনতার পর তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি এবং বীরাঙ্গনা উপাধি পান। একসময় বিভিন্ন মহল থেকে সম্মাননা, সহানুভূতি ও কিছু সহায়তাও পেয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগে তিনি মারাত্মক অসুস্থ। স্ট্রোক করে ডান পা অবশ হয়ে গেছে। তিনি এখন কার্যত গৃহবন্দী। জীবন-মরণের লড়াইয়ে দিন কাটছে এই বীরাঙ্গনার।
সম্প্রতি তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি চলাফেরা করতে না পেরে বিছানায় কাতরাচ্ছেন। স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তার স্বামী কুশিরাম রবিদাস ছিলেন নিম্নআয়ের মানুষ। জমিজমা না থাকায় খাস জমিতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অতি কষ্টে জীবনযাপন করতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর ফুলমতি রবিদাস রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়ে কিছুটা সম্মানের সঙ্গে জীবন কাটাচ্ছিলেন। সুস্থ থাকাকালে তিনি বীরদর্পে চলাফেরা করতেন। কিন্তু বয়স ও অসুস্থতার কারণে গত দুই বছর ধরে তার জীবন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে ঘরের আঙিনা আর বিছানায়।
তার চার ছেলের মধ্যে দুইজন- রতন রবিদাস ও নিরঞ্জন রবিদাস দিনমজুর। এক ছেলে সুজন একটি সরকারি দপ্তরে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। আরেক ছেলে মনি রাজকুমার ২০১৭ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর দীর্ঘদিন সরকারি চাকরির জন্য আবেদন ও পরীক্ষায় অংশ নিলেও চাকরি পাননি। বর্তমানে বয়সসীমা পার হয়ে যাওয়ায় তার সেই স্বপ্নও শেষ।
বীরাঙ্গনা ফুলমতি রবিদাস বলেন, সরকার তাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছে- এর জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। কিন্তু এখন তার শরীর আর সাড়া দেয় না। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। দীর্ঘদিন ধরে গৃহবন্দি থাকলেও সরকারি কর্মকর্তারা নিয়মিত খোঁজখবর নেন না।
এ বিষয়ে সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, বার্ধক্যজনিত কারণে ফুলমতি রবিদাস নানা রোগে আক্রান্ত। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে তারা তার খোঁজখবর নেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণের কথা অনেকেই বক্তৃতায় বলেন, বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব কম। সারা বছর তাদের খোঁজখবর নেয়া হয় না; কেবল কিছু দিবসে দায়সারা আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়। এতে তাদের প্রকৃত কোনো উপকার হয় না।
একটি প্রবাদ আছে-
“রোগীর কঠিন অবস্থা, আর ডাক্তার ছয় মাসের পথ।”
দুঃখজনক হলেও এই প্রবাদটি বীরাঙ্গনা ফুলমতি রবিদাসের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়। এ প্রসঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অমর পঙ্ক্তি স্মরণযোগ্য
“জীবনে যারে দাওনি মালা, মরণে কেন দিতে এলে ফুল?”
অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী সব সময়ই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে। কাজী নজরুল ইসলাম নিজেও ছিলেন এক অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সন্তান। তিনি রুটির দোকানে কাজ করে পড়াশোনা চালিয়েছেন, লিখেছেন অসংখ্য কবিতা, গান, গল্প ও প্রবন্ধ। তার লেখায় অন্যরা সম্পদশালী হলেও তিনি নিজে থেকে গেছেন দারিদ্রের মধ্যেই।
ঠিক তেমনই, বীরাঙ্গনা ফুলমতি রবিদাস রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলেও বাস্তবে দলিত ও বঞ্চিত হয়েই জীবন কাটাচ্ছেন। ক্ষমতার মসনদে যারা ছিলেন, তারাই সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আজও অনেক দূরে।
[লেখক: অ্যাডভোকেট, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
বাবুল রবিদাস
শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬
দেশে নানা কারণে বিভিন্ন সমস্যা, সংঘাত ও যুদ্ধ-বিগ্রহ সৃষ্টি হলে তার ক্ষতি সবচেয়ে বেশি ভোগ করে সাধারণ মানুষ। এই ক্ষতির শিকার হয় নারী-পুরুষ, আবাল-বৃদ্ধ সবাই। তবে বাস্তবতা হলো, সব সময়ই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারীরা। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুগে যুগে যত বড় বড় ঘটনা ঘটেছে প্রায় প্রতিটি ঘটনাতেই নারীরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আবার বহু অপরাধ ও সহিংসতার কেন্দ্রবিন্দুতেও নারীদের উপস্থিতি দেখা যায়।
নারীর জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় যুদ্ধকালে। তখন কোনো আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধ কার্যকর থাকে না। ফলে অপরাধের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। অনেক সাহিত্যিক যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিকে তুলনা করেছেন এমন এক বাগানের সঙ্গে, যেখানে হঠাৎ গরু-ছাগল ঢুকে পড়ে সবকিছু তছনছ করে দেয়। ঠিক তেমনই, কোনো দেশে যুদ্ধ শুরু হলে সেনাবাহিনী বা সশস্ত্র গোষ্ঠী ঢুকে পড়লে মানুষের জীবন, সম্পদ, সম্মান সবকিছু ল-ভ- হয়ে যায়।
১৯৭১ সালে আমাদের দেশেও এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের হাতে অসংখ্য নারী নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র তাদের ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধিতে ভূষিত করে স্বীকৃতি দেয়।
এমনই একজন বীরাঙ্গনা হলেন গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলার বাসিন্দা রাজকুমারী রবিদাস, যিনি ফুলমতি রবিদাস নামেই বেশি পরিচিত। ১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের হাতে নির্যাতনের শিকার হন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৮ বছর। বর্তমানে তার বয়স ৮২।
স্বাধীনতার পর তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি এবং বীরাঙ্গনা উপাধি পান। একসময় বিভিন্ন মহল থেকে সম্মাননা, সহানুভূতি ও কিছু সহায়তাও পেয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগে তিনি মারাত্মক অসুস্থ। স্ট্রোক করে ডান পা অবশ হয়ে গেছে। তিনি এখন কার্যত গৃহবন্দী। জীবন-মরণের লড়াইয়ে দিন কাটছে এই বীরাঙ্গনার।
সম্প্রতি তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি চলাফেরা করতে না পেরে বিছানায় কাতরাচ্ছেন। স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তার স্বামী কুশিরাম রবিদাস ছিলেন নিম্নআয়ের মানুষ। জমিজমা না থাকায় খাস জমিতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অতি কষ্টে জীবনযাপন করতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর ফুলমতি রবিদাস রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়ে কিছুটা সম্মানের সঙ্গে জীবন কাটাচ্ছিলেন। সুস্থ থাকাকালে তিনি বীরদর্পে চলাফেরা করতেন। কিন্তু বয়স ও অসুস্থতার কারণে গত দুই বছর ধরে তার জীবন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে ঘরের আঙিনা আর বিছানায়।
তার চার ছেলের মধ্যে দুইজন- রতন রবিদাস ও নিরঞ্জন রবিদাস দিনমজুর। এক ছেলে সুজন একটি সরকারি দপ্তরে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। আরেক ছেলে মনি রাজকুমার ২০১৭ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর দীর্ঘদিন সরকারি চাকরির জন্য আবেদন ও পরীক্ষায় অংশ নিলেও চাকরি পাননি। বর্তমানে বয়সসীমা পার হয়ে যাওয়ায় তার সেই স্বপ্নও শেষ।
বীরাঙ্গনা ফুলমতি রবিদাস বলেন, সরকার তাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছে- এর জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। কিন্তু এখন তার শরীর আর সাড়া দেয় না। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। দীর্ঘদিন ধরে গৃহবন্দি থাকলেও সরকারি কর্মকর্তারা নিয়মিত খোঁজখবর নেন না।
এ বিষয়ে সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, বার্ধক্যজনিত কারণে ফুলমতি রবিদাস নানা রোগে আক্রান্ত। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে তারা তার খোঁজখবর নেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণের কথা অনেকেই বক্তৃতায় বলেন, বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব কম। সারা বছর তাদের খোঁজখবর নেয়া হয় না; কেবল কিছু দিবসে দায়সারা আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়। এতে তাদের প্রকৃত কোনো উপকার হয় না।
একটি প্রবাদ আছে-
“রোগীর কঠিন অবস্থা, আর ডাক্তার ছয় মাসের পথ।”
দুঃখজনক হলেও এই প্রবাদটি বীরাঙ্গনা ফুলমতি রবিদাসের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়। এ প্রসঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অমর পঙ্ক্তি স্মরণযোগ্য
“জীবনে যারে দাওনি মালা, মরণে কেন দিতে এলে ফুল?”
অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী সব সময়ই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে। কাজী নজরুল ইসলাম নিজেও ছিলেন এক অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সন্তান। তিনি রুটির দোকানে কাজ করে পড়াশোনা চালিয়েছেন, লিখেছেন অসংখ্য কবিতা, গান, গল্প ও প্রবন্ধ। তার লেখায় অন্যরা সম্পদশালী হলেও তিনি নিজে থেকে গেছেন দারিদ্রের মধ্যেই।
ঠিক তেমনই, বীরাঙ্গনা ফুলমতি রবিদাস রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলেও বাস্তবে দলিত ও বঞ্চিত হয়েই জীবন কাটাচ্ছেন। ক্ষমতার মসনদে যারা ছিলেন, তারাই সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আজও অনেক দূরে।
[লেখক: অ্যাডভোকেট, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]