রেজাউল করিম খোকন
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসবে নতুন সরকার। দেশি-বিদেশি সবাই এখন নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন সরকার কেমন নীতি গ্রহণ করে এবং দেশের অর্থনীতিকে তারা কিভাবে এগিয়ে নিতে চায় সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন যে সরকার গঠিত হবে তার সামনে বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে চড়া মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে আনা, বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প খাতকে চাঙা করতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। এছাড়া রয়েছে ঋণের সুদহার কমানো, ডলারের জোগান বাড়িয়ে টাকার মান ধরে রাখা, বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো, রাজস্ব আয় বাড়ানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, রপ্তানি বাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, চলমান সংস্কার এগিয়ে নেয়া উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি রয়েছে আইএমএফের সঙ্গে দর-কষাকষির মাধ্যমে দেশের মানুষের অনুকূলে পদক্ষেপ নেয়া।
আগামী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ বাড়ানো, জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে গতি আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। এখন যেভাবে মব সৃষ্টি করে যেখানে-সেখানে হামলা হচ্ছে, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটুকু উন্নয়ন ঘটাতে পারে সেটি দেখার বিষয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করছে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনীতিকে চাঙা করার বিষয়টি
দীর্ঘ সময় ধরেই অর্থনীতিতে মন্দা চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারও অর্থনীতিকে চাঙা করতে পারেনি। তবে তারা অর্থনীতির লিকেজগুলো বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। নতুন সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে মানুষকে স্বস্তি দেয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। শিল্প খাতকে চাঙা করতে হবে। মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে। পণ্যমূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এগুলোই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে আশা করা যায়। তখন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে সরকারকে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করতে হবে। দেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও বাড়াতে হবে। এর আগে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত তিনটি ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তাদের পুরো সময়টাই কাটে লুটপাটে। হলমার্ক কেলেঙ্কারি দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। এরপর বেসিক ব্যাংক জালিয়াতি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, অ্যানন টেক্স গ্রুপ, ক্রিসেন্ট গ্রুপ কেলেঙ্কারি। একাধিক ব্যাংক দখল করেও চালানো হয় লুটপাট। বিপুল অঙ্কের টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়। আর্থিক খাত হয়ে পড়ে প্রায় অর্থশূন্য। করোনার আগে ২০১৯ সাল থেকে শুরু হয় অর্থনৈতিক মন্দা। ২০২০ সালে করোনার ধাক্কা ও বৈশ্বিক মন্দায় ২০২২ সালে অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়। যা আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় পর্যন্ত চলে। গর্তে পড়া অর্থনীতির এই অবস্থায় ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ওই বছরের ৮ আগস্ট বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়। জুলাই আন্দোলন মূলত শুরু হয় তরুণ প্রজন্মের বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে।
কর্মসংস্থানের ৯৫ শতাংশই হয় বেসরকারি খাতে। সরকারি খাতে হয় মাত্র ৫ শতাংশ। দীর্ঘ অর্থনৈতিক মন্দায় বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে আসে। ফলে উচ্চতর পড়াশোনা শেষ করে চাকরি বাজারে প্রবেশ করে প্রত্যাশিত কাজ পাচ্ছিলেন না অনেক চাকরিপ্রত্যাশী। বিনিয়োগে মন্দা থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের পথও ছিল রুদ্ধ। খোলা ছিল একমাত্র সরকারি চাকরি। এ খাতে নিয়োগের বড় অংশই ছিল কোটায় আবৃত্ত। ফলে সাধারণ বেকাররা চাকরি পাচ্ছিলেন না। সেই থেকেই কোটাবিরোধী আন্দোলন। একপর্যায়ে সরকারের পতন। আশা করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে চাঙা করে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে জোরালো পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু সরকার কোনো পদক্ষেপই নিতে পারেনি। বিনিয়োগ সম্মেলন, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েও কোনো সাফল্য আসেনি। উলটো চলমান কারখানাগুলো সচল রাখতে সরকারের অসহযোগিতার অভিযোগে করেছেন উদ্যোক্তারা। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে চালু কারখানা বন্ধের নজিরও রয়েছে। তবে সরকার অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কিছু ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। নানামুখী পদক্ষেপের কারণে সরকার মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমাতে পেরেছে। পতনশীল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ঊর্ধ্বমুখী। টাকা পাচার ও হুন্ডি রোধ করে ডলারের প্রবাহ বাড়িয়ে টাকার মানও স্থিতিশীল রয়েছে। গত সরকারের বকেয়া বৈদেশিক ঋণের দায় শোধ করে চাপ হ্রাস করেছে। আইএমএফের সঙ্গে বেশ শক্তভাবেই দরকষাকষি করেছে। ব্যাংক খাতে লুটপাট বন্ধ করে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপও দৃশ্যমান। তবে ব্যাংকে এখনো স্বাভাবিকতা ফিরে আসেনি। সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
আগামী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ বাড়ানো, জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে গতি আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। এখন যেভাবে মব সৃষ্টি করে যেখানে-সেখানে হামলা হচ্ছে, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটুকু উন্নয়ন ঘটাতে পারে সেটি দেখার বিষয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করছে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনীতিকে চাঙা করার বিষয়টি। সরকারকে ক্ষমতায় এসেই মব সৃষ্টিকারী মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। তাহলে উদ্যোক্তাদের মনে আস্থার সঞ্চার হবে। তারা বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে। ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগে দায়িত্ব নিচ্ছে নতুন সরকার। ফলে তারা অর্থনীতির ক্ষেত্রে ‘সুখকর’ কোনো পরিস্থিতি পাচ্ছে না। অর্থনীতিকে সচল করতে ও বহু প্রত্যাশিত বেকারত্ব নিরসনে নতুন সরকারকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমেই আসবে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে গত বছরের মে পর্যন্ত এ হার ছিল ৯ শতাংশের উপরে। অক্টোবরে তা ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে আসে। এরপর আবার মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। নির্বাচনের কারণে অনুৎপাদনশীল খাতে টাকার প্রবাহ বাড়ার কারণে জানুয়ারিতে এ হার আরও বাড়তে পারে। ফেব্রুয়ারি ও মার্চে নির্বাচন, রোজা ও ঈদের বাড়তি চাহিদার কারণেও মূল্যস্ফীতির হার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নতুন সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। মূল্যস্ফীতির হার কমাতে হলে ডলারের বিপরীতে টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে হবে, পণ্য ও সেবার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ দুটিই বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ আইএমএফ চাচ্ছে ডলারের দাম বাড়াতে। এতে টাকার মান কমে গিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে। টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে হলে রেমিট্যান্স বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে বড় বাধা হুন্ডি। আওয়ামী লীগ আমলের হুন্ডিবাজরা পালিয়ে যাওয়ায় হুন্ডি কমেছে, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বেড়েছে। হুন্ডিবাজরা যাতে আবার মাথাচাড়া দিতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমানে রপ্তানি আয় নিম্নমুখী।
এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এ খাতকে চাঙা করাটাও একটি চ্যালেঞ্জ। এজন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের জোগান বাড়াতে হবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাটাও জরুরি। প্রবাদ আছে, ‘বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে, জনগণের কাছে সরকারের দাম কমে।’ বাজার যন্ত্রণা থেকে ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে হবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বেশির ভাগ সময়ই বাজার যন্ত্রণায় ভুগেছে ভোক্তা। ভোক্তার আয় কমেছে, খরচ বেড়েছে। ফলে সঞ্চয় ভেঙে ও ঋণ করে জীবিকা নির্বাহ করেছে। এখনো স্বস্তিতে নেই ভোক্তা। ফলে নতুন সরকারকে পণ্যের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে। যেটি খুবই চ্যালেঞ্জিং। এদিকে কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বর্তমান সরকার গত দেড় বছরে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি। এটি নতুন সরকারকে করতে হবে। এজন্য দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা, ঋণের সুদের হার কমানো, ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ জরুরি। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করতে হবে। যাতে তারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হন। দেশি বিনিয়োগ বাড়লে তাদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও আসবে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে মূলধন হিসাবে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ১৪ কোটি ডলার। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এ বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। গত ৪ বছর ধরে ঋণের সুদহার বাড়ানো হচ্ছে।
চড়া সুদের কারণে ঋণের খরচ বেড়েছে। বিনিয়োগ না হওয়ার এটিও একটি কারণ। ঋণের সুদের হার কমালে টাকার প্রবাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে। এ আশঙ্কায় কমানো হচ্ছে না। এদিকে চড়া সুদের কারণে বিনিয়োগ বাড়ছে না। ফলে কর্মসংস্থানে চলছে মন্দা। শিল্প খাত ধুঁকছে। উদ্যোক্তারা সুদের হার কমানোর জোর দাবি করেছেন। তারা বলেছেন, সুদের হার কমলে বিনিয়োগ বাড়বে। এতে কর্মসংস্থান বেড়ে ভোক্তার আয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ ভোক্তা সহ্য করতে পারবে বাড়তি আয় দিয়ে। আর বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা নিয়ন্ত্রণ করলে পণ্যের দামও সহনীয় থেকে মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে। বর্তমানে পুলিশ প্রশাসন ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো বড় চ্যালেঞ্জ। নিরাপত্তা না পেলে বিনিয়োগ আসবে না। চলমান শিল্পের সম্প্রসারণ হবে না। আওয়ামী লীগের পতনের পর চাঁদাবাজি ও দখলবাজি আরও বেড়েছে। নির্বাচনের পর দলীয় নেতাকর্মীরা আগ্রাসী ভূমিকায় নামতে পারে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
রেজাউল করিম খোকন
বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসবে নতুন সরকার। দেশি-বিদেশি সবাই এখন নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন সরকার কেমন নীতি গ্রহণ করে এবং দেশের অর্থনীতিকে তারা কিভাবে এগিয়ে নিতে চায় সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন যে সরকার গঠিত হবে তার সামনে বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে চড়া মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে আনা, বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প খাতকে চাঙা করতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। এছাড়া রয়েছে ঋণের সুদহার কমানো, ডলারের জোগান বাড়িয়ে টাকার মান ধরে রাখা, বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো, রাজস্ব আয় বাড়ানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, রপ্তানি বাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, চলমান সংস্কার এগিয়ে নেয়া উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি রয়েছে আইএমএফের সঙ্গে দর-কষাকষির মাধ্যমে দেশের মানুষের অনুকূলে পদক্ষেপ নেয়া।
আগামী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ বাড়ানো, জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে গতি আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। এখন যেভাবে মব সৃষ্টি করে যেখানে-সেখানে হামলা হচ্ছে, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটুকু উন্নয়ন ঘটাতে পারে সেটি দেখার বিষয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করছে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনীতিকে চাঙা করার বিষয়টি
দীর্ঘ সময় ধরেই অর্থনীতিতে মন্দা চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারও অর্থনীতিকে চাঙা করতে পারেনি। তবে তারা অর্থনীতির লিকেজগুলো বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। নতুন সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে মানুষকে স্বস্তি দেয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। শিল্প খাতকে চাঙা করতে হবে। মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে। পণ্যমূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এগুলোই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে আশা করা যায়। তখন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে সরকারকে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করতে হবে। দেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও বাড়াতে হবে। এর আগে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত তিনটি ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তাদের পুরো সময়টাই কাটে লুটপাটে। হলমার্ক কেলেঙ্কারি দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। এরপর বেসিক ব্যাংক জালিয়াতি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, অ্যানন টেক্স গ্রুপ, ক্রিসেন্ট গ্রুপ কেলেঙ্কারি। একাধিক ব্যাংক দখল করেও চালানো হয় লুটপাট। বিপুল অঙ্কের টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়। আর্থিক খাত হয়ে পড়ে প্রায় অর্থশূন্য। করোনার আগে ২০১৯ সাল থেকে শুরু হয় অর্থনৈতিক মন্দা। ২০২০ সালে করোনার ধাক্কা ও বৈশ্বিক মন্দায় ২০২২ সালে অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়। যা আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় পর্যন্ত চলে। গর্তে পড়া অর্থনীতির এই অবস্থায় ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ওই বছরের ৮ আগস্ট বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়। জুলাই আন্দোলন মূলত শুরু হয় তরুণ প্রজন্মের বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে।
কর্মসংস্থানের ৯৫ শতাংশই হয় বেসরকারি খাতে। সরকারি খাতে হয় মাত্র ৫ শতাংশ। দীর্ঘ অর্থনৈতিক মন্দায় বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে আসে। ফলে উচ্চতর পড়াশোনা শেষ করে চাকরি বাজারে প্রবেশ করে প্রত্যাশিত কাজ পাচ্ছিলেন না অনেক চাকরিপ্রত্যাশী। বিনিয়োগে মন্দা থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের পথও ছিল রুদ্ধ। খোলা ছিল একমাত্র সরকারি চাকরি। এ খাতে নিয়োগের বড় অংশই ছিল কোটায় আবৃত্ত। ফলে সাধারণ বেকাররা চাকরি পাচ্ছিলেন না। সেই থেকেই কোটাবিরোধী আন্দোলন। একপর্যায়ে সরকারের পতন। আশা করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে চাঙা করে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে জোরালো পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু সরকার কোনো পদক্ষেপই নিতে পারেনি। বিনিয়োগ সম্মেলন, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েও কোনো সাফল্য আসেনি। উলটো চলমান কারখানাগুলো সচল রাখতে সরকারের অসহযোগিতার অভিযোগে করেছেন উদ্যোক্তারা। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে চালু কারখানা বন্ধের নজিরও রয়েছে। তবে সরকার অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কিছু ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। নানামুখী পদক্ষেপের কারণে সরকার মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমাতে পেরেছে। পতনশীল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ঊর্ধ্বমুখী। টাকা পাচার ও হুন্ডি রোধ করে ডলারের প্রবাহ বাড়িয়ে টাকার মানও স্থিতিশীল রয়েছে। গত সরকারের বকেয়া বৈদেশিক ঋণের দায় শোধ করে চাপ হ্রাস করেছে। আইএমএফের সঙ্গে বেশ শক্তভাবেই দরকষাকষি করেছে। ব্যাংক খাতে লুটপাট বন্ধ করে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপও দৃশ্যমান। তবে ব্যাংকে এখনো স্বাভাবিকতা ফিরে আসেনি। সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
আগামী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ বাড়ানো, জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে গতি আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। এখন যেভাবে মব সৃষ্টি করে যেখানে-সেখানে হামলা হচ্ছে, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটুকু উন্নয়ন ঘটাতে পারে সেটি দেখার বিষয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করছে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনীতিকে চাঙা করার বিষয়টি। সরকারকে ক্ষমতায় এসেই মব সৃষ্টিকারী মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। তাহলে উদ্যোক্তাদের মনে আস্থার সঞ্চার হবে। তারা বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে। ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগে দায়িত্ব নিচ্ছে নতুন সরকার। ফলে তারা অর্থনীতির ক্ষেত্রে ‘সুখকর’ কোনো পরিস্থিতি পাচ্ছে না। অর্থনীতিকে সচল করতে ও বহু প্রত্যাশিত বেকারত্ব নিরসনে নতুন সরকারকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমেই আসবে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে গত বছরের মে পর্যন্ত এ হার ছিল ৯ শতাংশের উপরে। অক্টোবরে তা ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে আসে। এরপর আবার মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। নির্বাচনের কারণে অনুৎপাদনশীল খাতে টাকার প্রবাহ বাড়ার কারণে জানুয়ারিতে এ হার আরও বাড়তে পারে। ফেব্রুয়ারি ও মার্চে নির্বাচন, রোজা ও ঈদের বাড়তি চাহিদার কারণেও মূল্যস্ফীতির হার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নতুন সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। মূল্যস্ফীতির হার কমাতে হলে ডলারের বিপরীতে টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে হবে, পণ্য ও সেবার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ দুটিই বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ আইএমএফ চাচ্ছে ডলারের দাম বাড়াতে। এতে টাকার মান কমে গিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে। টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে হলে রেমিট্যান্স বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে বড় বাধা হুন্ডি। আওয়ামী লীগ আমলের হুন্ডিবাজরা পালিয়ে যাওয়ায় হুন্ডি কমেছে, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বেড়েছে। হুন্ডিবাজরা যাতে আবার মাথাচাড়া দিতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমানে রপ্তানি আয় নিম্নমুখী।
এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এ খাতকে চাঙা করাটাও একটি চ্যালেঞ্জ। এজন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের জোগান বাড়াতে হবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাটাও জরুরি। প্রবাদ আছে, ‘বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে, জনগণের কাছে সরকারের দাম কমে।’ বাজার যন্ত্রণা থেকে ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে হবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বেশির ভাগ সময়ই বাজার যন্ত্রণায় ভুগেছে ভোক্তা। ভোক্তার আয় কমেছে, খরচ বেড়েছে। ফলে সঞ্চয় ভেঙে ও ঋণ করে জীবিকা নির্বাহ করেছে। এখনো স্বস্তিতে নেই ভোক্তা। ফলে নতুন সরকারকে পণ্যের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে। যেটি খুবই চ্যালেঞ্জিং। এদিকে কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বর্তমান সরকার গত দেড় বছরে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি। এটি নতুন সরকারকে করতে হবে। এজন্য দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা, ঋণের সুদের হার কমানো, ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ জরুরি। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করতে হবে। যাতে তারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হন। দেশি বিনিয়োগ বাড়লে তাদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও আসবে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে মূলধন হিসাবে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ১৪ কোটি ডলার। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এ বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। গত ৪ বছর ধরে ঋণের সুদহার বাড়ানো হচ্ছে।
চড়া সুদের কারণে ঋণের খরচ বেড়েছে। বিনিয়োগ না হওয়ার এটিও একটি কারণ। ঋণের সুদের হার কমালে টাকার প্রবাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে। এ আশঙ্কায় কমানো হচ্ছে না। এদিকে চড়া সুদের কারণে বিনিয়োগ বাড়ছে না। ফলে কর্মসংস্থানে চলছে মন্দা। শিল্প খাত ধুঁকছে। উদ্যোক্তারা সুদের হার কমানোর জোর দাবি করেছেন। তারা বলেছেন, সুদের হার কমলে বিনিয়োগ বাড়বে। এতে কর্মসংস্থান বেড়ে ভোক্তার আয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ ভোক্তা সহ্য করতে পারবে বাড়তি আয় দিয়ে। আর বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা নিয়ন্ত্রণ করলে পণ্যের দামও সহনীয় থেকে মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে। বর্তমানে পুলিশ প্রশাসন ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো বড় চ্যালেঞ্জ। নিরাপত্তা না পেলে বিনিয়োগ আসবে না। চলমান শিল্পের সম্প্রসারণ হবে না। আওয়ামী লীগের পতনের পর চাঁদাবাজি ও দখলবাজি আরও বেড়েছে। নির্বাচনের পর দলীয় নেতাকর্মীরা আগ্রাসী ভূমিকায় নামতে পারে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]