alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

ক্যানসার সেবা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

নাজমুল হুদা খান

: বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে থাকে, যার মধ্যে অর্ধেকই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর ক্যানসারের রোগী বাড়ছে দেড় লাখের বেশি; মারা যায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ, অথচ একটু সচেতনতাই প্রায় অর্ধেক মৃত্যু রোধ করা সম্ভব। ঘাতক ব্যাধি ক্যানসার সম্পর্কে বিশ্ববাসীর মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, ফলপ্রসূ প্রতিরোধ, দ্রুততম সময়ে এ রোগ নির্ণয় ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ক্যানসার দিবস পালিত হয়। ২০২৫-২৭ সাল পর্যন্ত এ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘স্বকীয়তায় ঐক্যবদ্ধ’। অর্থাৎ ক্যানসার রোগীর অভিজ্ঞতা, চাহিদা, শারীরিক অবস্থা এবং গল্প আলাদা বা স্বতন্ত্র হলেও ক্যানসার প্রতিরোধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দিবসটি ইউনিয়ন ফর ইন্টারন্যাশনাল ক্যানসার কন্ট্রোল নামক একটি বেসরকারি সংস্থার নেতৃত্বে উদযাপন করা হয়। এটি পূর্বে ক্যানসারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন নামে পরিচিত ছিল। এ সংস্থার সদর দপ্তর জেনেভায় অবস্থিত, যার ১৭০টিরও বেশি দেশে প্রায় দুই হাজার সদস্য রয়েছে। মানুষের শরীর প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন কোষের সমন্বয়ে গঠিত। এদের সমন্বিত শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও তন্ত্র পরিচালিত হয়। একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় এদের কার্যক্রম, বৃদ্ধি, ক্ষয় ও তিরোধান ঘটে। শারীরবৃত্তীয় সাধারণ প্রক্রিয়ার বাইরে অনাকাংখিত কারণে যদি শরীরের কোন অংশ বা অঙ্গের কোষসমূহের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি হয়; তাহলেই ক্যানসারের উৎপত্তি ঘটে এবং ক্রমান্বয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। ক্যানসারের পেছনে ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাত্রা যেমন, ধূমপান, পান-জর্দা-তামাকপাতা খাওয়া, সবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার কম খাওয়া, শারীরিক ব্যায়াম না করা, শারীরিক স্থূলতা বা বেশি ওজন ইত্যাদি অন্যতম। পরিবেশগত দূষণ, বায়ুদূষণ, ক্ষতিকর এজবএস্টসের ব্যবহার, ভেজাল খাদ্য, ফসলে ও শাকসবজিতে ক্ষতিকর ভারী ধাতু, মাংস ও মাছে ক্ষতিকর ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি, আলট্রাভায়োলেট রশ্মি, এক্স-রে রেডিয়েশন, কিছু রাসায়নিক পদার্থ, যথা আর্সেনিক, আলফাটক্সিন, কিছু ভাইরাস যথা- হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস প্রভৃতি বা অন্যান্য জীবাণুও অন্যতম। আমাদের দেশের ক্যানসারের প্রধান ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ফুসফুস, স্তন, জরায়ুমুখ, গলা- মুখগহ্বর, খাদ্যনালি, কোলোরেক্টাল ক্যানসার ইত্যাদি। সাধারণত প্রাথমিকভাবে ক্যানসারের লক্ষণসমূহ ধরতে না পারা কিংবা সঠিক সময়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা না নেয়া বা পাওয়া ক্যানসারে মৃত্যুর প্রধান কারণ। সাধারণত শরীরের ওজন কমে যাওয়া দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে ফুসফুসে কাশি হওয়া, পায়খানা প্রসাব বা মাসিকের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, গলা বসে যাওয়া বা দীর্ঘ দিন যাবৎ মাঝে মাঝে জ্বর আসা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ক্যানসারের পেছনে বৈশ্বিক বাৎসরিক চিকিৎসা ব্যয় দেড় ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। উন্নত দেশসমূহে ৯০ শতাংশ ক্যানসার রোগীর চিকিৎসা ব্যয় রাষ্ট্র বহন করে। অন্যদিকে দরিদ্র দেশসমূহের মাত্র ৩০ শতাংশেরও কম ক্যানসার রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে পারছে। অথচ সচেতনতা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার উন্নতির মাধ্যমে পঞ্চাশ ভাগ ক্যানসার প্রতিরোধ ও মৃত্যু হ্রাস করা সম্ভব। সঠিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা না করতে পারলে দূরারোগ্য ক্যানসারে মৃত্যুর সংখ্যা ২০৩০ সালে দ্বিগুণে পরিণত হবে। বাংলাদেশে ক্যানসার ব্যবস্থাপনায় নানা সমস্যা রয়েছে। সীমিত রোগ নির্ণয় ও স্ক্রিনিং সুবিধা, ওষুধের উচ্চমূল্য, চিকিৎসা উপকরণের অভাব ইত্যাদি অন্যতম। আমদের দেশে ক্যানসার চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি, যেমন লিনিয়ার এক্সিলেটর প্রয়োজনের তুলনায় রয়েছে মাত্র ১০%, ব্রাকিথেরাপি রয়েছে প্রয়োজনের ১২ শতাংশ । বাংলাদেশে ক্যানসারের চিকিৎসা যেমন- ব্যয়বহুল অপর দিকে পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তারও অভাব রয়েছে। অসচেতনতার কারনে অধিকাংশ রোগীর দেরিতে রোগ নির্ণয় হয়, ফলে চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। রোগীদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে সীমিত সুযোগ এবং সর্বোপরি বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, ক্যানসার চিকিৎসাকে কঠিন করে তুলছে। আমাদের দেশে ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা প্রদানে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির অভাব সুষ্ঠু সেবার অন্তরায়। সার্জারি, কেমোথেরাপি কিংবা রেডিওথেরাপি কোন অবস্থায় কখন কীভাবে দিতে হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়াও চিকিৎসকদের জন্য ক্ষেত্র বিশেষে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশে একজন রোগীর জন্য মেডিকেল বোর্ড গঠন কঠিন। যার কারনে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের নিকট ছোটাছুটির কারণে সঠিক চিকিৎসা প্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়ে। ক্যানসার চিকিৎসায় স্ট্যান্ডার্ড স্টেইজিং ইনভেস্টিগেশনের জন্য সিটি স্ক্যান, এম আর আই, পেট সিটি স্ক্যান ইত্যাদির প্রয়োজন হয়। এর বাইরে স্ক্রিনিং টেস্ট আছে অনেক, সেগুলোও সহজলভ্য নয় সব যায়গায়। অথচ স্ক্রিনিং টেস্ট অনেকের জীবনে ক্যানসারের ঝুঁকি কমিয়ে দিতে পারে। দেশে ক্যানসার ব্যবস্থাপনা জোরদার ও ফলপ্রসূ করতে আধুনিক প্রযুক্তি ও কমিউনিটিভিত্তিক স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু করে ক্যানসার দ্রুত শনাক্ত করতে হবে। দক্ষ চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, নার্স ও প্যারামেডিক্সদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যায় কমাতে স্বাস্থ্যবিমা ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দ্রুত ক্যানসার রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এ রোগ প্রতিরোধ, লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, বিশেষ করে স্কুল ও কমিউনিটিতে নিয়মিত সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। ক্যানসার চিকিৎসাকে অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়ে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে আন্তর্জাতিক মানের ক্যানসার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি সহায়তার মাধ্যমে নতুন ক্যানসার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য কর রেয়াত প্রদানের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। ক্যানসার চিকিৎসা সজলভ্য করতে সেবা ও সব ওষুধের ওপর কর হ্রাস এবং সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য কমিয়ে আনতে হবে। ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থ যথা, তামাক, অ্যালকোহল, প্লাস্টিকের তৈরি জিনিসপত্র, এসবেসটস, কোমল পানীয়, বিভিন্ন ক্ষতিকর বর্জ্য উৎপাদনকারী কারখানার ওপর আরোপ করা ট্যাক্স বাড়িয়ে এ থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ক্যানসার ফান্ড তৈরির উদ্যোগ নিলে দেশের ক্যানসার আক্রান্ত দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে সহায়তা প্রদান সম্ভব। বর্তমানে মাত্র দুই শতাধিক ক্যানসার বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে সারাদেশের ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। সারাদেশে সরকারি ১০টি এবং বেসরকারি কয়েকটি হাসপাতালের মাধ্যমে এ চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। ক্যানসার রোগীদের ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট ও নার্সসহ দক্ষ জনশক্তি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি তিন স্তরের পরিকল্পনাধীন খাতে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রথম স্তরে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে একটি করে ক্যানসার সেন্টার; দ্বিতীয় ধাপে প্রত্যেকটি মেডিকেল কলেজে এবং তৃতীয় স্তরে প্রতিটি জেলা শহরে ক্যানসার সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশে ক্যানসার চিকিৎসার ওষুধও সহজলভ্য করার প্রচেষ্টা চলছে। ক্যানসারের বিষয়ে সাধারণের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, নিয়মিত বাস্তবসম্মত শারীরিক ব্যায়ামে উৎসাহিত করতে হবে, ধূমপান ও নেশাজাতীয় দ্রব্যাদি পরিহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তাহলেই ক্যানসার প্রতিরোধে অনেকাংশে সাফল্য আসবে এবং ক্যানসারে আক্রান্তদের সিংহভাগ মৃত্যু রোধ সম্ভব।

[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল লি.]

বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার

রহমান ভার্সেস রহমান

যেভাবে আছেন, সেভাবে থাকবেন!

ইরান সংকটের শেষ কোথায়?

বিশ্ব রাজনীতির অস্বস্তিকর অধ্যায়

প্লাস্টিকনির্ভর জীবনযাপন ও জনস্বাস্থ্য সংকট

চক্রে চক্রে আন্ধাচক্র

‘বাংলাদেশপন্থী’ এক অস্পষ্ট ধারণা: রাষ্ট্র না মানুষ আগে

গুরু রবিদাস: সমতার বার্তা ও মানবতাবাদী শিক্ষার প্রতিধ্বনি

অপরাধ দমন না অধিকার সুরক্ষা?

ভোটের মাস, ভাষার মাস

ব্যর্থতা নৈতিক নয় কাঠামোগত: দুর্নীতি ও বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতা

জমি ভুলে খাস হয়ে গেলে সহজে ফেরত আনবেন কীভাবে?

আমরা কি জালিয়াত জাতি?

মন্ত্রীদের জন্য বিলাসী ফ্ল্যাট

ধর্মান্ধ আর প্রতিযোগিতা: দুই সাম্প্রদায়িকের খেলা

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী: সমাজের নতুন ব্যাধি

ছবি

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা

বাড়ি ভাড়া নির্দেশিকা: ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ সুরক্ষা নাকি দুর্ভোগের নতুন দরজা

ক্ষমতা যখন নিজেকেই তোষামোদ করে

‘খাল কেটে কুমির আনা...’

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

অধিকারহীনতার বৃত্তে আদিবাসী জীবন

স্লোগানে ফ্যাসিবাদ, ভোটের মাঠে আশির্বাদ!

ভাঙা-গড়া সমাজের আমূল পরিবর্তন আনে

শান্তির বৃত্তে বাঁধা বাঘ

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

চলচ্চিত্র শিল্প : সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা

ছবি

জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্রিনল্যান্ড: নতুন ভূ-রাজনীতির ইঙ্গিত

ব্যাংকিং খাত: সংকট, সংস্কার ও আস্থার সন্ধান

চলচ্চিত্র শিল্প : সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা

কুষ্ঠ-সম্পর্কিত কুসংস্কার ও বৈষম্য

ব্যাংক ধসের দায় কার?

পশ্চিমবঙ্গে অহেতুক হয়রানির মূল টার্গেট মুসলমানেরাই

’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান

নির্বাচনের আগেই জানা গেল আংশিক ফল!

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

ক্যানসার সেবা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

নাজমুল হুদা খান

বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে থাকে, যার মধ্যে অর্ধেকই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর ক্যানসারের রোগী বাড়ছে দেড় লাখের বেশি; মারা যায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ, অথচ একটু সচেতনতাই প্রায় অর্ধেক মৃত্যু রোধ করা সম্ভব। ঘাতক ব্যাধি ক্যানসার সম্পর্কে বিশ্ববাসীর মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, ফলপ্রসূ প্রতিরোধ, দ্রুততম সময়ে এ রোগ নির্ণয় ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ক্যানসার দিবস পালিত হয়। ২০২৫-২৭ সাল পর্যন্ত এ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘স্বকীয়তায় ঐক্যবদ্ধ’। অর্থাৎ ক্যানসার রোগীর অভিজ্ঞতা, চাহিদা, শারীরিক অবস্থা এবং গল্প আলাদা বা স্বতন্ত্র হলেও ক্যানসার প্রতিরোধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দিবসটি ইউনিয়ন ফর ইন্টারন্যাশনাল ক্যানসার কন্ট্রোল নামক একটি বেসরকারি সংস্থার নেতৃত্বে উদযাপন করা হয়। এটি পূর্বে ক্যানসারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন নামে পরিচিত ছিল। এ সংস্থার সদর দপ্তর জেনেভায় অবস্থিত, যার ১৭০টিরও বেশি দেশে প্রায় দুই হাজার সদস্য রয়েছে। মানুষের শরীর প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন কোষের সমন্বয়ে গঠিত। এদের সমন্বিত শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও তন্ত্র পরিচালিত হয়। একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় এদের কার্যক্রম, বৃদ্ধি, ক্ষয় ও তিরোধান ঘটে। শারীরবৃত্তীয় সাধারণ প্রক্রিয়ার বাইরে অনাকাংখিত কারণে যদি শরীরের কোন অংশ বা অঙ্গের কোষসমূহের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি হয়; তাহলেই ক্যানসারের উৎপত্তি ঘটে এবং ক্রমান্বয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। ক্যানসারের পেছনে ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাত্রা যেমন, ধূমপান, পান-জর্দা-তামাকপাতা খাওয়া, সবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার কম খাওয়া, শারীরিক ব্যায়াম না করা, শারীরিক স্থূলতা বা বেশি ওজন ইত্যাদি অন্যতম। পরিবেশগত দূষণ, বায়ুদূষণ, ক্ষতিকর এজবএস্টসের ব্যবহার, ভেজাল খাদ্য, ফসলে ও শাকসবজিতে ক্ষতিকর ভারী ধাতু, মাংস ও মাছে ক্ষতিকর ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি, আলট্রাভায়োলেট রশ্মি, এক্স-রে রেডিয়েশন, কিছু রাসায়নিক পদার্থ, যথা আর্সেনিক, আলফাটক্সিন, কিছু ভাইরাস যথা- হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস প্রভৃতি বা অন্যান্য জীবাণুও অন্যতম। আমাদের দেশের ক্যানসারের প্রধান ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ফুসফুস, স্তন, জরায়ুমুখ, গলা- মুখগহ্বর, খাদ্যনালি, কোলোরেক্টাল ক্যানসার ইত্যাদি। সাধারণত প্রাথমিকভাবে ক্যানসারের লক্ষণসমূহ ধরতে না পারা কিংবা সঠিক সময়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা না নেয়া বা পাওয়া ক্যানসারে মৃত্যুর প্রধান কারণ। সাধারণত শরীরের ওজন কমে যাওয়া দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে ফুসফুসে কাশি হওয়া, পায়খানা প্রসাব বা মাসিকের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, গলা বসে যাওয়া বা দীর্ঘ দিন যাবৎ মাঝে মাঝে জ্বর আসা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ক্যানসারের পেছনে বৈশ্বিক বাৎসরিক চিকিৎসা ব্যয় দেড় ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। উন্নত দেশসমূহে ৯০ শতাংশ ক্যানসার রোগীর চিকিৎসা ব্যয় রাষ্ট্র বহন করে। অন্যদিকে দরিদ্র দেশসমূহের মাত্র ৩০ শতাংশেরও কম ক্যানসার রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে পারছে। অথচ সচেতনতা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার উন্নতির মাধ্যমে পঞ্চাশ ভাগ ক্যানসার প্রতিরোধ ও মৃত্যু হ্রাস করা সম্ভব। সঠিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা না করতে পারলে দূরারোগ্য ক্যানসারে মৃত্যুর সংখ্যা ২০৩০ সালে দ্বিগুণে পরিণত হবে। বাংলাদেশে ক্যানসার ব্যবস্থাপনায় নানা সমস্যা রয়েছে। সীমিত রোগ নির্ণয় ও স্ক্রিনিং সুবিধা, ওষুধের উচ্চমূল্য, চিকিৎসা উপকরণের অভাব ইত্যাদি অন্যতম। আমদের দেশে ক্যানসার চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি, যেমন লিনিয়ার এক্সিলেটর প্রয়োজনের তুলনায় রয়েছে মাত্র ১০%, ব্রাকিথেরাপি রয়েছে প্রয়োজনের ১২ শতাংশ । বাংলাদেশে ক্যানসারের চিকিৎসা যেমন- ব্যয়বহুল অপর দিকে পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তারও অভাব রয়েছে। অসচেতনতার কারনে অধিকাংশ রোগীর দেরিতে রোগ নির্ণয় হয়, ফলে চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। রোগীদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে সীমিত সুযোগ এবং সর্বোপরি বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, ক্যানসার চিকিৎসাকে কঠিন করে তুলছে। আমাদের দেশে ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা প্রদানে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির অভাব সুষ্ঠু সেবার অন্তরায়। সার্জারি, কেমোথেরাপি কিংবা রেডিওথেরাপি কোন অবস্থায় কখন কীভাবে দিতে হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়াও চিকিৎসকদের জন্য ক্ষেত্র বিশেষে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশে একজন রোগীর জন্য মেডিকেল বোর্ড গঠন কঠিন। যার কারনে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের নিকট ছোটাছুটির কারণে সঠিক চিকিৎসা প্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়ে। ক্যানসার চিকিৎসায় স্ট্যান্ডার্ড স্টেইজিং ইনভেস্টিগেশনের জন্য সিটি স্ক্যান, এম আর আই, পেট সিটি স্ক্যান ইত্যাদির প্রয়োজন হয়। এর বাইরে স্ক্রিনিং টেস্ট আছে অনেক, সেগুলোও সহজলভ্য নয় সব যায়গায়। অথচ স্ক্রিনিং টেস্ট অনেকের জীবনে ক্যানসারের ঝুঁকি কমিয়ে দিতে পারে। দেশে ক্যানসার ব্যবস্থাপনা জোরদার ও ফলপ্রসূ করতে আধুনিক প্রযুক্তি ও কমিউনিটিভিত্তিক স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু করে ক্যানসার দ্রুত শনাক্ত করতে হবে। দক্ষ চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, নার্স ও প্যারামেডিক্সদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যায় কমাতে স্বাস্থ্যবিমা ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দ্রুত ক্যানসার রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এ রোগ প্রতিরোধ, লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, বিশেষ করে স্কুল ও কমিউনিটিতে নিয়মিত সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। ক্যানসার চিকিৎসাকে অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়ে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে আন্তর্জাতিক মানের ক্যানসার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি সহায়তার মাধ্যমে নতুন ক্যানসার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য কর রেয়াত প্রদানের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। ক্যানসার চিকিৎসা সজলভ্য করতে সেবা ও সব ওষুধের ওপর কর হ্রাস এবং সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য কমিয়ে আনতে হবে। ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থ যথা, তামাক, অ্যালকোহল, প্লাস্টিকের তৈরি জিনিসপত্র, এসবেসটস, কোমল পানীয়, বিভিন্ন ক্ষতিকর বর্জ্য উৎপাদনকারী কারখানার ওপর আরোপ করা ট্যাক্স বাড়িয়ে এ থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ক্যানসার ফান্ড তৈরির উদ্যোগ নিলে দেশের ক্যানসার আক্রান্ত দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে সহায়তা প্রদান সম্ভব। বর্তমানে মাত্র দুই শতাধিক ক্যানসার বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে সারাদেশের ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। সারাদেশে সরকারি ১০টি এবং বেসরকারি কয়েকটি হাসপাতালের মাধ্যমে এ চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। ক্যানসার রোগীদের ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট ও নার্সসহ দক্ষ জনশক্তি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি তিন স্তরের পরিকল্পনাধীন খাতে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রথম স্তরে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে একটি করে ক্যানসার সেন্টার; দ্বিতীয় ধাপে প্রত্যেকটি মেডিকেল কলেজে এবং তৃতীয় স্তরে প্রতিটি জেলা শহরে ক্যানসার সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশে ক্যানসার চিকিৎসার ওষুধও সহজলভ্য করার প্রচেষ্টা চলছে। ক্যানসারের বিষয়ে সাধারণের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, নিয়মিত বাস্তবসম্মত শারীরিক ব্যায়ামে উৎসাহিত করতে হবে, ধূমপান ও নেশাজাতীয় দ্রব্যাদি পরিহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তাহলেই ক্যানসার প্রতিরোধে অনেকাংশে সাফল্য আসবে এবং ক্যানসারে আক্রান্তদের সিংহভাগ মৃত্যু রোধ সম্ভব।

[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল লি.]

back to top